স্টার্টআপ ঠিক যেন ফর্মুলাওয়ান রেস, চাই স্মার্ট টিম ফিট ড্রাইভার

0

যে কোনও ক্ষেত্রে সম্ভবত এফওয়ান ক্রুরাই হলেন সবচেয়ে সমন্বিত টিম। যদি কখনও এফওয়ান রেস দেখতে যান, তাহলে কী দক্ষতা এবং দ্রুততার সঙ্গে ক্রু-রা টায়ার পাল্টান এবং জ্বালানি ভরেন, কিছুতেই সেই তৎপরতা আপনার চোখ এড়াবে না। পিট স্টপে (ছোট্ট বিরতি যেখান থেকে আবার শুরু)রেকর্ড টাইম মাত্র ২ সেকেন্ড! চোখের পলকে গাড়ি সারাই পর্যন্ত করে ফেলেন ক্রু-রা। এমন দক্ষ টিম এতটাই ছন্দে কাজ করে যার জন্য দিন রাত অনুশীলন চলে। একটা টিমের মধ্যে এতটা সমন্বয় আসতে পারে একমাত্র নিয়মিত চর্চা এবং একই লক্ষ্য স্থির করে এগোলে। বারবার একটা কথা শুনেছেন হয়ত, বিনিয়োগকারীরা পণ্যের ওপর বিনিয়োগ করেন না, লগ্নী করেন টিমের ওপর। সাধারণত, টিমের সাফল্যে বাহবার বেশির ভাগটাই যায় গাড়ির অথবা সংস্থার চালকের দিকে। উলটো দিক থেকে দেখলে ব্যর্থতার দায়ও সবচেয়ে বেশি চালকেরই। কোনও সংস্থার প্রতিষ্ঠাতার জন্য এফওয়ান রেস উপযুক্ত দৃষ্টান্ত। আপনি ততটাই সফল, যতটা সফল আপনার টিম।

ফর্মুলা ওয়ানের বিরাট ফ্যান নই। কয়েক মাস আগে এক Itch List সদস্য ব্লগে বলেন স্ক্র্যাচ করে ফর্মুলা ওয়ান দেখার জন্য। উৎসাহিত বোধ করি। ফর্মুলা ওয়ান নিয়ে পড়াশোনা করি, খোঁজখবর রাখতে শুরু করি। ভাগ্যক্রমে এই বছর সিঙ্গাপুরে সরাসরি ফর্মুলা ওয়ান রেস দেখার সুযোগ পেয়ে যাই। সদ্য এই রেস সম্পর্কে জানাতে শুরু করলেও কয়েকটি কারণে আগ্রহ বাড়তে থাকে। বাইরে থেকে মনে হয়, ফর্মুলা ওয়ান চালকের গ্ল্যামার ভরা জীবন-শ্যাম্পেন ছিটোনো, আকর্ষণীয় যন্ত্রের চালক, ঘন ঘন হাজারো ক্যামেরার ঝলকানি, ফ্যানেদের আদিখ্যেতা-বেশ ইর্ষণীয়। কিন্তু ফর্মুলা ওয়ানের চালক হওয়া মুখের কথা নয়। পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে ফিট হতে হবে। কারণ সেকেন্ডের ভগ্নাংশে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে হবে, বিচক্ষণ হতে হবে-আরও কত কী। ফর্মুলা ওয়ানের চালকদের জীবন সবার কাছে শিক্ষণীয়। আমার আবার মনে হল স্টার্টআপের উদ্যোক্তা এবং এফ ওয়ান রেসারের যাত্রা প্রায় একই রকম। তাদের কাছ থেকে স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের অনেক কিছু শেখার আছে।

এফওয়ানে প্রত্যেকটা ট্র্যাক আলাদা। সিঙ্গাপুর এবং মোনাকোয় স্ট্রিট ট্র্যাক, সিলভারস্টোনে নাইট রেস এবং টেকনিক্যাল রেস, বাহারাইনে ডেজার্ট রেস। নিয়ম প্রায় প্রতি বছর পাল্টায়। আবহাওয়ার একটা বিরাট ভূমিকা থাকে এফওয়ানে। এইসব পরিবর্তনের জন্য রেস কেমন হবে আগে থেকে বলা মুশকিল। রেস শুরু না হওয়া পর্যন্ত বলা যায় না কী হতে চলেছে। উদ্যোক্তার ক্ষেত্রেও কি একই পরিস্থিতি হয় না? এফওয়ান রেসারদের মতই উদ্যোক্তারাও শিখে, অন্যের কাছ থেকে গ্রহণ করে, পিছু হটার আগে পিট স্টপে দারুণ কাজ দেখিয়ে নতুন ল্যাপে বেরিয়ে পড়ে। এমন কোনও স্টার্টআপ খুঁজে পাওয়া যাবে না যেটি রকেট গতিতে উন্নতির শিখরে পৌঁছে গিয়েছে। কিন্তু অনেক স্টার্টআপ রয়েছে যেগুলি বারবার পিটস্পটে গিয়েছে এবং তাপরই গতিতে নজর দিয়েছে। একবার সোজা রাস্তা ধরে নিতে পারলে জয় নিশ্চিত।

