সুন্দরবনে অন্য ভাস্করের কাহিনি

0

কেউ মূর্তি বানান মাটি দিয়ে। কেউবা ছেনি, হাতুড়ি ঠুকে তৈরি করেন অনুপম ভাস্কর্য। শিল্পী হয়েও সুন্দরবনের সন্তোষ বিশ্বাস কিন্তু অন্য পথের পথিক। সামান্য এক খণ্ড বাঁশ দিয়ে তিনি এমন সব শিল্পকর্ম করে চলেছেন যা দেখে নিতান্ত বেরসিকও বলে উঠছেন, আহা কী দেখলাম! জন্ম-জন্মান্তরেও ভুলিব না।


দেশ স্বাধীন হওয়ার পরই পূর্ববঙ্গ থেকে যখন এপারে আসেন তখন প্রায় কপর্দকশূন্য অবস্থা। ৯ ভাই-বোনের বিশাল সংসার। ঠাকুর্দা ছিলেন বরিশালের নাম করা চিকিত্সক। বাবাও সেই পথে। চিকিত্সক পরিবারের সন্তানের অবশ্য শুরুর দিকে এসবে তেমন মন ছিল না। সুন্দরবনের তালদিতে যখন ছেলেবেলায় আসেন তখন চারিদিকে গাছের ভিড়। বিশেষত বাঁশ গাছের বাড়বাড়ন্ত। ছোট থেকেই রং-তুলি ছিল দুর্বলতার জায়গা। ছবি এঁকে যেন মন ভরছিল না। আরও, আরও কিছু করতে হবে। চলে গেলেন কুমোরটুলিতে এন সি পালের কাছে। কয়েক দিন মাটি ঘেঁটে বুঝতে পারলেন এই কাজ তাঁর জন্য নয়। গ্রামবাংলার মাটির ফসল নিয়েই শুরু হয় অন্য পথে হাঁটা। যার দিকে কারও নজর থাকে না সেই বাঁশ দিয়ে সুন্দরবনের অখ্যাত জায়গায় শুরু করেন শিল্পকর্ম। নিজে অবশ্য ডাক্তার হতে পারেননি, কিন্ত বাঁশ হাতে পেলে তাঁর হাতটা দক্ষ সার্জেনের মতো হয়ে ওঠে। সেই নিপুণ হাতে সৃষ্টি হতে থাকে বাঁশের ময়ূরপঙ্খী নৌকা থেকে নানা রকমের‌ ভাস্কর্য।


তালদিতে যখন একটু একটু করে এগোচ্ছেন, তখন খবর পান শিল্পী সন্তোষ ভট্টাচার্যের। সোনারপুরের সন্তোষবাবুর কাছে বাঁশের তালিম পাওয়ার পর আর থেমে থাকেননি। দিন-রাত এক করে বাঁশ নিয়ে নানারকম সৃষ্টিতে মগ্ন হয়ে পড়েন সন্তোষ বিশ্বাস। তাঁর হাতযশের কথা পৌঁছে গিয়েছিল তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের কাছে। মুখ্যমন্ত্রী ঠিক করেছিলেন এমন শিল্পীকে বাঁশের কারুকার্যের অন্যতম পীঠস্থান জাপানে পাঠাতে পারলে লাভ সকলের। কিন্তু নানা কারণে সন্তোষবাবুর আর জাপান যাত্রা হয়ে ওঠেনি। সেলই আক্ষেপটা অবশ্য কয়েক বছরের মধ্যে খানিকটা মিটেছিল শিল্পীরা। ষাটের দশকে কলকাতায় এসেছিলেন রানি এলজাবেথ। ভারত সফরের কিছু দিন আগে বিয়ে হয়েছিল রানির। এলিজাবেথের জন্য উপহার হিসাবে ময়ূরপঙ্খী নৌকা গিয়েছিল এই শিল্পীর কাছ থেকে। এখানেই শেষ নয়। অল ইন্ডিয়া হ্যান্ডিক্রাফট প্রদর্শনীতে তিনি একাধিকবার প্রথম হয়েছিলেন।


একবার আর্ট কলেজের এক প্রদর্শনীতে অন্যরকম অভিজ্ঞতা হয়েছিল শিল্পীর। তাঁর কথায়, ‘কোনও কারণে আমি সেবার পুরস্কার পাইনি। প্রতিযোগিতার প্রথম পুরস্কার ছিল ২৫০ টাকা। কিন্তু এক নির্বাচক বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন নির্বাচনটা ঠিকঠাক হয়নি। তিনি আমার বাড়িতে ৫০০ টাকার চেক পাঠিয়ে দেন। উনি বলেছিলেন, এই অর্থ দেওয়ার অর্থ হচ্ছে আমি ভুল শুধরে নিলাম।’ প্রৌঢ়ের গলায় যেন তৃপ্তির রেশ চুঁইয়ে পড়ে। রাজ্যের বাইরে বিভিন্ন প্রদর্শনীতেও যথেষ্ট সমাদর পেয়েছে এই শিল্পীর কাজ। পরবর্তী প্রজন্মকেও কিছু দিয়ে যেতে চান।


পঁয়ষট্টিটা বসন্ত পার হয়ে গিয়েছে। শরীর চাইলেও মন এখন আর তেমন দেয় না। তাই বাঁশের কাজ থেকে কিছুটা গুটিয়ে নিয়েছেন সন্তোষবাবু। তবে সবটা হয়তো পারেননি। তাই যে পরিবারের রক্তে ডাক্তারি সেখানে অন্য কিছু আর কতদিন চলবে। সুন্দরবনের মতো জায়গায় যেখানে এমবিবিএস ডাক্তার ঠিকমতো পাওয়া যায় না। মাইলের পর মাইল কার্যত স্বাস্থ্য পরিষেবা থেকে দূরে থাকতে হয়, সেই দূরত্ব ঘোচানোর পথে নীরবে তিনি নেমে পড়েছেন। ওষুধ-প‌থ্য নিয়ে সাহায্য করেন। যে যা দেয় তাই নেন। আসলে বাপ-ঠাকুর্দার থেকে তিনি শিখেছিযলেন সেবাই যে ধর্ম।