নবীন দৃষ্টি -অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো

0

সীমিত দৃষ্টিশক্তি কিন্তু সীমাহীন দূরদর্শীতা। নবীন লাক্কুর তাঁর দৃষ্টি দিয়ে বাইরের বিশ্বের থেকেও ভেতরের স্বত্বাকে বেশি অনুভব করেন।নবীন একটি উচ্চ প্রযুক্তি সংস্থা Board of Compassites এর সহ প্রতিষ্ঠতা এবং সদস্য। তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত ২৪টি নতুন উদ্ভবনী চিন্তার বিকাশ হয়েছে। সম্প্রতি নবীনের ক্রমাগত সাফল্যের মুকুটে আরকেটি পালক তাঁর বই প্রকাশ ‘The Inseparable Twins: Paired Principles to Inspire Young Minds’।উদ্ভাবণী চিন্তা শক্তিই দৈহিক অক্ষমতার উর্ধে নিয়ে গেছে নবীনকে।এক সাধারণ মানবের উচ্চতাই পৌঁছানোর কাহিনী।

গল্পটি কোনও সাধারণ গল্প নয়, সাধারণ ভাবে এটাকে ব্যাখ্যা করাও যায় না। গল্পটির বিষয় শারীরিক অক্ষমতাকে পরাজিত করে মানবের ইচ্ছা শক্তির জয়।

অন্ধ কবি জন মিলটন একটি প্রশ্ন উস্কে দিয়েছিলেন তাঁর কবিতায় –

“Doth God exact day-labour, light denied?”

না, ভগবান প্রশ্নটির উত্তর দেননি। উত্তরটা দিয়েছিলেন মানব মিলটন নিজেই –

“God doth not need
Either man’s work or his own gifts: who best
Bear his mild yoke, they serve him best. His state
Is kingly; thousands at his bidding speed
And post o’er land and ocean without rest:
They also serve who only stand and wait.”

কোন রকম চিকিৎসার বালাই না রেখেই বাকি জীবনটায় অন্ধত্বটাকে নিজের সঙ্গী করে নেন। নিজের মাঝেই এই অন্ধ কবি বলে উঠেন, “They also serve who only stand and wait,”। নিজেকে হয়তো বোঝাতে চেয়েছিলেন যারা কষ্ট সহ্য করতে পারে তারাই ভগবানের সেবা করে। নিজের দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত “Paradise Lost”

আগস্ট মাস ১৯৯৭। সালে নবীন লক্কুরের বিবাহের তৃতীয় বছর প্রায় ছুঁই ছুঁই। তিন বছরের বিবাহিত জীবনে নিজের গৃহিনীকে বেশী সময় দিতে পারেননি নবীন। এই সময় তাঁর বন্ধুর শশুর বাড়ীর আত্মীয়র কাছে থেকে বেড়াতে যাবার প্রস্তাব আসে, তাঁর সাথে ব্যাগ গুছিয়ে চেন্নাইয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন সপ্তাহান্তের স্বাধীনতা উপভোগ করতে। তখনও জানতেন না এই ছোট স্বাধীনতা উদযাপনই তাঁর গোটা জীবনটাকেই পরিবর্তন করবে। চেন্নাইয়ে মন্দির দর্শনের পর তাঁরা MGM Dizzy World থিম পার্কে গেলেন। ওখানে ওয়াটার পুলে নেমে পড়লেন। জলে নামা মাত্রই সবাই তাঁর চোখে জল ছুড়তে লাগল। এভাবে জলে থাকতে নবীনের বেশ ভালোই লাগে।

