বাংলাদেশে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ করবে কলকাতার CMG

ওঁরাই কলকাতায় প্রথম মিলন মেলা করেছিলেন। এখন তো মিলন মেলা প্রাঙ্গনের নাম। প্ৰথম ঋত্বিক রোশনকে এনে বিশাল জলসা করেছিলেন আজ থেকে ষোলো বছর আগে। তারপর মারাদোনা, মেসি নানান সেলিব্রেটি ম্যানেজ করেছেন হাওড়ার এই দুই উদ্যোগপতি। ভাস্বর আর ধরমদূত। এবার নিয়েছেন আরও বড় পরিকল্পনা।

0

ভাস্বর গোস্বামী আর ধরমদূত পাণ্ডে। দু’জনের বয়স এখন ৪৫ থেকে ৫০-এর মধ্যে। দু’জনের বন্ধুত্ব কত বছরের সেটা বলতে গেলে দু’জনকেই ভাবতে হয়। অনেক দিনের। কুড়ি থেকে বাইশ বছর তো হবেই। দু’জনেরই বাড়ি হাওড়া জেলায়। ভাস্বর খেলতেন ক্রিকেট। হাওড়া জেলায় খেলে বেড়াতেন। বেশ জনপ্রিয় ছিলেন ক্রিকেটার হিসাবে। আর পাণ্ডের খেলা ছিল ফুটবল। এই খেলাই ছিল দু’জনের আলাপের উৎস। তারপর একই কোম্পানিতে দু’জনের চাকরি করা। যা ছিল দু’জনের বন্ধুত্বের উৎস। আরও একটা মিল। দু’জনের ভাবনায়। দু’জনেই চাকুরি করতে করতে ভাবছেন চাকুরিটা ছেড়ে দেওয়ার কথা। ঝুঁকিহীন নিশ্চিত একটা জীবনের বাইরে গিয়ে নিজেরা যদি কিছু করতে পারা যায়। তখন দুই বন্ধুই থাকতেন ধানবাদে, চাকুরি সূত্রে। ভাস্বর বলছিলেন, “ধানবাদে একটা মেসে আমরা থাকতাম। সেখানেই বসে দু’জনে ভাবতাম নিজেরা যদি কিছু করা যায়। গতে বাঁধা জীবন থেকে বেরিয়ে অন্য রকম কিছু একটা করার উদ্যোগ নেওয়া তখন থেকেই শুরু হয়েছিল।”

এই ভাবনায় নিশ্চয়ই ওরা ব্যতিক্রমী নন। অজস্র মানুষ আছেন, যারা নিজে কিছু করব, এরকম ভাবনায় চাকুরি জীবনের নিশ্চিন্ততা ছেড়ে দিয়েছেন। কিন্তু ভাস্বর আর পান্ডের অন্য রকম কিছু করার ভাবনায় একটা ব্যতিক্রম ছিল। সেটা হচ্ছে আর পাঁচ জনের মতো নয়। নিজেদের ছাপিয়ে গিয়ে এমন কিছু করা যা অনেক দিন পর্যন্ত মানুষের মনে থাকবে। সাধারণের গন্ডী থেকে অসাধারণত্বের গন্ডীতে ছিটকে যাওয়ার একটা চেষ্টা। ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দুনিয়ায় পা রেখে ছোট ছোট ইভেন্ট আয়োজন করছিলেন ওরা। সেই কাজটাই আরও বাড়ানো যেত। বড় কোম্পানির ব্র্যান্ডিং করে নিজেদের আর্থিক অবস্থানটা আরও সমৃদ্ধ করতে পারতেন ওরা। প্রচলিত রাস্তায় না গিয়ে হঠাৎ ভেবে বসলেন বলিউডের তারকা ঋত্বিক রোশনকে নিয়ে কলকাতায় ‘শো’ করবেন! সেটা ২০০০ সাল। তার দুবছর আগে, ১৯৯৮-এর ২১-শে সেপ্টেম্বর তৈরি হয়ে গিয়েছে সেলিব্রিটি ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ। ভাস্বররা করে ফেলেছেন একাধিক ছোট ছোট ইভেন্টের আয়োজন। তাতে পুঁজি বাড়েনি। চাকরি ছেড়ে ব্যবসায় নামার সময় পুঁজি ছিল কত? চোখে দেখা যায় না। দেড় লাখ টাকারও কম! সেই অবস্থা নিয়েই বছর তিরিশের দুই তরুণের মনে হয়েছিল কলকাতায়, যুবভারতীতে ঋত্বিক রোশনকে এনে একটা চমক দেওয়ার মতো ইভেন্ট আয়োজন করা। যে যজ্ঞের আনুমানিক আর্থিক খরচ প্রায় দেড় কোটি টাকা! পান্ডে বলছিলেন, “এখনও মনে আছে, গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেসের সাধারণ থ্রি-টায়ারে চেপে আমাদের দু’জনের মুম্বাই যাওয়া। ঋত্বিকের এজেন্ট কোম্পানির সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলাম।” ভাস্বর যোগ করলেন, “তারকার এজেন্ট বলেই দিয়েছিল, ঋত্বিকের সই করাতে গেলে অগ্রীম দশ লাখ টাকার ড্রাফট নিয়ে যেতে হবে। আর আমরা ট্রেনে উঠেছিলাম যাতায়াতের ভাড়া, মুম্বাইয়ে একটা সাধারণ হোটেলে দিন পাঁচেক থাকা খাওয়ার মতো টাকা নিয়ে।”

