কলকাতা আইআইএম-এ চাঁদের হাট

0

আইআইএমে হয়ে গেল উদ্যোগপতিদের আন্তর্জাতিক সামিট। অডিটোরিয়ামের একেবারে উল্টোদিকে মেন গেট থেকে অনেকটা হাঁটা পথ। এই পথ ধরেই হেঁটে আসছিলেন একেক জন তরুণ উদ্যোগপতি। দৃশ্যটা দেখার মতো। নবম আন্তর্জাতিক অন্টরপ্রনেওরশিপ সামিটে অংশ নিতে এসেছেন কলকাতা এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্যের বেশ কিছু স্টার্টআপ-এর কর্ণধাররাও। ঝকঝকে, উদ্দীপনাময় কিছু দৃষ্টি বিনিময় বুঝিয়ে দেয় স্বনির্ভর প্রকল্পে আধুনিক প্রজন্ম কি অসম্ভব সিরিয়াস। নতুন কিছু করার প্রচেষ্টা এবং তা আরও ভালো কি করে করা যায় তার নির্যাস পেতেই শনিবাসরীয় এই সকাল আই.আই.এমে উৎসর্গীকৃত।



সামিট শুরু হল বর্ষীয়ান কে.গনেশ-কে দিয়ে। কৃষ্ণাণ গনেশ আই.আই.এম কলকাতার প্রাক্তন ছাত্র। এখানে এম.বি.এ করার আগে গনেশ দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশুনা করেন। ১৯৯০ সালে শুরু করেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে ব্যবসা। আই টি অ্যান্ড টি নামে একটি আইটি সার্ভিস ও সাপোর্ট কোম্পানি করেন। গোটা দেশে ষোলোটি শাখা। চারশ কাজের লোক নিয়ে। ২০০৪-য়ে বিনিয়োগ করেন ডাটা অ্যানালেটিক্স-য়ে। ২০০৫-য়ে গড়ে তোলেন টিউটর ভিসতা। অনলাইন টিউটরিং পোর্টাল। পিয়ারসন এডুকেশন ২০১৩-য়ে প্রায় দুশো মিলিয়ন ডলারে ব্যবসাটি কিনে নেয়। শুরু করেন অনলাইন খাদ্য সামগ্রীর ব্যবসা বিগবাসকেট ডট কম। সারা ভারতে অসম্ভব সমাদৃত এই ভাবনা। দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিষ অ্যাপের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিলেই হল। ঘন্টাখানেকের মধ্যে আপনার বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে অবলীলায়। ‘সিরিয়াল অন্টরপ্রনেওর’ হিসাবে খ্যাত গনেশ বলেছিলেন, ‘চারটে স্টার্টআপ দিয়ে শুরু করেছিলাম। পুঁজি ছিল ২ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার। একিউট ভ্যালুয়েশন তিনশ মিলিয়ন ডলার। পুঁজি না থাকলেও ক্ষতি নেই। চলার পথে ঠিক ব্যবস্থা হয়ে যায়। দরকার শুধু অধ্যবসায়, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সঠিক প্ল্যানিং এবং তার যথাযথ প্রয়োগ। আর থাকতে হবে গভীর মনোসংযোগ’। গনেশ যখন বলতে শুরু করেছিলেন, খেয়াল করেছি, অডিটোরিয়ামের পঞ্চাশ ভাগ আসনই ছিল ফাঁকা। আর তিনি যখন তাঁর বক্তব্যের ক্লাইম্যাক্সে, অডিটোরিয়ামে তিল ধারণের ঠাই নেই। সকল উদ্যোগপতিদের বক্তব্য এমনই অমোঘ! এমন মানুষকে চোখের সামনে দেখা, তাঁর কথা শোনা – এতো ভাগ্যের ব্যাপার। তাই হয়ত যারা বাইরে ইতি উতি ঘোরাঘুরি করছিলেন, খবর পেয়ে এক ছুটে ভেতরে। ‘স্বনির্ভর ব্যবসা শুরু করার জন্য ভারত-ই সেরা জায়গা’। নির্দ্বিধায় বলে দিলেন। সঙ্গে যোগ করলেন ‘হেলথ সেকটর’ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর ইকমার্স সবচেয়ে সহজ ব্যবসা। লাভ-ও প্রচুর। আহ্বান জানালেন এই দুই নিয়ে কাজ করতে।

