ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় তৈরি করে যাচ্ছেন সঞ্জয়, হীরকরা

0

সঞ্জয় রায়, একটা সময়ে, আটের দশকের শেষ থেকে ন'য়ের দশক চুটিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলেছেন। দশ, এগারো বছর টানা প্রতিনিধিত্ব করেছেন বাংলার। হীরক সেনগুপ্ত। বাংলার ব্যাডমিন্টনে আরও একটি নাম । সঞ্জয়ের খেলোয়াড় জীবনের সতীর্থ। সেই জুনিয়র পর্যায় থেকে সিনিয়র পর্যায় পর্যন্ত, দুজনে র‍্যাকেট হাতে অনেক বছর একসাথে কাটিয়েছেন। সেই সময়ে বাংলার ব্যাডমিন্টনের যে মুখগুলোর সাথে ক্রিড়াপ্রেমিরা পরিচিত সেই অরিত্র নন্দী, ইন্দ্রজিৎ মুখার্জী, সৌমেন ভট্টাচার্য বা তারও আগে দিপু ঘোষ – এদেরি সঙ্গে খেলেছেন সঞ্জয় রায়, হীরক সেনগুপ্তরা। ব্যাডমিন্টনই এদের দিয়েছে প্রতিষ্ঠা।

কিন্তু খেলোয়াড় হিসেবে ব্যাতিক্রমী না হওয়া সঞ্জয়, হীরকরা খেলতে খেলতেই ভেবেছিলেন পরবর্তী জীবনে আর পাঁচজন প্রতিষ্ঠিত ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়ের চেয়ে একটু অন্যরকম হওয়ার কথা। তাই হয়তো খেলোয়াড় হিসেবে সাধারণ হিসেবে জীবন শেষ করলেও খেলার পরবর্তী জীবনে এরা হয়ে উঠলেন অসাধারন। ব্যাক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে এদের হাতেই বাংলার ব্যাডমিণ্টন পেল পুনর্জন্ম। কিন্তু কাজটা ছিল প্রায় অসম্ভব। গন্ধমাদন পর্বত থেকে বিশল্যকরণী নিয়ে আসার মতই কঠিন কাজ । বাংলার ব্যাডমিন্টন তখন ধুকছে। পরিকাঠামো নেই। প্রশাসনিক ব্যার্থতা এমন পর্যায়ে পৌছেছিল যে রাজ্য টুর্ণামেন্ট পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। শুধু একটা রাজ্য চ্যাম্পিওনশিপ হতো। সেখানে খেলোয়াড়রা কিছুই পেতেন না । শুধু চ্যাম্পিয়ন আর রানার্স আপ ট্রফি ছাড়া আর কোন প্রাপ্তি নেই ঘাম ঝরানোর। সেরকম একটি অবক্ষয়ের সময়ে বাংলার ব্যাডমিণ্টনের হাল ফেরাতে চাইছেন কারা? কয়েকজন খেলোয়াড়। যাদের হাতে ঢালও নেই তলোয়াড়ও নেই। এক অবর্ণণীয় অবস্থা। সঞ্জয় বলছেন, “আমার আর হীরকের সাথে সুব্রত ব্যানার্জি (প্রাক্তন রাজ্য চ্যাম্পিয়ন), বাবলু বড়ুয়া, দেবাঞ্জনের মতো আরও জনা আটেক খেলোয়াড় কে পেলাম। আমাদের কিছু ছিল না। ভরসা ছিল শুধুমাত্র মনের জোর আর তীব্র ইচ্ছাশক্তি । আমরা নিজেরাই হয়েছিলাম প্রশাসনিক ব্যার্থতার শিকার তাই আমাদের মধ্যে ছিল পাল্টে দেওয়ার এক অদম্য ইচ্ছে।”

সেই ভাবনা থেকেই সঞ্জয় হীরকরা তৈরি করলেন খেলোয়াড়দের সংস্থা, ব্যাডমিন্টন প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন। বাংলার খেলার ইতিহাসে একাধিক এরকম সংস্থা আছে। কিন্তু এত সক্রিয় খেলয়াড়দের সংস্থা সম্ভবত একমাত্র ব্যাডমিন্টনেই। এমনকী, ক্রিকেটারদের সংস্থাও না। খেলোয়াড়দের সংস্থা তৈরি করার পরেই সঞ্জয়রা তৈরি করেছিলেন কোচিন ক্যাম্প। বাংলার ব্যাডমিণ্টনে খেলোয়াড় তৈরির কারখানাই যে বন্ধ হয়েছিল । ইন্দ্রজিৎ মুখার্জি তার মেয়ের খেলাধুলার উন্নতির স্বার্থে বাংলা ছেড়ে চলে গেলেন উত্তরপ্রদেশে। সৌমেন ভট্টাচার্য্য নিজে একটা কোচিন ক্যাম্প শুরু করলেন। অরিত্র নন্দী দেশই ছেড়ে দিলেন। এই অবস্থায় সঞ্জয়, হীরক, সুব্রত ব্যানার্জি, দেবাঞ্জনদের উদ্যোগে খেলোয়াড়দের সংস্থার প্রথম ক্যাম্প শুরু হল কলকাতায়, অনুশীলন সমিতিতে। সেটা ছিল ২০০৫ এ, গোটা চারেক খুদে শিক্ষার্থিকে নিয়ে । তারপর শিক্ষার্থির সংখ্যা বাড়ে । একইসঙ্গে কোচিনক্যাম্পও বাড়তে থাকে । সঞ্জয় বললেন, “প্রথম কয়েকটা মাস মানে সাত থেকে আট মাস আমাদের নিজেদের খরচেই ক্যাম্প চালাতে হতো। মাসে প্রায় সাত থেকে আট হাজার টাকা। খুবই কষ্ট হয়েছিল।”

কষ্ট কি এখনও হয় না? খেলোয়াড়দের সংস্থা বেঙ্গল ব্যাডমিণ্টন অ্যাকাডেমির যে কোন স্পনসর নেই। অথচ গত দশ বছরে এই সংস্থা বাংলার ব্যাডমিন্টন কে বিভিন্নভাবে সমৃদ্ধ করেছে। সংস্থার কোচিং দেখে গিয়েছেন সাইনা নেহওয়াল। ওয়ার্কশপ করে গিয়েছেন বেঙ্গল ব্যাডমিন্টন অ্যাকাডেমির খুদে শিক্ষার্থিদের সঙ্গে। এসেছেন প্রাক্তন অল ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন ও বর্তমান জাতীয় কোচ পূলেল্লা গোপীচাঁদ। ইতিমধ্যে এই অ্যাকাডেমির সাথে গাঁটছড়া বেঁধেছে পুণের নিখিল কণিতকারের অ্যাকাডেমি। সঞ্জয়, হীরকরা তাদের খেলোয়াড় তৈরির যজ্ঞ্য কে রাজ্যের বাইরে নিয়ে গিয়ে ঝারখন্ড ব্যাডমিন্টন সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে সেখানেও ক্যাম্প শুরু করেছেন। অক্লান্ত পরিশ্রম করে অর্থকষ্টকে উপেক্ষা করে এগিয়ে চলেছে অ্যাকাডেমি।

এখন তাদের একটাই লক্ষ্য, নিজেদের একটা পরিকাঠামো তৈরি করা। সঞ্জয় বলেছেন, “নিজেদের একটা কমপ্লেক্স তৈরি করার স্বপ্ন বহুদিনের । সেখানে কাঠের কোর্ট থাকবে পর্যাপ্ত পরিমাণে । তার সঙ্গে আধুনিক অ্যাকাডেমিতে থাকা সমস্ত উপাদান থাকবে । কিন্তু এর জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন।” আধুনিক পরিকাঠামর সহায়তা না পেয়েও অ্যাকাডেমির ছেলেমেয়েরা জাতীয় পর্যায়ে সম্ভবনাময় পারফর্ম্যান্স করে ফেলছে । এই অ্যাকাডেমির মেয়ে শেষাদ্রি সান্যাল জুনিয়র পর্যায়ে ভারতের জার্সি পরে ফেলেছে। তাই হয়তো সঞ্জয়দের মনে হয় নিজস্ব পরিকাঠামো তৈরির কথা। কিন্তু টাকা কে জোগাবে? এই প্রশ্নের জবাব এখনও নেই সঞ্জয়দের কাছে। কিন্তু ওরা পারবেন। ওদেরি রয়েছে মনের জোর। তবে সময় দিতে হবে ওদেরকে।