লক্ষ্য স্থির থাকলে লক্ষ্মী লাভ সোজা

1

ফান্ডিং। এই শব্দটা স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে প্রত্যেকটি দেওয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে। ব্যবসা শুরু করার আগে থেকেই কিছু নবিশ উদ্যোগপতি আছেন যারা ফান্ডিংয়ের খোঁজ নিয়েই উদ্যোগে নামেন। যে যে ধরণের ব্যবসায় গত কয়েক মাসে ফান্ডিং হয়েছে সেই ধরণের ব্যবসা ফেঁদে বসার চক্কর থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। এভাবে যে ব্যবসা হয় না। এখনও অনেকেরই তা মালুম হচ্ছে না। আমার এক বন্ধুর সৌজন্যে উবের পিচিং সেশনে খুব সম্প্রতি গিয়েছিলাম। গম্ভীর সেই মিটিং হলে সব থেকে হালকা মেজাজে সম্ভবত আমিই ছিলাম। কারণ আমি দর্শক। নয়া পয়সা বিনিয়োগ করব না। এবং বিনিয়োগ আমার এই মুহূর্তে চাই না। এরকম পরিস্থিতিতে মজা পাওয়া এবং অন্যদের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা ছাড়া আমার বিশেষ একটা কাজ ছিল না। আমি দেখলাম যারা পিচিং করতে এসেছিলেন তাদের মধ্যে তিরিশ শতাংশ ব্যবসাটা করছেন। এবং লাভের জন্যেই রাতদিন এক করে লড়ে যাচ্ছেন। নিজেদের পকেটের পয়সা ঢেলে কোনও ক্রমে দাঁড় করিয়েছেন তার বাণিজ্য তরী। এবার খুঁজছেন সেই নৌকোর মাঝি মাল্লার। কিন্তু বাকি ৭০ শতাংশ এসেছেন অপ্রস্তুত ভঙ্গিমায়। কয়েকজনের কথা শুনে তো মনে হল ব্যবসার সামগ্রিক প্রক্রিয়াটাই নিজের কাছে পরিষ্কার নয়।

আমার বক্তব্য হল বিনিয়োগ নেই আমরা প্রায়ই বলে থাকি। বাংলায় উদ্যোগের অভাবের কথাও শোনা যায় অপর প্রান্ত থেকে। কেউ কেউ বলেন এখানে ঠিকঠাক মেন্টরশিপ নেই। অভিযোগ করা সোজা। কারণ অভিযোগ যিনি করেন তাঁর অভিযোগ করাটুকু ছাড়া অন্য কোনও দায় নেই। বাস্তবটা একটু অন্যরকম। কিছুদিন আগে আমায় এক তরুণ উদ্যোগপতি সুদূর কোচি থেকে ফেসবুকে মেসেজ করেছিলেন। তিনি ঘটনা চক্রে বাঙালি। পাকে চক্রে বাংলার বাইরে থাকেন। জানতে চাইছিলেন কলকাতার স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম কেমন তিনি ফিরতে পারবেন কিনা... ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমার বক্তব্য স্পষ্ট কলকাতায় ইকোসিস্টেম আছে

কলকাতায় পরিকাঠামো আছে। সরকারি সদিচ্ছা আছে। বিনিয়োগ সংস্থা আছে। বিনিয়োগ হয়। উদ্যোগপতিও আছেন অনেক। আর আছে কলকাতার মানুষ। আর তাদের দৌলতে বিপুল বাজার। 

এবং কলকাতায় যা নেই সেক্ষেত্রেও ওপরের চারটি জিনিসই আরও একবার বলতে হবে। কারণ সত্যিই তো কলকাতায় আরও ভালো পরিকাঠামো চাই। সরকারি সদিচ্ছা আছে কিন্তু তার প্রয়োগ দেখার মতো হতে হবে। আরও বেশি বিনিয়োগ চাই। বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলির আরও বাড়াবাড়ন্ত চাই। বিনিয়োগে বেশি বেশি আগ্রহ চাই। তৃতীয়ত অনেক উদ্যোগপতি থাকলেও উদ্যোগপতিদের মানসিকতায় একটি ঔপনিবেশিকতার রেশ রয়ে গেছে। আর চতুর্থত কলকাতার যে বাজার তাতে অনেক মানুষ আছেন ঠিকই। অনেক ক্রেতা আছেন ঠিকই, কিন্তু অধিকাংশের ন্যূনতম ক্রয় ক্ষমতা নেই। 

আর এই সবের জন্যেই আরও বেশি বেশি করে কলকাতায় দরকার ব্যবসা। বাণিজ্য। নিজের পায়ে দাঁডা়নোর জন্যে প্রয়োজনীয় ইন্ধন।  সৃজনশীলতায় টগবগ করে ফুটছে যে শহর তার কেন এত হতশ্রী দশা হবে। এই প্রশ্ন নিয়েই কোচি থেকে আমায় যোগযাগো করেছিলেন ওই তরুণ উদ্যোগপতি। হতাশা চুইয়ে পড়ছিল। 

আমার প্রশ্ন খুব সোজা। আপনি কি ব্যবসা করতে সত্যিই আগ্রহী? তাহলে আপনার প্রয়োজন গ্রাহক। এবং সম্ভাব্য গ্রাহকের সমস্যা। যে সমস্যার আপনি সমাধান হতে পারেন। আপনি ঠিকঠাক সমাধান নিয়ে পৃথিবীর যেকোনও সমস্যার সামনে দাঁড়ান আপনার কাজ হয়ে যাবে। যাবেই। ফলে এত ভাবছেন কেন! কোনও কিছু শুরু করাটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এবং শুধু শুরু করলেই হয় না। চালিয়ে নিয়ে যেতে হয়। আরও বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সততার সাথে সমাধান করতে হয় গ্রাহকের সমস্যা। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল একজন স্টার্টআপ উদ্যোগপতি জানতে চান শহরের এক প্রথিত যশা বিনিয়োগকারীর কাছে আপনি কী দেখে বিনিয়োগ করেন। সোজা সাপটা উত্তর। লাভ হওয়ার সম্ভাবনা দেখে। এরকমই স্পষ্ট উত্তর চায় আপনার ব্যবসা আপনার কাছে।

ধরে নেওয়া যাক যে আপনার একটা লাভজনক ব্যবসা আছে, তাহলে নিচের প্রশ্নগুলোই কিন্তু ঠিক করে দিতে পারে আপনার ব্যবসার ভবিষ্যৎ। ঠিক কতটা বিনিয়োগ করলে আপনি লাভের মুখ দেখতে পাবেন। সে আপনি বেঙ্গালুরুতে থাকুন কিংবা শিলিগুড়িতে জানবেন আসলে একটা গাছকে বড় করে ফুল-ফলে সমৃদ্ধ করতে গেলে যেমন সবার আগে তাকে ভালো করে লালন পালন করা দরকার, ভালো করে জল দেওয়া দরকার, তেমনি ব্যবসার ক্ষেত্রে মূলধন এবং বিনিয়োগের একটা সঠিক ব্যাল্যান্সও জরুরি তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

সিদ্ধান্ত নিন যে আগামী ১৮ মাসে ঠিক কতোটা বিনিয়োগ আপনি করবেন আপনার ব্যবসার জন্য।

আপনি কি এই সময়ের মধ্যে আরও কিছুটা বিনিয়োগ করতে চাইছেন? যদি চান তাহলে কতবার, কত করে বিনিয়োগ করতে চাইছেন?

প্রথম বারে বা তার পরে বিভিন্ন সময়ে আপনি ঠিক কতোটা টাকা ঢালছেন এবং কি কি খাতে সেগুলো ব্যাবহার করছেন।

মার্কিন শুরুয়াতি ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে এই বিষয়ে ফ্রেড উইলসনের বক্তব্য খুব প্রাসঙ্গিক, যেগুলো ভারতেও প্রযোজ্য। কিছু কিছু বাঁধার সম্মুখীন হলেও বেসিকটা প্রায় সব জায়গাতেই এক রকম।

তিনি বলেন, শুরুর দিকে আগামী ১২-১৮ মাসের জন্যই বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।(ভারতীয় প্রেক্ষাপটে এটা কম করে ১৮ মাসের হওয়া উচিত) 

১০-২০% এর বেশি কখনই ডাইরেক্ট ইনভেস্ট করা উচিত নয়।(ভারতে এটা সর্বাধিক ২৫% হতে পারে)

দুটো কথা মাথায় রাখলে খুব কম বিনিয়োগেও বেশ ভালো আয় করা সম্ভব। ভারতীয়দের জন্য একটা থাম্ব রুল হল-

১। আপনার প্রোডাক্ট কি, আপনার প্রথম ক্রেতা কে বা কারা এবং আপনার ঘরে টাকা আসা শুরু হতে ঠিক কতোটা সময় লাগতে পারে – এই বিষয় গুলো আগে থেকে চিন্তা করে তবে ব্যবসার কাজ শুরু করা দরকার।
২। আপনি যেদিন বিনিয়োগ করলেন সেদিন থেকে ঠিক কতদিন বাদে আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে আপনার আয়ের টাকা ঢুকতে শুরু করছে।