ঊর্ধ্বগামী গ্রাফে পতঞ্জলির ভারতীয়ত্ব প্রাণায়াম

0

উদ্বেগ সঙ্গে লেগেই থাকে। এই #Risk_Society তে সব কিছুই এত রিস্কি যে কখনওই শান্তিতে তিষ্ঠোবার জো নেই। একটা সময় ছিল লেখা পড়া করলেই উন্নতি বাঁধা। মা ঠাকুমারা বলতেন 'লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে।' এখন লেখা পড়া করা না করা দুইই সমান। দুয়েতেই রিস্ক আছে। ভালোর কোনও শেষ হয় না। তাই হীরক রাজার আইন অনুযায়ী বলা যেতেই পারত ভালো হয়ে লাভ কী। খারাপ হয়েও যে লাভ নেই তা তো সবাই জানে। ফলে মধ্য মেধার এই বিশাল সমুদ্রে একই ছাঁচে ঢালা হলে একরকম গড্ডালিকায় থাকা যায় ঠিকই কিন্তু সেটাও ভীষণ রিস্কি। আপনি যদি উদ্যোগপতি হন তা হলে আপনার উদ্বেগের কারণ আরও বেশি। কনসাইনমেন্ট ধরার উদ্বেগ। ঠিক সময় মতো কনসাইনমেন্ট ধরানোর উদ্বেগ। গুণগত মানে পিছিয়ে পড়ার উদ্বেগ। এবং সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বাজারে টিকে থাকার লড়াইয়ে প্রতিযোগীদের থেকে এগিয়ে থাকার বাড়তি উদ্বেগ। ফলে উদ্বিগ্ন হওয়াটা একটা স্বাভাবিক প্রতিবর্ত ক্রিয়ার মতই আমাদের সঙ্গী হয়ে গিয়েছে। এই রকম পরিস্থিতিতে কীভাবে লাগাম দেবেন আপনার মনের ঘোড়াকে?

কেউ কেউ বলেন ধর্মেই মুক্তি। কেউ কেউ বলেন কর্মেই মুক্তি। কেউ কেউ বলেন কর্মই ধর্ম। আবার সেই কর্মেই উদ্বেগের ইন্ধনও। ফলে মুক্তি কোথায়, কেউ কি জানেন?

গীতায় বলছে ত্যাগাৎ শান্তি: ন অন্তরম। ত্যাগের শান্তিতে কোনও ইন্টারভাল নেই। ত্যাগ শব্দটা বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গ্রন্থিহীন সাধুদের এক গাল দাড়ি। আসক্তি বিয়োগের জন্যে যারা সারাক্ষণ যোগ করে যাচ্ছেন। একবার কঙ্খলে এক সাধুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল তিনি বলেছেন এই বিয়োগ করার ক্ষমতা আসে যোগ করার ক্ষমতা থেকে। সেখানে অনন্ত শান্তিতে থাকবেন বলে হিমালয়ে এসেছিলেন।