এই ঘটনার এক সপ্তাহ বাদে নবীন নাইট শোতে শাহরুখের পরদেশ দেখছিলেন। হঠাৎ অনুভব করলেন তাঁর চোখের সামনেটা কাঁপছে এবং অস্পষ্ট হয়ে আসছে। তিনি বাম চোখটা বন্ধ করলেন দেখলেন ডান চোখে ঠিকই দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু একই ব্যপার যখন বাম চোখের সাথে করলেন আবার সেই সমস্যাটি শুরু হয়ে গেল। পরের দিন সন্ধ্যায় একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করার পর জীবনের প্রথম আঘাতটি পেলেন, তিনি জানালেন, “আপনার বাম চোখ অন্ধ হয়ে গেছে। আপনি এই চোখ দিয়ে হয়তো আর দেখতে পাবেন না।” তাঁর পরামর্শেই নবীন একজন রেটিনা বিশেষজ্ঞের সাথে দেখা করলেন।

রেটিনা বিশেষজ্ঞ তাঁকে আরও বড় দুঃসংবাদ দিলেন। তিনি জানালেন নবীনের রেটিনা সম্পূর্নভাবে নষ্ট হয়ে গেছে এবং তিনি তারপর দিনই হাসপাতালে অস্ত্রপোচারের জন্য ভর্তি হতে বললেন। অস্ত্রপোচারের কথা শুনেই নবীন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন এবং তাঁর কাজকর্মের কথা ভেবে ডাক্তার অনুরোধ করলেন অস্ত্রপোচারের পর তাঁকে এক সপ্তাহের বদলে যেন তিন দিনেই ছেড়ে দেন।

রেটিনা বিশেষজ্ঞ ডঃ ওয়াই এল রাজশেখর, যিনি নবীনের এই জটিল অস্ত্রপোচারটি করলেন, তিনি জানালেন অপেক্ষাকৃত শান্ত জলের ঝাপটা নিতে। পাথরের মতো কোন জিনিষ তার চোখে আঘাত করায় এই সমস্যা। এই অস্ত্রপোচারের ফলে ২০% দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য যেন কোন ভাবেই নবীনের পিছু ছাড়ছে না। ডাক্তার জানালেন তাঁর ডান চোখের রেটিনাতেও একটা ক্র্যাক তৈরী হয়েছে। আরেকটি একই রকম অস্ত্রপোচার তাঁর ডান চোখেও করতে হল। নবীন সম্পূর্নরূপে তাঁর দৃষ্টি শক্তি হারালেন। যদিও দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার একটা ক্ষীন সম্ভাবনা থেকে গেল। পরবর্তী তিন মাস তাঁকে পেটের ভরে ঘুমাবার নির্দেশ দেওয়া হল যাতে রেটিনা নিজের স্থান থেকে সরে না যায়। এটা সেই চরম মুহুর্ত যেটা নবীনকে সহ্য করতে হয়েছিল, অধিকাংশ সময়টাই তাঁকে বিছানায় বন্দি থাকতে হয়েছিল।

এই মুহুর্তে নবীনের আর কোনও কাজ নেই। ভাবনাই তাঁর সঙ্গী। নিজের মধ্যেই ভেবে চলেছেন অনেক কিছু। একবার ভাবলেন “যদি আমি টেলিফোন অপারেটর হোতাম।” এভাবেই চলছিল এক ক্ষীন ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে। একদিন তাঁর বন্ধু রাজেশ শেট্টি তাঁকে একটি চিঠি লিখলেন, সেখানে লেখা ছিল, “সমস্যা হিরোদের কাছেই আসে যাতে তাঁরা সেগুলিকে জয় করে”। রাজেশের এই কথাগুলি নবীনকে যেন নতুন করে উঠে দাঁড়াবার ক্ষমতা দিল। তিনি তাঁর বন্ধদের তাঁর অন্ধত্ব এবং অক্ষমতার কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর আরেক বন্ধু প্রকাশ ভেঙ্কটেশ তাঁর জন্য ২০ টি কাজের একটি তালিকা তৈরী করে তাঁর কাছে পাঠালেন। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি তাঁর দুঃসময়ে আরেকটি দুঃখ যোগ হল। তাঁর কোম্পানি C-Design Systems এর ১১ জন কর্মচারী তাঁকে তাঁর অফিসের চাবি দিয়ে ইস্তফা দিলেন।

ঠিক এই পরিস্থিতিটাই নবীনকে তাঁর বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াতে বাধ্য করল। তিনি তাঁর স্ত্রী এবং বন্ধুদের সাহায্যে তাঁর অফিস পুনরায় চালু করলেন এবং ছয় মাসের চেস্টায় তাঁর ব্যবসাটাকে দাঁড় করালেন। এইটাই তাঁর সেই চোয়াল শক্ত করা মানসিকতা যা তাঁকে হার মানতে বাধা দেয় এবং চারিদিকে নিকষ অন্ধকার সত্তেও আলো জ্বালাবার ইচ্ছা শক্তি প্রদান করে। বেদনাদীর্ন শরীর দুরাশাগ্রস্থ মনের কাছে অনেক সময় আত্মসমর্পন করে কিন্তু ইতিবাচক চিন্তা সবসময় বেদনাকে তুচ্ছ করে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে।

একটা বিখ্যাত উক্তি আছে, “যখন সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, তখুনি একটা নতুন রাস্তা খুলে যায়”। নবীনের জন্যও একটা নতুন দরজা খুলে গেল। তাঁর বন্ধু প্রকাশ ভেঙ্কটেশ তাঁর জন্য যে ২০ টি কাজের একটি তালিকা তৈরী করেছিলেন, তাঁর একটি সফটওয়্যার তৈরী করা হল। সারা ভারতব্যাপী ছড়ানো ব্যবসায় প্রকাশ একটি সমস্যা সম্মুখীন হচ্ছেন। তাঁর ব্যবসায় পন্যের সরবরাহ এবং চাহিদা বিষয়ে সমস্যা ছিল, কখনও কখনও অর্ডার খুব বেশি থাকত এবং কখনও স্টক পড়ে থাকতো। নবীন এই বিষয়টিকে সামলালেন, তিনি ঐ ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার মাধ্যমে প্রকাশের জমা হওয়া স্টক এবং পন্যের সরবরাহ এবং চাহিদার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব তৈরী করতে পারলেন। এভাবেই প্রকাশের ব্যবসায় একটা গতি এলো।

২০০০ সালটা নবীনের জন্য উজ্জ্বলতা নিয়ে এলো। কিন্তু নতুন করে চোখের সমস্যা আবার তাঁর দৃষ্টি শক্তি কেড়ে নিল। তিনি কিছু দেখতেও পেলেন না, কিছু পড়তেও পারলেন না। তিন বছরে তাঁর চোখে ১৪ বার অস্ত্রপোচার করা হল। বারবার চোখের সমস্যা নবীনকে হতাশার সাগরে ফেলে দিল। নিজেকে নিজের কাছেই বোঝা মনে হল তাঁর।

দৃষ্টি ফিরে পাওয়া আবার চলে যাওয়ার হতাশাঘন মুহূর্তেই তাঁর ডাক্তার দশেরার দিনে তাঁকে শ্রী সত্য সাঁই বাবার কাছে যাবার পরামর্শ দিলেন। এই সময় ঘুরে দাঁড়াবার আবার একটা আশা দেখা গেল, দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার জন্য তিনি যেন এক আশ্চর্য সংকেত পেলেন। এইভাবে আধ্যাত্মিক যোগ তাঁর মনে অনেক প্রশ্নের উদয় ঘটাল এবং তাঁর উত্তর খুঁজতেও তাঁকে উৎসাহিত করল। নবীন এখন শ্রী সত্য সাঁই বাবার একনিষ্ট বিশ্বাসী। তিনি বিশ্বাস করেন শ্রী সত্য সাঁই বাবা তাঁর দৃষ্টি ফিরে পেতে সাহায্য করবেন।

