কলকাতায় রবিনহুডের অপারেশন সূর্যোদয়

0
কেউ যদি বেশি খাও
খাবার হিসেব নাও
কেননা অনেক লোক
ভালো করে খায় না

তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল কলকাতাতেও রবিনহুড আছে। গরিবের বন্ধু। একা নয়। রীতিমত এখন তার পল্টনও আছে কলকাতায়। সবুজ জামা পরে ঘুরে বেড়ায়। নিরন্নের মুখে খাবার তুলে দিতে শহরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত এক করে দেন কলকাতার এক রবিনহুড নাম উদয়ন বুবনা। আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে শহরের যে কোনও রাস্তায়, মোড়ে, অথবা শিয়ালদহ স্টেশনে।

শিয়ালদহ স্টেশন। রাত বাড়লে জল দিয়ে প্ল্যাটফর্ম ধুয়ে দেওয়ার পর দশ নম্বর প্লাটফর্মের কোণায় দিব্যি লোটাকম্বল পেতে ঘুমিয়ে পড়ে রাজু বাল্মিকী। পার্ক সার্কাস স্টেশনের ফুটব্রিজেই দীর্ঘদিন থাকে তৌসিফ গাজি। একইভাবে সাদার্ন অ্যাভেনিউতে পথের ধারে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা করে নিয়েছে সতীশ, কাঞ্চনরা। এদের আপনি স্বাভাবিকভাবেই চেনেন না। প্রয়োজন পরে না। কেউ পথেই বড় হচ্ছে, কেউ মূলস্রোত থেকে নানা কারণে বিচ্ছিন্ন। তবে সবার মধ্যে একটাই মিল। তা হল রবিবারের সন্ধ্যা। এই সময়টা সকলে পেট পুরে ভাল-মন্দ খাওয়ার আনন্দ পায়। সবুজ টি শার্ট পরা নাম জানা না জানা কয়েকজন ছেলে-মেয়ে ওদের হাতে খাবারের প্যাকেট ‌তুলে দেয়। হোটেল, রেস্তোঁরার দামি দামি খাবার। যেগুলো কাচের এপার থেকে অন্য সময় জুলু জুলু করে দেখেই চোখ সার্থক করে ওরা।

পরিসংখ্যান বলছে এইডস, ম্যালেরিয়া বা যক্ষ্মায় দুনিয়ায় যত মানুষ মারা যান, খাবারের অভাবে আরও বেশি প্রাণ চলে যায়। পৃথিবীতে প্রতি আট জনের একজন রাতে না খেয়ে থাকেন। প্রতি দশ সেকেন্ডে খাবারের অভাবে একটি শিশুর মৃত্যু হয়। দুনিয়ার ৮৫ কোটি ক্ষুধার্ত মানুষের মধ্যে ৩০ কোটির বাস এই খাদ্য সুরক্ষার দেশ ভারতে আর তার চিরপ্রতিযোগী পাকিস্তানে। এ দেশের একুশ কোটি মানুষের কপালে রোজ ভাত জোটে না। যে দেশে হোটেল, রেস্তোঁরায় খাবার প্রতিদিন নষ্ট হয়, অনুষ্ঠানবাড়িতে ফেলে দেওয়া খাবার কোথাও পাহাড়ের চেহারা নেয় সেখানে এই বৈষম্য ভাবিয়েছিল উদয়ন বুবনাকে। বছর আঠাশের উদয়ন কর্মসূত্রে কলকাতার নানা জায়গায় গিয়ে দেখেছেন একমুঠো খাবার পায় না কত মানুষ। স্টেশন, ফ্লাইওভারের নীচের বাসিন্দাদের খিদে কীভাবে মেটানো যায় তা নিয়ে নানা মহলে যোগাযোগ শুরু করেন উদয়ন।

সময়টা ছিল ২০১৪ সালের অগাস্ট মাস। প্রিটোরিয়া স্ট্রিটের বাসিন্দা উদয়ন ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন দিল্লির রবিনহুড আর্মির সঙ্গে। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজটা যে শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে করে চলেছে রবিনহুড তা কলকাতায় শুরু করেন উদয়ন। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার উদয়ন এই ব্যাপারে কথা বলেন বেশ কিছু হোটেল, রেস্তোঁরার সঙ্গে। শুরুর দিকে একটু হোঁচট খেলেও অনেকেই খাবার দিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়ায়। খাবার জোগাড় হল। কিন্তু নিরন্নের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে কীভাবে। উদয়ন জানালেন, ‘‘নিজের গাড়িকেই খাবার বণ্টনের জন্য ব্যবহার করি। খাবার সংগ্রহের পর তা যাতে নষ্ট না হয় তার জন্য গাড়ি অনেক কাজে দিয়েছে।’’ দ্রুত গাড়ি করে খাবার পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে। এভাবেই গত দেড় বছর ধরে প্রতি রবিবার উদয়ন গাড়িভর্তি খাবার নিয়ে পৌঁছে যান শিয়ালদহ বা পার্ক সার্কাস স্টেশনে, কখনও এজেসি বোস ফ্লাইওভারের নীচে, কখনও সার্দান অ্যাভিনিউয়ে। প্রতি সপ্তাহে ৩০০ থেকে ৫০০ মানুষের মুখে খাবার পৌঁছে দিচ্ছে কলকাতার রবিনহুড আর্মি।

