করিমুলের মোটরবাইক, ডুয়ার্সের ‘অ্যাম্বুলেন্স’

0

রাত দেড়টা। বুকের ডান দিকে হঠাৎ যন্ত্রণা। গৃহকর্তা অমিত সরকারের কী চিকিৎসা হবে ভেবেই আকুল জলপাইগুড়ির রাজডাঙা পঞ্চায়েতের ধলাবাড়ি গ্রামের সরকার পরিবার। এত রাতে বাইশ কিলোমিটার দূরের জলপাইগুড়ি জেলা সদর হাসপাতালে কে নিয়ে যাবে। মনে প্রশ্ন আর চিন্তার ভিড়। কীভাবে খবর পৌঁছে গিয়েছিল করিমুল হকের কাছে। নিজের মোটরবাইক নিয়ে সাক্ষাৎ দেবদূতের মতো তিনি হাজির সরকারবাড়িতে। কিন্তু বাইকে কীভাবে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে ষাটোর্ধ্ব অমিতবাবুকে। মুর্হূতেই সমাধান। করিমুল সাহেব বাইকের পিছনে আটকে নিলেন ট্রলির মতো দু চাকার একটি অংশ। ওই ট্রলিতে অমিতবাবুকে নিয়ে বসলেন ছেলে। অন্ধকারের মতো উদ্বেগ মিলিয়ে গেল সরকার পরিবারের। এমন নজির রাজডাঙা এলাকায় অসংখ্য। ওই এলাকার প্রায় ৭০ হাজার মানুষের কাছে অ্যাম্বুলেন্সের পরিষেবা দিচ্ছে করিমুল হকের মোটরবাইক। একদম বিনা পয়সায়। প্রত্যন্ত এলাকায় চিকিত্সা না পেয়ে মায়ের ‌মৃত্যুর পর এভাবে অন্যের সেবাকে জীবনের পথ বলে মনে করেন বছর পঞ্চাশের মানুষটি। চা বাগানের অস্থায়ী কর্মী নিজের মতো করে রাজডাঙার মানুষের স্থায়ী সমাধানের সবরকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সময়টা ১৯৯৫ এর মার্চ মাস। ডুয়ার্সে তখন ভরা বসন্ত। মন ভাল থাকার সময়ে বিনা মেঘে বজ্রপাত। মার্চ মাসের কোনও এক রাতে হার্ট অ্যাটাক করেন জহরুন্নেসা বিবি। ছেলে করিমুল হক বুঝতেই পারছিলেন না গভীর রাতে মাকে নিয়ে কোথায় যাবেন। কার্যত চিকিত্সা না পেয়ে বাড়িতেই মারা যান ওই প্রৌঢ়া। মায়ের আকস্মিক প্রয়াণের ঘটনা করিমুল কিছুতেই মানতে পারছিলেন না। কারণ এই প্রত্যন্ত এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স দূরের কথা, কোনও ভাড়ার গাড়ি আসতে চায় না। ঠিক করে ফেলেন এমন মরণাপন্ন রোগীদের জন্য কিছু একটা ব্যবস্থা করতে হবে। এভাবে ডাক্তারের কাছে না নিয়ে যেতে পেরে মৃ ত্যু কোনওভাবেই মানা যায় না। কিন্তু সমাধানের পথ হবে কীভাবে? নিজের সাইকেল দিয়ে কাজটা শুরু করে দেন করিমুল সাহেব। কেউ অসুস্থ হলে রাতবিরেতে সাইকেলে, কখনও বা রিক্সা করে দূরের জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতাল বা কাছের ক্রান্তি উপ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান তিনি। কেউ এর জন্য টাকা নেওয়ার কথা বলে বিরক্ত হন করিমুল সাহেব। মানুষকে বাঁচানোই যে তাঁর ব্রত, অর্থ দিয়ে তার কি কোনও বিচার হয়?

ডুয়ার্সের রাজডাঙ্গা পঞ্চায়েতের ধুলাবাড়ি গ্রামের‌ বাসিন্দা করিমুল হক। রাজডাঙ্গা এলাকা মূলত আদিবাসীদের বাস। যাদের অধিকাংশই চা বাগানে কাজ করেন, কেউ ছোটখাটো ব্যবসা করেন। কম রোজগারের মতোই সাদামাটা তাঁদের জীবন। করিমুল সাহেব মালবাজারের সুবর্ণপুর টি এস্টেটের অস্থায়ী কর্মী। মাস গেলে মেরেকেটে সাড়ে তিন হাজার টাকা পান। বাড়িতে স্ত্রী আঞ্জুয়ারা ছাড়াও রয়েছে দুই ছেলে আহােজানুল ও আমিনুল এবং দুই পুত্রবধূ ও দুই নাতি। দুই মেয়ের বিয়েও দিয়ে দিয়েছেন। ভরা সংসারের মতোই উদ্যমে ঠাসা মানুষটি। মায়ের মৃত্যুর পর সাইকেল বা রিক্সায় রোগী নিয়ে যাওয়া শুরু হলেও সময়ে ডাক্তারের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছিল না। করিমুল ভাবলেন একটি মোটরবাইক কিনলে কেমন হয়। কিন্তু অতগুলো টাকা কীভাবে আসবে? মানবসেবার জন্য অনেক ঝুঁকি নিয়ে মাসিক কিস্তিতে মোটরবাইক কিনে নেন তিনি। তারপর থেকে তাঁর মোটরবাইক রাজডাঙ্গার বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের কাছে সাক্ষাৎ ‘অ্যাম্বুলেন্স’। ২০০২ সাল থেকে তাঁর এই দু চাকার যান, অনেক জানই বাঁচিয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে করিমুলের মোটরবাইক প্রায় পাঁচ হাজার মুর্মূর্ষু রোগীর জীবন খুঁজে দিয়েছে। তবে এর মধ্যে ছন্দপতনও হয়েছে। নিজের বাবা লালুয়া মহম্মদকে এভাবে মোটরবাইকে করে নিয়ে হাসপাতালে গেলেও পথেই সন্তানকে ছেড়ে চলে যান লালুয়া সাহেব। জীবন যে এমনই, অনেক কিছু দিলেও কিছু কেড়েও নেয়।