মূলত একেবারে শুরু এবং নতুন নতুন যন্ত্রপাতির উপর এফওয়ান নির্ভর করে। বুঝিয়ে দেয়, যখন খুব চেষ্টা করব তখন কী করতে পারি। উদাহরণ স্বরূপ ধরুন, KERS (স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম)এ একটা বদল আনা হল। ২০০৭ এ প্রথম যে সিস্টেম তৈরি হল তার ওজন ১০৭ কেজি এবং এনার্জি এফিসিয়েন্সি ৩৯ শতাংশ। ২০১২তে ওজন কমে এল ২৪ কেজিতে। এফিসিয়েন্সি বেড়ে গেল ৮০ শতাংশে। ঠিক একইভাবে কোনও অ্যাপ অথবা নতুন পণ্য সর্বোচ্চ পরষেবা দিতে পারল না কিনা সেটাই বিবেচিত হয়। সবসময় নতুন কিছু না কিছু হচ্ছেই। আমরা দেখেছি, নতুন কিছুর ভাবনা বন্ধ হয়ে গেলেই কোনও টেক স্টার্টআপ রসাতলে যেতে পারে।

নবীনরা ব্যর্থ হতে পারে, আবার অভিজ্ঞরাও হেরে যেতে পারে। সব পদক্ষেপই সঠিক হবে না, কিন্তু প্রত্যেক পদক্ষেপের দাম চোকাতে হবে। বুঝতে হবে হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা খাঁড়ার মত সবসময় মাথার ওপর ঝুলছে। কখন ঘুরে দাঁড়াতে হবে সেটা বোঝার জন্য অভিজ্ঞতা দরকার। কার রেসের থেকে স্টার্টআপে বিষয়টা আরও কঠিন, যেখানে প্লাস্টিক অথবা ধাতুর গুঁড়িয়ে যাওয়া শব্দে ধরে নিতে হবে সব শেষ হয়ে গিয়েছে। চোখ,কান খোলা রাখলে এই গুঁড়িয়ে যাওয়া দেখতে পাওয়া সম্ভব। কখনও এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা চলে, কখনও বা ঘুরে দাঁড়ানোর। ব্যর্থতার ধাক্কা কাউকে হতাশ করে। আবার কাউকে নতুনভাবে শুরু করার প্রেরণা যোগায়। হারে ভয় পেতে নেই। বুঝতে হবে, মানুষ মাত্রেই হার-জিত আছে, এগিয়ে চলাই এমন একটা অভ্যেস যা যে কাউকে অনেক দূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে।

রেস শারীরিকভাবে বেশ কষ্টসাধ্য। সফল হতে হলে শরীরের ঠিক গড়ন ধরে রাখতে হবে। বেশিরভাগ টপ লেভেল রেসাররা অলিম্পিক অ্যাথলিটদের থেকেও বেশি ফিট। টাকারও দরকার। কার রেস যদি শখ হয় তাহলে দেখা যাবে শখ মেটাতে নিজের সর্বস্ব দিতে হচ্ছে। কার সস্তার নয়। সবসময় আপগ্রেড করতে হবে, পাল্টাতে হবে, রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। স্টার্টআপেরও একই অবস্থা। এটাও কঠিন এবং সবচেয়ে জরুরি টাকা। কখনও কখনও অঢেল টাকা দরকার। আত্মত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। লম্বা সময় ধরে কঠোর পরিশ্রমে কম টাকায় ইতিমধ্যেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি আমরা। যাদের অভিজ্ঞতা হয়নি তারা জানেন না। তবুও যারা স্টার্টআপ করেছেন বিষয়টা জানেন। লুই হ্যামিলটনের মতো দক্ষ চালককের প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা। সবসময় সহ্যশক্তি দেখিয়েছেন। নিজের সাফল্য নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ফেলে আসা পথ ভুলে যেতে চায় মানুষ। হেরে গিয়ে, খারাপ খেলে অনেক বছর কাটিয়ে শিখতে হয়েছে আমাকে’। অতএব নিজের রেস উপভোগ করুন। 

লেখক-স্মৃতি মোদি, অনুবাদ-তিয়াসা বিশ্বাস

(লেখকের নিজস্ব মতামত এবং ইওরস্টোরির সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই)