হেরে গেলেও স্টার্টআপে সততাই পথ

0

ঠিক দু বছর আগে একটা স্টার্টআপ খুলেই ভেবে নিয়েছিলাম বড়লোক হয়ে যাব। অসম্পূর্ণ প্রোডাক্ট নিয়ে কাস্টমারদের কাছে যেতাম। ফল যা হওয়ার তাই হল। স্টার্টআপ দাঁড় করতে পারলাম না। অন্য ভেঞ্চারে পাড়ি জমালাম। উদ্যোগের নতুন দ্বার উন্মোচিত হল আমার জন্য। আমার মেন্টর কাম কো-ফাউন্ডারের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখলাম। আমরা বাইরে ফান্ডিংয়ের ব্যাপারে তেমন একটা উৎসাহী ছিলাম না। কিছু বাড়তি রোজগারের জন্য বিভিন্ন স্টার্টআপে ফ্রিলান্সার হিসেবে কাজ করতাম।

যতক্ষণ ভুল থেকে কিছু শেখা হচ্ছে এবং সেখান থেকে শুধরে নেওয়ার চেষ্টা চলছে, ততক্ষণ ব্যর্থতার মধ্যে খারাপ কিছু নেই। আমার প্রথম স্টার্টআপে টাকা এবং সময় দুই খুইয়েও ছেড়ে দেওয়ার কথা মাথায় আসেনি। একটায় ব্যর্থ হয়ে অন্য আরেকটা স্টার্টআপে সহ প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কাজ শুরু করি। প্রোডাক্ট তৈরি ছিল। এবার ভালোভাবে মার্কেটিং করব বলে ঠিক করে নিই। কয়েক মাসের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের পছন্দসই মাপকাঠিও পেয়ে যাই। বিনিয়োগ আসা তখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। দারুণ সব মেন্টর আর বিনিয়োগকারী চলে আসেন। আমাদের টিম, প্রোডাক্ট এবং কাজে সবাই বেশ খুশি। তারপরও বাজার থেকে টাকা তুলতে পারিনি। কেন? কারণ বিনিয়োগকারীরা যেভাবে চাইছিল সেভাবে প্রোডাক্ট বদলানোর জন্য রাজি ছিলাম না আমরা। ইনভেস্টররা তাদের জায়গা থেকে ঠিকই বলছিলেন, কারণ তাদের টাকা ব্যবসায় খাটবে। আমাদের জায়গায় আমরাও ঠিক। কারণ প্রোডাক্ট আমাদের। এই গেরোয় আটকে ডিল করা আর হল না। অনুশোচনাও নেই তাতে। আমাদের উৎসাহে কমতি নেই। সারা বিশ্ব যদি ব্যর্থও বলে, আমাদের দৃষ্টিতে আমরা সফল। বুঝতে পারছিলাম, শিক্ষায় পরিবর্তন আনাটা সহজ ছিল না। যারা ছাত্রদের কাছে নম্বর আর রেঙ্ক বিক্রি করে, আমরা তাদের মতো নই। ওই পথ ছেড়েই দিলাম শেষ পর্যন্ত।

এন্টারপ্রেনারশিপ হল জীবনের একটা ধারা। উদ্যোক্তা অথবা চাকরি যেকোনও একটা বেছে নেওয়া যেতে পারে। নিজের পথ ঠিক করা যেতে পারে অথবা যিনি চাকরি দিচ্ছেন তাঁর পথে চলতে হতে পারে। স্টার্টআপ শুরু করে যদি ইনভেস্টরদের কাছে মাথা নোয়াতে হয় তাহলে, উৎসাহে ঘাটতি পড়তে বাধ্য। সেক্ষেত্রে মাইনে হারানোর ভয়ে মাথা গুঁজে যারা শুধু চাকরি করে যায়, তার সঙ্গে ইনভেস্টরদের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করা উদ্যোক্তার মধ্যে কোনও ফারাক নেই। স্বপ্নের স্টার্টআপ খোলার উদ্দেশ্যর থেকে টাকা রোজগার বেশি জরুরি হওয়া মানে ইঁদুর দৌড়ে থেকে যাওয়া। কর্পোরেট চাকরিতে বছর বছর ইনক্রিমেন্ট আর প্রমোশনের ইঁদুর দৌড়। আর স্টার্টআপে ফান্ড জোগাড়ের রেস চলতেই থাকে। দুটোর মধ্যে তফাৎ কোথায়? জীবন অথবা ব্যবসা, যাই হোক না কেন টাকা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু দৌড় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ ইঁদুর রেসে প্রথম হলেও ইঁদুরের তকমা ঘুচবে না। ঠিকই করে নিয়েছিলাম গড্ডালিকায় গা ভাসাবো না। আমি এখনও স্টার্টআপ নিয়েই পড়ে আছি এবং দারুণ উপভোগ করছি।