জীবনের অনেক উত্থান পতনের পর নবীন এখন একজন পরবর্তীত মানুষ। তাঁকের তাঁর দুঃসময়ে সাহায্যের জন্য অনেক মানুষকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। ভগবানকেও তাঁর জীবনের টানাপড়েনে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন। নবীন তাঁর দৃষ্টি কিছুটা ফিরে পেয়েছেন। সম্পূর্ন ভাবে দৃষ্টি না ফেরার জন্য তিনি তাঁর সামনের জিনিসটুকুই দেখতে পান – ঠিক ঘোড়া যে ভাবে দ্যাখে। দৃষ্টি শক্তির অল্পতায় কখনও কখনও হ্যান্ডসেক মিশ করে যান কিন্তু কোনও কিছু সম্পূর্ন করতে কখনই মিশ করেন না। তাঁর স্বমহিমায় নিজেকে ব্যাখা করেন, “Naveen Lakkur is a person with limited sight but unlimited vision. That is who I am by divine grace.”

এখন নবীন তাঁর নতুন উদ্ভবনী চিন্তার মাধ্যমে একজন সফল ব্যবসায়ীতে পরিনত হয়েছেন। সম্প্রতি তাঁকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের Vistage Group এর পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে তাঁকে ব্যবসায়িক সম্বন্ধীয় বিষয়ের উপর একটি বক্তৃতা দিতে হতো। কিন্তু যখন তিনি বুঝতে পারলেন ঐ জায়গাটি তাবড় তাবড় বিলিয়ন ডলারের মালিক ব্যবসায়ী দ্বারা পরিপূর্ন তখন তিনি তাঁর বক্তৃতার প্রসঙ্গ পরিবর্তন করলেন। তিনি ঐ শ্রোতাদের তাঁর জীবনের মুহুর্তের গল্প শোনালেন, শোনালেন তাঁর দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ের কথা। তিনি তাদের বললেন, “I lost my sight to gain vision—fourteen of which have become commercially viable businesses.”

নবীন এখন একটি উচ্চ প্রযুক্তি সংস্থা Board of Compassites সহ প্রতিষ্ঠতা এবং সদস্য। এদের কর্মকান্ড ব্যাঙ্গালোর, পুনে, সিডনি এবং কেন্টে বিস্তৃত। তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত আরও ২৪টি নতুন উদ্ভবনী চিন্তার বিকাশ হয়েছে। এর সাম্প্রতিকতমটি হল HomeConnect, এর মাধ্যমে আপনি আপনার দোর গোড়ায় পরিষেবা পেয়ে যাবেন।

নবীন বিশ্বাস করেন তিনি তাঁর দৃষ্টি দিয়ে বহির বিশ্বের থেকেও তাঁর ভিতরের স্বত্বাকে বেশি অনুভব করেন যা তাঁকে অকল্পনীয় উচ্চতায় তুলেছে। তাঁর উদ্ভাবণী চিন্তা শক্তিই তাঁকের দৈহিক অক্ষমতার উর্ধে নিয়ে গেছে। তাঁর কাহিনী এক সাধারণ মানবের উচ্চতাই পৌঁছানোর কাহিনী।

সম্প্রতি নবীনের ক্রমাগত সাফল্যের মুকুটে আরকেটি পালক সংযোজিত হয়েছে। তিনি তাঁর বই প্রকাশ করেছেন The Inseparable Twins: Paired Principles to Inspire Young Minds। ব্যাঙ্গালোরে এই বই প্রকাশের দিন বহু বিখ্যাত মানুষ উপস্থিত ছিলেন প্রত্যেকেই তাঁর দৃষ্টি হীনতা থেকে অর্জিত দর্শনের প্রশংসা করেন। এই বই থেকে যা আসবে তা বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্পে উৎসর্গ করা হবে।

ব্যবসায়িক উদ্ভাবনীর বিকাশ ছাড়াও নবীন তাঁর চরিত্রের এক নতুন দীশা রুপায়ন করেছেন। জীবনের ইতিবাচক দিকগুলির উপর আলকপাত করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। তিনি তাঁর জীবনের ঘুরে দাঁড়ানোকে এভাবে ব্যাখা করেছেন। “I wouldn’t have achieved even a quarter of what I have achieved today if I had not met with that freak accident.”