বিশ্বের দরবারে দেশের মান রাখল কাটোয়ার খুদে

0

বাড়িতে খেলাধুলো নিয়ে উৎসাহের অন্ত নেই। দাদু বলাইগোপাল চট্টোপাধ্যায় গ্রামের নামী ফুটবলার। খেলা ছাড়ার পর ক্রীড়া সংগঠক। সারা বছর গ্রামে খেলাধূলার আয়োজনে ব্যস্ত। দাদুকে দেখে একটু একটু করে তৈরি হয়েছে অনিকেত। দাদুর হাত ধরেই প্রথম ক্যারাটে ক্লাসে যাওয়া। যত উৎসাহ দাদুর কাছ থেকেই পাওয়া। খুদে নাতিও মান রেখেছে বলাইগোপালের। মাত্র আট বছর বয়সেই বিশ্ব ক্যারাটের মানচিত্রে ভারতীয় হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।

মে মাসে বিশাখাপত্তনমে আয়োজিত সর্বভারতীয় ক্যারাটে প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়। কাটোয়ার বিজয়নগর গ্রামের বছর আটের অনিকেত সবার নজর কাড়ে। একদিকে অদম্য নিষ্ঠা, অন্যদিকে সাফল্যের খিদে আর জেদ। এই দুইয়ে ভর করে ছুটছে খুদে ক্যারাটে বীর অনিকেতের বিজয়রথ। 

সম্প্রতি গুজরাটের ভদোদরায় ত্রয়োদশ আন্তর্জাতিক ক্যারাটে প্রতিযোগিতার আসর বসে। কাটোয়ার বিজয়নগরের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র অনিকেত চট্টোপাধ্যায় সেই প্রতিযোগিতায় দেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে। জুনিয়র বিভাগে লড়ে ‘কাতা’য় স্বর্ণপদক ও ‘কুমিত’-এ রৌপ্যপদক পায়। এই খবর গ্রামে পৌঁছতেই খুশির হাওয়া। সোনার ছেলে অনিকেত এখন বিজয়নগরের গর্ব।

বিস্ময়ের ঘোর কাটতেও সময় লেগেছে প্রতিবেশীদের। এমন রোগা-পটকা ছেলে কীভাবে অন্য দেশের ছেলেদের ক্যারাটের প্যাঁচে কাত করল? ‘ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইরান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ইংল্যান্ড সহ মোট ৭ টি দেশের প্রতিনিধিরা এই চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেয়। প্রতি বিভাগে ১৪ জন করে প্রতিযোগী। তাদের অনায়াসে কাত করে অনিকেত আগামী বছর ইংল্যান্ডে আন্তর্জাতিক ক্যারাটে প্রতিযোগিতায় যোগদানের ছাড়পত্র পায়’, বলছিলেন প্রশিক্ষক রাজু শিকদার। দাদু বলাইগোপাল নাতির সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। বছর দুয়েক আগে প্রয়াত হন। দাদুর অভাব ভালোভাবেই বোঝে অনিকেত।

কিন্তু লন্ডনে যাওয়ার ছাড়পত্র পেলে কী হবে, অনিকেতের সবচেয়ে বড় বাধা পারিবারিক অর্থসঙ্গতি। অনিকেতের বাবা শুভময় চট্টোপাধ্যায়ের রোজগার বলতে একটি কম্পিউটার সেন্টার। সেটা চালিয়ে যা আয় তা দিয়ে সংসার, ছেলের পড়ার খরচ, ক্যারাটে প্রশিক্ষণের খরচ সব ওই এক কম্পিউটার সেন্টার থেকেই আসে। আর্থিক দুশ্চিন্তার কাছে ছেলের সাফল্যের আনন্দও ফিকে হয়ে যাচ্ছে। কারণ সংসার চালিয়ে ছেলের লন্ডন যাওয়ার টাকা কোথা থেকে জোগাড় হবে সেই দুশ্চিন্তা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে অনিকেতবাবুকে। তাঁর কথায়, ‘অলিম্পিকে ক্যারাটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ছেলেকে সেই মতো তৈরি করছি। তার আগে লন্ডনের প্রতিযোগিতায় যোগ দেওয়া জরুরি। কিন্তু খরচ জোগাড় করতে না পারলে হয়তো সেই আশা পূর্ণ হবে না। আর লন্ডন না গেলে অলিম্পিকে সুযোগ পাওয়াও অনিশ্চিত’।

প্রতিবেশীরা অবশ্য আশ্বাস দিচ্ছেন, অনিকেতের এতবড় সাফল্য মাঠে মারা যাবে না। একটা কিছু ব্যবস্থা হবেই। এইসবে অবশ্য হেলদোল নেই খুদে অনিকেতের। একরত্তি ছেলে যেন বোধিলাভে ধ্যানমগ্ন। বাড়ির লাগোয়া চত্বরে ক্যারাটের প্যাঁচ কষেই চলেছে একাগ্র মনে।