জৈবচাষের সুফল শোনাতে রাজ্য চষে বেড়াচ্ছেন বর্ধমানের একদল যুবক

0

বাজারে গিয়ে একজনকে বলতে শুনেছিলাম, চারটে পোকা বেগুন দিন। আমি একা নই, যারা যারা শুনতে পেয়েছিলেন প্রত্যেকেই সেই রসিক ক্রেতার দিকে একবার অন্তত তাকিয়েছিলেন। ভদ্রলোক হাসতে হাসতেই বলেছিলেন, পোকা খাওয়াটুকু বাদ দিলে বাকীটুকুতে অন্তত কীটনাশক নেই!

ঠিকই, বেশি ফলনের লোভে চাষের জমিতে রাসায়নিক সার দেওয়া হচ্ছে প্রচুর পরিমানে। পোকার হাত থেকে ফসল বাঁচাতে দেদার কীটনাশক ছড়াচ্ছেন চাষিরা। আর খাবারের মাধ্যমে সেই বিষ ঢুকছে মানুষের শরীরে। নিটফল, সবার অজান্তে ক্যান্সারের মতো মারণ রোগ বাসা বাঁধছে শরীরে। একজন চিকিৎসক হিসেবে মানুষকে সচেতন করা তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলে মনে করেন বর্ধমানের বাসিন্দা সৌমেন সিংহ রায়। ২০১১ সাল থেকে চিকিৎসক সুচিন্দ্রম পাত্র, বন্ধু অমলেন্দু হাজরা সহ আরও অনেককে নিয়ে এনজিও গড়ে ফেলেন। সেই তখন থেকে জেলায় জেলায় ঘুরে সচেতনতা তৈরির জন্য ক্যাম্প করছেন। কৃষকদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন জৈবচাষের সুফল।

‘খাবারের তালিকায় সবুজ, হলুদ শাকসবজি থাকা মাস্ট। কিন্তু সেই সবজি, ফল খেয়ে সুস্বস্থ্য তো দূরের কথা, পেটের গণ্ডগোল সহ নানা রোগে নাজেহাল মানুষ। তার প্রধান কারণ, খাবারের মধ্যে মিশে থাকা রাসায়নিকের প্রভাব। শাক-সবজিতে রাসায়নিক সার, কীটনাশক, এমনকী দুধ, তেলেও ভেজাল’, বলছিলেন সৌমেন সিংহরায়। এইসব থেকে রেহাইয়ের একমাত্র উপায় জৈবচাষ। সৌমেনবাবু বলেন, ‘চাষিদের ভুল ধারণা,জৈবচাষে ফলন কম হয়। নিয়ম মেনে চাষ করলে ফলন বরং বেশি, চাষের খরচ কম। ফলে চাষ করে লাভ বেশি থাকে’। কীভাবে? প্রথমেই সার আর কীটনাশকের বাড়তে থাকা দাম নিয়ে দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই চাষিদের। কারণ জৈব সার চাষি নিজে তৈরি করতে পারেন। সৌমেন সিংহরায় জানান, ‘সেভ আওয়ার রাইস, বিষমুক্ত হাট, আমাদের এই এনজিওগুলি চাষিদের জৈবসার তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়। জেলায় ‌জেলায় ঘুরে শিবির করার সময়ই এই প্রশিক্ষণ দিই আমরা’। জৈবচাষে কীটনাশকের প্রয়োজন পড়ে না। অতিরিক্ত রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে বিদেশের বাজার মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। ফলে রফতানি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। জৈবফলন ফিরলে বিদেশের বাজারও যে খুলে যাবে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। এর ফলে মাঠের ফলন ঘরে তুলেও দাম না পেয়ে চাষির আত্মহত্যা করার মতো ঘটনা ঘটবে না বলেই মনে করেন সৌমেনবাবুরা।

তিনি বলেন, চাষিদের একটা ভুল ধারণা রয়েছে। হাইব্রিড সিড হলেই বেশি ধান হয় বলে মনে করেন অনেকে। অথচ দেশি ধান কেরলা সুন্দরী বা বহুরূপীর ফলন তুলনায় অনেক বেশি। তাছাড়া, লক্ষ্মীদীঘল, মেঘি, জলজাবড়া, কাটারাঙি, কলামোচা, সোলে বা হোগলা এইসব দেশি ধান চাষ করলে বাড়তি পাওনা সঙ্গে মাছ, গেড়ি, গুগলির চাষও করা যায়। কারণ এই ধানগুলি গভীর জলের। জলের সঙ্গে গাছ বাড়ে। ‘এইসব নানা তথ্য নিয়ে গ্রামে গ্রামে গিয়ে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ সঙ্গে জৈবচাষের সুফল বুঝিয়ে আসছি আমরা। লক্ষ্য একটাই, রোগমুক্ত সমাজ তৈরি করা’, বলছিলেন বর্ধমানের তরুণ চিকিৎসক।

কিন্তু জৈবফলনের দাম তো বেশি, সাধারণের কতটা নাগালে? সৌমেনবাবু বলেন, ‘ভুল ধারণা। জৈব ফলনের দাম বেশি নয়, বরং কম।জৈব চাষে খরচ কম হলে ফলনের দামও স্বাভাবিকভাবেই কম হবে। নির্ভর করছে বাজারে কতটা সহজলভ্য হচ্ছে তার ওপর। আর তার জন্যই গ্রামে গ্রামে ঘুরে জৈব চাষে সচেতনতা বাড়ানো প্রচার করছি আমরা। তাতে যথেষ্ট সাহায্য পাচ্ছি রাজ্য সরকারেরও’।