সময়টা ২০১৩। এক দুপুরে বাড়িতে ভাত খাচ্ছিলেন করিমুল সাহেব। তাঁর কথায়, ‘‘ফোনে কেউ জানাল ক্রান্তির সন্তোষ মণ্ডল নামে এক ব্যক্তির শিশুর অবস্থা খুবই সঙ্কটজনক। পাতের ভাত, পাতে রেখে দ্রুত বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। ওই বাচ্চা ও তার পরিবারের একজনকে নিয়ে আমি ঝড়ের গতিতে জলপাইগুড়ি জেলা সদর হাসপাতালে পৌঁছে যাই। কিন্তু ডাক্তারবাবু জানান রাস্তায় শিশুটি মারা গিয়েছে। ময়নাতদন্ত করাতে হবে। বাচ্চাকে যে গাড়িতে করে ওই পরিবার বাড়িতে নিয়ে যাবে সেই টাকাও তাদের কাছে ছিল না। বাধ্য হয়ে ওই একরত্তি শিশুকে ময়নাতদন্তের পর ওখানেই পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু বাচ্চাটির বাড়িতে ফিরে দেখি সবাই কাঁদছে। ওরা বলছিল একবার মুখটা দেখত। ওই কান্না আমায় নতুন কিছু ভাবতে শেখায়।’’ মোটরবাইকের বহন ক্ষমতা আরও কীভাবে বাড়ানো যায়, এই চিন্তাই ঘুরপাক খেতে থাকে করিমুলের মাথায়। একদিন রাস্তায় দেখতে পান একটি ট্রাক্টর পিছনে ট্রলি আটকে মালপত্র নিয়ে যাচ্ছে। করিমুল বলছেন, ‘‘ট্রাক্টরের ট্রলির মতো আমি মো‌টরবাইকের পিছনে একটি ট্রলি লাগিয়ে নিই। যেটা ইচ্ছামতো খোলা যাবে।’’ এভাবেই করিমুলের মোটরবাইকের কলেবর বেড়ে যায়। তাঁর ইচ্ছে দুধ সাধা অ্যাম্বুলেন্স কেনার। কিন্তু যে উপায় নেই। তাই তাঁর মোটরবাইক হয়ে উঠেছে বহু সমস্যার চটজলদি সমাধান।

বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার প্রায় মরণাপন্ন রোগীকে বিনা পয়সায় নিয়ে যাওয়া। চা বাগানে ওই সামান্য কাজ করে এত কিছু হয় কীভাবে। করিমুল হকের এমন ভূমিকা জলপাইগুড়ি জেলার অনেকেরই চোখ খুলে দিয়েছে। স্থানীয় পঞ্চায়েত যেমন কিছু তেলের টাকা দেয়, কোতোয়ালি থানার পুলিশ মাসে ১০০০ টাকা দেয়, কোনও ব্যবসায়ী বা ওষুধের দোকানদারও করিমুলের সঙ্গে এই যুদ্ধে সামিল। এমনকী কর্মস্থল থেকেও সবরকম সহযোগিতা পান করিমুল। করিমুলের দুই ছেলে মোবাইল রিপেয়ারিং করেন। এর মধ্যেও তারা বাবার সঙ্গে এই কাজে মাঝেমধ্যে সামিল হয়। করিমুলের বাড়ি আবার অনেকের কাছে চিকিত্সার ঠিকানা। কারণ দারিদ্রসীমার নীচে যারা আছেন তাদের প্রাথমিক চিকিত্সার ব্যবস্থা হয় করিমুলের বাড়িতে। করিমুলের স্ত্রী, ছেলে বউমারা এসব করে থাকেন। এমনকী কারও ওষুধ কেনার টাকা না থাকলেও সাত পাঁচ না ভেবে এগিয়ে যান করিমুল। কেউ যাতে এই পরিষেবা চটজলদি পায় তার জন্য বাইকে নিজের মোবাইল নম্বর দিয়ে রেখেছেন।

অভাবের জন্য অন্যের বাড়িতে কাজ করে ছেলেবেলায় দিন কেটেছে করিমুলের। কত দিন শুধু যবের রুটি বা কচুর লতি খেয়ে থাকতে হয়েছে। প্রাথমিকের বেশি আর পড়া হয়নি। বাহান্নটা বসন্ত পেরিয়েতও ছেলেবেলার স্মৃতি বারবার ফিরে আসে করিমুলের কাছে। তাই একটা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তাঁকে যে চাল দেয় তার পুরোটাই ১২ জন প্রতিবন্ধী শিশুকে দিয়ে আসেন করিমুল। এমনকী কেউ বাড়িতে একটু চালের জন্য তাকে ফেরানো যাবে না, এমনই তাঁর কড়া নির্দেশ। এই মূল্যবোধ আর শৃঙ্খলাই করিমুলের পাথেয়।

Related Stories