আবার আরেক সাধু বাবা এই দক্ষ রাজের যজ্ঞভূমিতে এসে নিজেই একটি দক্ষযজ্ঞ বাঁধিয়ে ফেলেছেন। বানিয়ে ফেলেছেন যোগের প্রতিষ্ঠান। তিলে তিলে গত বারো তেরো বছরে নিজেই হয়ে উঠেছেন যোগার আইকন। বাবা রামদেব। ১৯৯০ এর দশকে তখনও অত পরিচিত সাধু নন। সাইকেলে চড়ে গ্রামের মেলায় মেলায় ঘুরে ঘুরে আয়ুর্বেদিক জড়িবুটি বিক্রি করতেন। সাধারণ মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করতেন ভারতীয় আয়ুর্বেদের গুণাগুণ, যোগের মাহাত্ম্য। তাঁর আলাপ হয় আচার্য বালকৃষ্ণের সঙ্গে। বালকৃষ্ণ নেপালের ছেলে। আশৈশব চরক সুশ্রুত সংহিতা নিয়েই পড়াশুনো করেছেন। ফলে পাহাড়ি গাছগাছড়া, জড়িবুটি চিনতেন। আর স্বামী রামদেব ভারতীয় শাস্ত্র এবং পতঞ্জলি যোগ নিয়ে পড়াশুনো করেছেন। দুজনের পড়াশুনোই অপ্রচলিত ভাবে, সংস্কৃত টোলে। ১৯৯৫ সালে দুজনের উদ্যোগে তৈরি হয় দিব্য যোগ মন্দির ট্রাস্ট এবং দিব্য ফার্মেসি। পাশাপাশি চলে যোগ শিবিরের কাজ। দুই সন্ন্যাসীর এই কাজ নজর কাড়ে সকলেরই। ২০০০ সাল থেকে হরিদ্বারের আশপাশের গ্রামগুলোতে ক্রমাগত যোগ শিবিরের আয়োজন করতে থাকেন বাবা রামদেব। ২০০৩ সালে আস্থা নামের একটি টেলিভিশন চ্যানেলে সকালের স্লটে যোগ ব্যায়াম শেখানোর একটি শো শুরু করেন। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তার কপাল ভাতি দেখে চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যায় গোটা দুনিয়ার। রামদেব বাবা রাতারাতি রীতিমত সেলেব্রিটি। অমিতাভ বচ্চন থেকে শুরু করে হেন কোনও সেলেব্রিটি নেই যারা বাবা রামদেবের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নেননি। ফলে বাবা রামদেবের ওপর গোটা দুনিয়ার নজর পড়ে। ভারতীয় যোগার রোল মডেল হয়ে ওঠেন তিনি। এমনিতেই যোগার ভক্তের অভাব ছিল না। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তাই মাথা তুলতে থাকে যোগা সেন্টার। ইউরোপ আমেরিকায় থাই স্পার পাশাপাশি ভারতীয় যোগা হয়ে ওঠে নতুন আকর্ষণ।

২০০৩ সাল। ভারতের রাজনীতিতে তখনও অটল বিহারি বাজপেয়ী। গোটা দেশ জুড়ে শাইনিং ইন্ডিয়ার দুর্দান্ত প্রচার। কোটি কোটি টাকা খরচ করে টিভির পর্দায় বিজ্ঞাপন, সমুদ্রের পাড় ধরে হাঁটছেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী পিছনে শিশুরা ছুটছে হাতে ভারতের পতাকা। টিভির পর্দায় চকচকে ভারতের ছবি। টিভি ঘোরালেই ধর্মীয় চ্যানেলে চ্যানেলে ছয়লাপ। রবিশঙ্করজি, আশারাম বাপু, রমেশ ভাই, মুরারি বাপুদের ডিসকোর্সের দুর্দান্ত আয়োজন। সকাল বিকেল ভারতীয়ত্বের বিপুল প্রচার। তখন সবে উঠছেন রামদেব বাবা। তখনও পতঞ্জলি যোগপীঠ তৈরি হয়নি।

২০০৪ সালে ভয়ঙ্কর ভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে বিজেপির রমরমা। হিন্দুত্বের প্রচারে যতি চিহ্ন পরে। পরাজিত অটল বিহারি বাজপেয়ী। এরপর মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী। নেপথ্যে সনিয়া গান্ধি। চকচকে ভারতীয়ত্বের থেকেও দেশে গুরুত্ব পেতে থাকে আর পাঁচটা অন্য বিষয়। এবার নিজের ব্র্যান্ডিংয়ের কথা ভাবতে থাকেন বাবা রামদেব। ২০০৬ সালে গড়ে তোলেন পতঞ্জলি যোগপীঠ। রাজনীতিতেও আগ্রহ দেখাতে থাকেন। স্বেচ্ছাসেবীর নেটওয়ার্ক তৈরি করার কথা ঘোষণা করেন। দিন যত এগোয় সেন্টার স্টেজে চলে আসেন রামদেব বাবা। ভারতীয় যোগের আইকন হয়ে ওঠেন তিনিই।

নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারতীয় যোগা নিয়ে শুরু হয় আন্তর্জাতিক স্তরে সাংস্কৃতিক কূটনীতি। এবং সেই কূটনৈতিক লড়াইয়ে স্টার মার্কস নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন মোদিজি। আর তাঁর প্রধান কারিগর বাবা রামদেব। যোগা এবং আয়ুর্বেদার রথে চড়ে বাবা রামদেব এবং আচার্য বালকৃষ্ণ এখন ভারতীয়ত্বের নতুন আইকন। স্বদেশি সামগ্রীর বিশাল ভাণ্ডার নিয়ে বহুজাতিক সংস্থাকে রীতিমত কোণঠাসা করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন তিনি। এবছরের হিসেব অনুযায়ী বার্ষিক টার্ন-ওভার সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। মাসে মাসে বৃদ্ধির পরিমাণ পাঁচশ থেকে সাড়ে পাঁচশ কোটি টাকা। ইতিমধ্যেই কোলগেট ডাবরের মত ব্র্যান্ড পতঞ্জলির বৃদ্ধির হারে আতঙ্কিত। আইটিসি, গোদরেজ, প্রক্টার অ্যান্ড গ্যাম্বল, পতঞ্জলির বৃদ্ধিকে মাথায় রেখে নতুন করে বিপণন স্ট্র্যাটেজি সাজাচ্ছে। শুধু তাই নয় গোটা পৃথিবীতে রাজত্ব করা এফএমসিজি জায়েন্ট ইউনিলিভারও ভারতীয় বাজার নিয়ে চিন্তিত। একমাত্র নিরুদ্বেগ বাবা রামদেব।

তাঁর উত্থানের টাইমলাইনে যদি তাকান দেখতে পাবেন কম হেনস্থার শিকার হননি এই গত বারো তের বছরে। কিন্তু সব থেকে গঠনমূলক জীবনের ভালো সময়টাও কাটিয়েছেন তিনি এই সময়টাতেই। ব্রিটেনে রেজিস্ট্রেশন হয়েছে তাঁর ট্রাস্টের। হরিদ্বারে তৈরি হয়েছে দু দুটি যোগপীঠ ক্যাম্পাস। ২০১০ এ শুরু হয়েছে কলেজ।

আজকাল এই সাধু বাবা গোটা দেশ জুড়ে তাঁর সংস্থার সামগ্রী বিক্রি করা নিয়ে রীতিমত উঠে পড়ে লেগেছেন। তাঁর কাছে সবই মায়া নয়। সবই অনুলোম বিলোমের ব্যাপার নয়। ব্যালেন্স সিটের ডেবিট ক্রেডিট, প্রফিট এক্সপেন্সেস এসব ভাবতে হয়। মার্কেটে টিকে থাকার লড়াই আছে। প্রতিযোগিতা তো আছেই সঙ্গে আছে অনেক দ্বিধা দ্বন্দ্ব সন্দেহ, ধর্মীয় তকমা, উচ্চবর্ণ নিম্নবর্ণের সেন্টিমেন্টাল রাজনীতি, ব্যবসায় তার সুপ্রভাব আর কুপ্রভাবের বেড়াজাল কাটিয়ে সেরা হওয়ার লড়াই। সেই লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ার উদ্বেগও হয়তো আছে আর পাঁচটা উদ্যোগপতির মতই। কিন্তু তিনি প্রাণায়াম করেই নাকি সব টেনশন দূর করেন। কারণ তিনি যোগা জানেন। তিনি যোগা গুরু। আন্তর্জাতিক যোগা দিবসে তাই যোগাভ্যাসের ডাক দিচ্ছেন তিনিই।