যাদবপুরে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং তারপর আই.আই.এম লক্ষ্ণৌ-য়ে ম্যানেজমেন্ট করা সফল বাঙালি উদ্যোগপতি কল্লোল ব্যানার্জির ব্যবসা খাবার নিয়ে। ২০১১-য় বন্ধু জয়দীপ বর্মন-কে নিয়ে শুরু করেন ‘ফ্যাসোস’ (ফরাসি ভাষায় যার অর্থ ফুড অন ডিমান্ড। যা খাবার চাইবেন তাই পাবেন।)। ভারতের বারোটি বড় শহরে কাজ করেছেন। প্রতিদিন প্রায় ২০,০০০ অর্ডার আসে খাবারের। ব্যবসায়িক বৃদ্ধিঃ মাসিক ২০-২৫ শতাংশ। মোবাইল অ্যাপ বাজারে আসে ২০১৪-য়। এখনও অবধি সেই অ্যাপ ডাউনলোড হয়েছে আট লাখ। শুধু ২০১৪-তেই অ্যাপ থেকে খাবারের অর্ডার এসেছে দু লাখের কিছু বেশি। সফল কল্লোল-ও বলে গেলেন, ‘ ভাববেন না এই সাফল্য এসেছে সহজে। প্রচুর বাধা-বিঘ্ন, ধাক্কা, ভেঙে পড়া ছিল আমাদের যাত্রাপথ। আর এই ভেঙে পড়া, লড়াই না থাকলে আপনি উদ্যোগপতি-ই নন। এই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার মানসিকতা-টা আপনার মধ্যে থাকতে হবে। তবেই আপনি সফল হবেন।

কল্লোলের কথা যে কতটা নির্ভুল, তা প্রায় চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন ‘বানিয়ান নেশন’-য়ের কর্ণধার মানি ভাজিপে। ভাইজ্যাগে বড় হওয়া মানি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (ওয়ারলেস কমিউনিকেশন)-য়ে যখন ডক্টরেট করছেন আমেরিকার ডেলাওয়ার ইউনিভার্সিটিতে তখনই আলাপ সহপাঠী, আরেক ভারতীয় রাজা মদন গোপালের সঙ্গে। সেটা ২০০২। পাশ করার পর দুজনের পথ দুদিকে চলে যায়। মানি যোগ দেন কোয়ালকম-য়ে, সানদিয়েগোয়। আর রাজা চলে যান সিয়াটেলে। একটা স্টার্টআপ মোবাইল কোম্পানির চাকরি নিয়ে। বছর দশেক পর আবার যোগাযোগ দুজনের। এবং ফোনে। ততদিন মানি ঠিক করে ফেলেছেন, ভারতে ক্রমবর্ধমান ‘ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ক্রাইসিস’ নিয়ে কাজ করবেন। চাকরি ছেড়ে দিয়েফিরে যাবেন ভারতে। রাজি হয়ে গেলেন রাজা-ও। দুজনেই ফিরে এলেন হায়দ্রাবাদে। ২০১৩-র জুলাইয়ে তৈরি হয় বানিয়ান নেশন। ‘বিশ্বাস করুন, আমাদের দেশে বর্জ্য পদার্থ জনিত সমস্যা নিবারণের বৃহত্তর উদ্দেশ্য সাধন করতেই এই সিদ্ধান্ত। টাকা রোজগার করাটা লক্ষ্য ছিল না। তেমন হলে তো আমি আমেরিকায় সুখের চাকরি করতে পারতাম। ঝামেলা নেওয়ার দরকার ছিল না। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, দেশের এই সমস্যা একা সরকারের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়’। বলেছিলেন মানি। প্রতি বছর ভারতে ৬.৭ মিলিয়ন টন রিসাইকেল যোগ্য বর্জ্য পদার্থের উৎপত্তি হয়। যার আনুমানিক মূল্য ১৯,০০০ কোটি টাকা। দেশের মোট জনসংখ্যার যে অর্ধেক মানুষ দুরারোগ্য সব ব্যাধি-তে ভোগেন, তার মূল কারণ এই বর্জ্য পদার্থ। মানি-র ‘বানিয়ান নেশন’ সে অভিশাপ-কে আশীর্বাদে রূপান্তরিত করার আহ্বানে ব্রতী। তেলেঙ্গানা এবং অন্ধ্র দিয়ে শুরু করেছেন। দু-হাজার স্থানীয় জঞ্জাল সাফাইওয়ালাকে নিযুক্ত করেছেন তাঁরা। এবং কাজ এগোচ্ছে অসম্ভব দ্রুত গতিতে। মানি-র দায়িত্ব ‘বিজনেস মডেল’ বানানো এবং তার প্রয়োগ। আর রাজা আনছেন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন। মানি বলছেন, ‘দশ বছর সময় দিন। যেভাবে এগোচ্ছি, ভারত দূষণমুক্ত হবেই’।