কিন্তু একার পক্ষে কীভাবে এই কাজ সম্ভব? উদয়নের কথায়, ‘‘এব্যাপারে খুবই কার্যকরী হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। আমাদের ফেসবুক পেজের মাধ্যমে কলকাতার নানা প্রান্ত থেকে ৫০ জন এই টিমে যোগ দিয়েছে। আরও উদ্যমে তাই ঝাঁপিয়ে পড়েছে রবিনহুড আর্মি।’’ সবুজ রংয়ের টি শার্ট পড়ে তাদের দলের কেউ পৌঁছে যায় রেস্তোঁরায়, কেউ খাবার প্যাকিং, কেউ খাবার সরবরাহের কাজটা করে। একেবারে টিমওয়ার্ক। রবিনহুড আর্মির প্রতিষ্ঠাতা দিল্লির নীল ঘোষ এবং আনন্দ সিনহা। নীল ঘোষ চাকরিসূত্রে পর্তুগাল গিয়েছিলেন সেখানে রিফুড বলে একটি সংগঠনের এধরনের কাজ তাঁর মনে ধরে যায়। স্রেফ একজন মানুষ সাইকেলে করে কীভাবে পর্তুগালে নিরন্নের পাশে দাঁড়িয়েছিলন তা ভাবিয়েছিল নীলকে। ভারতে ফিরে শুরু হয় কর্মযজ্ঞ। পাশে পেয়ে যান বন্ধু আনন্দ সিনহাকে। এখন দেশের ১৫টি শহরে ক্ষুধার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছে রবিনহুড। প্রতিবেশীর সঙ্গে নানা বিষয়ে আকচাআকচি থাকলেও পাকিস্তানেও রবিনহুড আর্মি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। তারা অবশ্য ধনীদের থেকে কিছু লুঠ করে গরিবদের বিলিয়ে দেয় না। ক্ষুধার্ত, গৃহহীনের মুখে খাবার তুলে দেয়। উদয়নের কথায়, ‘‘ফেলে দেওয়া বা বাসি নয়, টাটকা খাবারই দেয় হোটেল, রেস্তোঁরাগুলো। এখন অনেকেই আমাদের পাশে দাঁড়াতে চাইছে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের দু মুঠো খাবার পাওয়ার পর হাসি মুখ দেখলে মনটা ভরে যায়।’’ কলকাতায় এই টিমের আর এক সদস্য সূর্যপ্রকাশ বলছেন, ‘‘আমরা মানুষের কাছে পৌঁছাতে চাইলেও পথটা জানতাম না। দিল্লিকে দেখে মনে হল কলকাতায় কেন এমন হবে না। সমমনস্ক কয়েকজন বন্ধুকে পেয়ে যাই। পরিচিত কয়েকটি রেস্টুরেন্টের সঙ্গে কথা বলতে ওদের থেকেও সাড়া পেলাম।’’

বিয়েবাড়ি বা নানারকম অনুষ্ঠানে প্রচুরে খাবার নষ্ট হয়। উদ্বৃত্ত খাবার যাতে ঠিকমতো ব্যবহার হয় তার জন্য একাধিক ক্যাটারের সঙ্গে কথা বলেছে রবিনহুড আর্মির সদস্যরা। বেশ কিছু ক্যাটারার রবিনহুডকে খাবার দেওয়ার কথা জানিয়েছে। রবিনহুডের স্বেচ্ছাসেবকদের অধিকাংশই দশটা-পাঁচটার কাজে ব্যস্ত থাকেন। তার মধ্যেও ঠিক সময় বের করে তাঁরা রবিবার পৌঁছে যান হোটেল, রেস্তোঁরা, ক্যাটারারদের কাছে। তাঁরা জানেন তৌসিফরা অপেক্ষা করছে। এবার শিশু দিবসে ১০ হাজার মানুষকে খিদে ভুলিয়েছে রবিনহুড। সেই সুবাদে পূর্ণিমার চাঁদ আর ঝলসানো রুটির মতো মনে হয় না তৌসিফ, সতীশ, কাঞ্চনদের। যেদিন তৌসিফদের আর খাবারের জন্য কাঁদতে হবে না, সেদিনই স্বপ্ন সফল হবে বলে মনে করেন এই যুগের রবিনহুডরা।