সাতটি তারার তিমির টপকে সত্যরূপের সপ্তশৃঙ্গ জয়

3

ছেলেটার জন্যে বাংলার খুব গর্ব। সাত সমুদ্দুর পাড়ি দিয়ে সাত সাতটি পাহাড় চুড়ো টপকে বাংলা মায়ের মুকুটের পালক এনেছে ছেলেটা। এভাবে গল্পটা শুরু হলে লোকে ভাবতেই পারে এটা কোনও রূপকথার কাহিনি শুরু হচ্ছে। না এ রূপকথা নয়। বাংলার এক সাহসী পর্বতারোহীর কাহিনি। যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন বিশ্বের সাতটি মহাদেশের সাতটি শৃঙ্গ জয় করবেন। যেমন ভাবা তেমন কাজ। ঠাকুর পুকুরের সত্যরূপ সিদ্ধান্ত। যার জন্যে গোটা কলকাতা আবেগাপ্লুত। বিরল এক কাণ্ড করে ফেলেছেন এই পর্বতারোহী। পেশায় সফ্‌টঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। সম্প্রতি অ্যান্টার্কটিকার ভিনসন ম্যাসিফ জয় করলেন। ১৬ ডিসেম্বর এলো সুখবর।

মা প্রাক্তন স্কুল শিক্ষিকা গায়ত্রী দেবী মিডিয়ার হাজার বাতির আলোর সামনে শোনাচ্ছিলেন, তাঁর নিজস্ব গর্বের আর বিস্ময়ের কাহিনি। গোটা বাংলা দেখছিল এক মায়ের মুখ সাফল্যে কত উদ্ভাসিত হতে পারে। ও যখন ছোট ছিল তখন নাকি ঠাণ্ডা লাগত। তখন নাকি হাঁপানির টান হত। তখন নাকি শীত কাতুরে ছেলেটা স্নান করতে কাঁদত। তখন নাকি... অথচ হিমাঙ্কের ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সঙ্গে যুদ্ধ করে ভিনসন ম্যাসিফ জয় করলেন সত্যরূপ। ৪৮৯২ মিটার। ইতিমধ্যেই এভারেস্ট চড়া হয়ে গিয়েছে ওঁর। ৮,৮৪৮ মিটারের কাছে ভিনসন ম্যাসিফের উচ্চতা শিশু। কিন্তু সপ্ত-শৃঙ্গের কঠিনতম হল ভিনসন। উচ্চতা খুব বেশি না হলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য ভিনসনকে সপ্ত-শৃঙ্গের তালিকার শেষেই রাখেন পর্বতারোহীরা। ‘শেষ আবিষ্কৃত, শেষ আরোহণ করা এবং সেভেন সামিটের শেষ নাম’। ভিনসন ম্যাসিফ আরোহণের উপযুক্ত সময় ডিসেম্বর। ২৪ ঘণ্টা সূর্যের আলো থাকে এবং তাপমাত্রা মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠে আসে। সেভেন সামিট শুরুর আগে দার্জিলিংয়ের হিমালয় মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউটে প্রশিক্ষণ নিয়ে গিয়েছেন সিদ্ধান্ত। ২০১২ সালের জুন মাস থেকে শুরু হয়েছিল সপ্ত-শৃঙ্গ জয়ের যাত্রা। কিলিমাঞ্জারো দিয়েই সেভেন সামিটের যাত্রা শুরু করেন সত্যরূপ। শেষ করলেন ভিনসন জয়ের মধ্য দিয়ে। তালিকাটা একবার চোখ বুলিয়ে নিন। আকানকাগুয়া, ডেনালি, কিলিমাঞ্জারো, এলব্রুজ, পুনসাক জায়া আর মঁ ব্লাঁ। তবে এখানেই থেমে থাকার পাত্র নন এই বাঙালি পর্বতারোহী। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যাবেন, পরের লক্ষ্য চিলির উচ্চতম পর্বত এবং বিশ্বের উচ্চতম জীবন্ত আগ্নেয়গিরি মাউন্ট ওজস দ সালাদো। ৬৮৯৩ মিটার দীর্ঘ এই পর্বত জয়ের পাশাপাশি চিলির মাউন্ট টার্ন, সিয়েরা হার্মানোস, কোপিয়াপো আগ্নেয়গিরি ও আর্জেন্তিনা-চিলি সীমান্তে ট্রেস ক্রুসেস আরোহণ করবেন। তবে ফিরবেন দেশে।

এই অভিযানের খরচ পড়েছে ৬৬ লক্ষ টাকা। এর তিরিশ লক্ষ টাকাই উঠেছে ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে। বাকিটা ধার নিয়েছেন। ব্যাঙ্ক থেকে ধার করে ইএমআই গুনতে গুনতে অভিযানে পাড়ি দিয়েছেন সত্যরূপ। অভিযানের খরচ যোগাতে এই সফ্টঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার নিজেও নানা কাজ করে টাকা রোজগারের পথ খুঁজে বের করেন। সেই জমানো টাকা অভিযানের কাজে লাগান। একের পর একে দুর্গম অভিযানে যান ছেলে, আর বাড়িতে বাবা মায়ের বুক ধুকপুক করে। কিন্তু, সেসবও এখন অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। সাহস না দেখালে ছেলে সাহস পাবে কোত্থেকে তাই সাহস প্র্যাকটিস করেন পর্বতারোহী সত্যরূপের বাবা মা।