সুগন্ধ-গয়না ভালো থাকার পথ দেখালো অন্ধ শিল্পীদের

0

সারা বিশ্বের প্রতি তিনজন অন্ধের মধ্যে একজনের বাস ভারতে। হিসেব বলছে, ১২৫ কোটির দেশে ১.৫ কোটি পুরওপুরি অন্ধ এবং ৫.২ কোটির দৃষ্টিশক্তি দুর্বল। এদের মধ্যে ৮০ শতাংশ ভুগছেন ছানি অথবা পুষ্টহীনতায়, যাদের সারিয়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু চিকিৎকেন্দ্র এবং সচেতনতার অভাবে সেই সম্ভাবনাও ক্ষীণ। দরীদ্রসীমার নিচে যাদের বাস তাদের কাছে অন্ধত্বের প্রভাব গুরুতর। একটা সামাজিক কুসংস্কার অন্ধত্বের সঙ্গে জড়িয়ে। ফলে যারা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী তাদের কাজ জোটানোও মুশকিল। যদি পেয়েও যায় তাহলে সেটা অবশ্যই অল্প টাকায় এবং আনাড়িদের কাজে লাগানোর মতো।

এই পরিস্থিতি বদল আনতে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডিজাইন এবং রয়্যাল কলেজ অব আর্ট এর পড়ুয়ারা একটা প্রকল্পের পরিকল্পনা করেন, ‌যার নাম দেন ‘মেড ইন দ্য ডার্ক’। এই প্রকল্প হল ‘সেন্ট-বিডিং’ বা সুগন্ধি গুটি দিয়ে অন্ধ কারুশিল্পীদের তৈরি গয়না সাধারণ ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি প্রয়াস। লক্ষ্য ছিল একেবারে নতুন একটা কিছু তৈরি করে অন্ধ কারুশিল্পীদের আয়ের পথ এবং সামাজিক মানোন্নয়ন ঘটানো। ‘সেন্ট-বিডিং’-এর এই কারুশিল্প অন্ধ শিল্পীদের গয়না তৈরির দক্ষতা বাড়ায়। আহমেদাবাদের কয়েকটি গয়নার ব্র্যন্ড যেমন খুশবু ডাবলিশ, ডিপেন টোপ্পো, রুবি স্টিল,হ্যাল ওয়াটস এবং জন ফ্রেজার এই শিল্পকে স্টাইল স্টেটমেন্ট করে নিয়েছে।

ডিজাইন টিম চেয়েছিল অন্ধ মহিলা কারুশিল্পী যারা ইতিমধ্যে কাজ করছেন তাঁদের দিয়েই একটা নতুন শিল্প তৈরি করে কারিগরদের সামনের সারিতে নিয়ে আসতে। রং এবং গন্ধের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে একটা নতুন ভাষা তৈরি করলেন, যে গন্ধ বুঝিয়ে দেবে কোন রঙের গুটি ব্যবহার করা হচ্ছে। এভাবে অন্ধ কারুশিল্পীরা তাঁদের পছন্দের ডিজাইনের এবং গন্ধের অলঙ্কার তৈরি করতে পারেন। হাতে বানানো একেবারে ভারতীয় ডিজাইন এবং সুন্দর হালকা গন্ধ, চোখ বন্ধ করে তার সৌন্দর্য অনুভব করা যায়।