যুবভারতীতে ঋত্বিক রোশনের ‘শো’ ধুমধাম করেই হয়েছিল। কলকাতায় প্রথম পেশাদার ইভেন্ট। যার একাধিক স্পনসর ও ঝাঁ চকচকে ব্র্যান্ডিংয়ের মোড়ক। রাজ্যের প্রয়াত ক্রীড়া মন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তীর সহযোগিতায় এই ইভেন্টে অবশ্যই মনে রেখেছেন ভাস্বর আর পান্ডে। এই শো করার আগে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের প্রস্তাবে আরও একটি ছোট মেলার আয়োজন করেছিল সেলিব্রিটি ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ (সি.এম.জি)। ভাস্বরদের দেওয়া সেই মেলার নাম আজ ফুলে ফেঁপে বিরাট চেহারা নিয়ে ফেলেছে। মিলন মেলা।

তবু, ঋত্বিক রোশনের শো ভাস্বরদের কাছে তাৎপর্যপূর্ন। ভাস্বর বললেন, “প্রথমত এত বড় একটা ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতা অর্জন। দ্বিতীয়ত, এই শো-ই আমাদের নিয়ে যায় ফুটবলের দিকে।” কীভাবে? এই ইভেন্ট আয়োজনের সময় প্রয়াত আই.এফ.এ. সচিব রঞ্জিত গুপ্তের সঙ্গে আলাপ হয় ভাস্বরদের। যার নিয়মিত উৎসাহেই ভাস্বরদের ফুটবল ইভেন্ট ম্যানেজ করার ইচ্ছা তৈরি হয়। খেলাধুলোর জগতে পা রেখে কী করেছে সি.এম.জি? ১৪ বছর আগে তাঁরা যা করেছিলেন, কলকাতা ফুটবলে গত ১৪ বছরে কেউ সেটা দেখে নি। আই.এফ.এ.-র ফুটবল দলকে নিয়ে দু’সপ্তাহের প্রস্তুতি সফরে দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়া!

উত্তোরণের সেই শুরু। ভাস্বরদের জন্যই বাংলার ফুটবল প্রেমীরা দেখেছিলেন বিশ্বফুটবলের দুই কিংবদন্তিকে। ২০০৯-এ দিয়েগো মারাদোনা। ২০১১-এ লিওনেল মেসিকে। আর্জেন্তিনার অধিনায়ক হয়ে মেসির প্রথম ম্যাচ ছিল সেটা। যুবভারতীতে ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ফিফা ফ্রেন্ডলিতে। তারপর সি.এম.জি.-এর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ফুটবলের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের কনসেপ্ট নিয়ে আসা। রাজ্যেই তাঁরা চেষ্টা করে ছিলেন এই লিগ করার। কিন্তু প্রতিকুলতার তীব্রতায় পারেন নি। কিন্তু সি.এম.জি.-র সৃষ্টি করা সেই কনসেপ্ট নিয়েই ভারতীয় ফুটবলের নতুন চমক আই.এস.এল-এর উত্থান। কিন্তু ভাস্বরদের দমিয়ে রাখা যায় নি। নিজেদের সৃষ্টিকে আরও উন্নত করে এবার সি.এম.জি. ফ্রাঞ্চাইজি লিগ শুরু করতে চলেছে বাংলাদেশে। আগামী বছরই শুরু হবে সেই লিগ।

১৮ বছরের যাত্রায় মিলনমেলার আয়োজন থেকে বাংলাদেশ সুপার লিগ-ভাস্বরদের ব্যবসা কোথায় পৌঁছাল? ভাস্বর বললেন, “অবশ্যই স্বনির্ভর হয়েছি। কিন্তু টাটা, বিড়লা, আম্বানি হতে পারি নি।” তার একটা কারণ, ছিটকে যাওয়ার চেষ্টা। যে প্রোজেক্ট ভাবছেন ভাস্বররা, সেটা পুঁজির চেয়ে অনেক বেশি! কিন্তু সেটাই ওদের প্রাপ্তি। পান্ডে বললেন, “এমন কিছু ‘এক্সপোজার’ বাংলার ফুটবলে নিয়ে এসেছি যা অনেকদিন পর্যন্ত ক্রীড়াপ্রেমীদের মনে থাকবে।” ধানবাদের মেসে বসে দু’জনে যা ভাবতেন!