অন্ধদের ভালো রাখতে এবং মর্যাদা বাড়াতে স্বপ্ন দেখাচ্ছে এই নতুন ধরণের হস্তশিল্প। ছুঁয়ে দেখে বোঝার যে ক্ষমতায় অন্ধরা সাধারণত অভ্যস্ত, এবার গন্ধ শোঁকার প্রক্রিয়াটিও আত্মসম্মান বাড়াতে এবং সমাজে থাকার নতুন মানে খুঁজে দেয় তাঁদের। ‘মেড ইন দ্য ডার্ক’ ব্লাইন্ড পিপলস অ্যাসোসিয়েশন এবং আঁধার কন্যার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে। আঁধার কন্যা সংস্থাটি মূলত অন্ধ বাচ্চাদের পড়শোনা এবং গোটা গুজরাত থেকে আসা সব বয়সের অন্ধদের নানা কাজের প্রশিক্ষণ দেয়। ‘অন্ধরাই মেড ইন দ্য ডার্ক প্রজেক্টের মূল অংশীদার। সেন্ট-বিডিংকে প্রতিষ্ঠা দিতে আমাদের একটা ব্যবসায়িক পরিকাঠামো তৈরি করতে হয়েছে, যেটা খুচরা ব্যবসা, সামগ্রী সরবরাহ এবং ক্রেতা সমালাতে দক্ষ। ভারতের দ্রুত বেড়ে চলা মধ্যবিত্তরাই আমাদের গ্রাহক। তাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে আমরা গয়না ডিজাইন করি’, বলছিলেন জন।। ‘মেড ইন দ্য ডার্ক’ টিম বুঝতে পারছে ভারতে নীতিবান খুচরো ব্যবসায়ীর সংখ্যা বাড়ছে। বিজনেস প্ল্যানের অংশ হিসেবে সেন্ট-বিডিং গয়নার পেছনের লড়াই, কাহিনী জানিয়ে মেড ইন দ্য ডার্ক ব্র্যান্ড ব্যবসায়ীদের নীতিবোধকে জাগিয়ে তোলে।

২০১১ সালে ডিজাইন ফর স্যোশাল ইমপ্যাক্ট অর্থাৎ সমাজে প্রভাব ফেলেছ এমন কিছু ডিজাইন বিভাগে ‘কোর ৭৭ ডিজাইন অ্যাওয়ার্ড’ পায় ‘সেন্ট জুয়েলারি মেড ইন দ্য ডার্ক’। ‘যে জায়গাটায় সেন্ট-বিডিং অন্য হস্তশিল্প থেকে আলাদা সেটা হল, রং-গন্ধের ভাষার মাধ্যমে শিল্পীদের সুপ্ত প্রতিভা বের করে আনা। আমরা পোশাক শিল্প, সেলাই, কাঠের কাজ এমনকী আঁকায় দক্ষ এমন অনেক অন্ধ শিল্পীদের সঙ্গে যাগাযোগ করি। রং-গন্ধের সম্পর্কের এই মাধ্যম এইসব ক্ষেত্রেও যথেষ্ট কার্যকরি হতে পারত। কিন্তু সব পরীক্ষা নিরীক্ষা সরিয়ে রেখে সেন্ট-বিডিং বা গন্ধ-গুটিকেই আলাদা করে নিয়েছিলাম, যাতে খুব দ্রুত অন্ধ মানুযগুলিকে কিছু সুবিধা দেওয়া যায়’, সংযোগ করলেন জন।

পন্য বিক্রির মাধ্যমে এই ব্ৰ্যান্ড সেন্ট বিডিং নিজের প্রেক্ষাপট সবাইকে জানায় এবং ক্রেতাদের অন্ধত্ব নিয়ে সচেতন করে। পুরও প্রক্রিয়াটাই চোখ সুরক্ষার সহজ ব্যাখ্যা দেয়। পল জানান, ‘আমাদের প্রাথমিকভাবে তিনটি লক্ষ্য রয়েছ- অন্ধ শিল্পীদের জন্য স্থায়ী রোজগারের ব্যবস্থা করা, ভারতে অন্ধদের সামাজিক মর্যদা তৈরি করা এবং প্রতিরোধযোগ্য অন্ধত্বের সমস্যা নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা। নতুন শিল্প সেন্ট-বিডিং এবং মেড ইন দ্য ডার্ক ব্র্যান্ড একসঙ্গে অন্ধ মানুষগুলোর কাছে এবং ভারতে স্বাস্থ্য সচেতনতার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের পথ দেখাচ্ছে’।