আমার মেন্টর শিখিয়েছেন, ‘কোনও কিছু আশা না করে এগিয়ে যাওয়াই ঠিক পথ। সারা বিশ্ব সেই দিকেই তাকাবে’। অরবিন্দ ইভকেয়ার বা সার্ভিস স্পেসের মতো অনেক সংস্থা রয়েছে যারা ফলের আশা করে না। আমিও ধীরে ধীরে এগোচ্ছি আর শুধু দিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি গ্রহণ করার চেষ্টা করছি। আমি unKarma.in প্রজেক্টের একটা অংশ। এখানে আমরা বিশ্বকে সবার কাছে স্বর্গ করে তুলতে নানা প্রজেক্ট নিয়ে কনটেন্ট লিখি।

খেতে ভালোবাসি, অনেকক্ষণ ধরে ঘুমোই, কখনও মেডিটেশন করি। কিন্তু ঘুম-খাওয়া নিয়ে আমি কখনই খুব বেশি ভাবিনি। এখনও তাতে কোনও বদল আসেনি। একটু সচেতন হয়েছি খালি। আমার আশেপাশের লোকজন নিজেদের খাওয়া এবং লাইফস্টাইল নিয়ে বেশ জানকারি রাখে। ইদানীং দেখছি অনেকে ফাস্টফুড, চিনি, প্যাকেটজাত খাবার এড়িয়ে চলছেন। বরং ভেষজ খাবার, মধুর মতো প্রাকৃতিক মিষ্টিজাত খাবারের দিকে ঝুঁকছেন। আমি কখনও ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠতাম না। কিন্তু উদ্যোক্তা বনে যাওয়ার পর সেই অভ্যেসেও পরিবর্তন আনতে হয়েছে। উঠতে হয় ভোরে। নিয়ম করে অন্তত আট ঘণ্টা যাতে ঘুম হয় তার জন্য রাত নটায় শুয়ে পড়ি। মেডিটেশনে নিয়মিত নই, কিন্তু চেষ্টা করছি নিয়মিত যাতে হয়। ঠিকঠাক খাবার, ঘুম এবং মেডিটেশন শরীর ঠিক এবং কাজ করার উপযুক্ত রাখে।

গতানুগতিক স্কুলগুলিতে সন্তানদের পড়াতে পাঠান না এমন কিছু বাবা-মায়ের সঙ্গে আলাপের পর শিক্ষার নতুন দিক খুলে যায় আমার সামনে। এমন একটা পরিবেশের স্বপ্ন দেখতাম যেখানে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বই আর পরীক্ষার ভারে স্বাধীনতা খোয়াবে না। দক্ষিণ ভারত এমনকী বিদেশেও আন-স্কুলিং বা গতনুগতিক স্কুলে ছেলেমেয়েদের না পাঠানোর পক্ষেই অনেক বাবা-মা। উত্তর ভারতে অবশ্য সেটা নেই। উইকিপিডিয়ায় আন-স্কুলিং শব্দটার মানে হচ্ছে, এমন একটি শিক্ষা পদ্ধতি এবং আদর্শ যেখানে শিক্ষার্থীরাই ঠিক করবে কী শিখবে। ঠিকই করে নিয়েছিলাম ছেলেকে স্কুলে পড়াব না। চণ্ডীগড়ে ‘কো ভেদা’ নামে একটি স্কুলের খোঁজ পাই। এখানে আন-স্কুলিং আদর্শ মেনে চলা হয়। আন-স্কুলিং যেসব বাবা-মায়ের পছন্দ, আমিও সেই দলে পড়ি, এটা ভেবে গর্ববোধ হয়।

স্টার্টআপে ব্যর্থ না হলে জীবন সম্পর্কে এই বোধদয় হত না। আমার মেন্টরের উপদেশ,টাকার পেছনে ছোটার চেয়ে নিজের আত্মার উন্নতিতে বেশি সময় দেওয়া উচিত। সেই উপদেশ কাজে লেগেছিল। টাকার জন্য কাজ করতাম। এমনভাবে কাজ বাছতাম যাতে আমার নিজের সময়ের ৪০ শতাংশের মধ্যে শেষ করে দিতে পারতাম। অন্ন সংস্থানের ব্যপারটা নিশ্চিত হলেই হল। বাকি সময়টা বই পড়ে, অন্য কিছু শিখে, আমাকে আনন্দ দেয় এমন কিছু লিখে(কিছু টাকাও আসত) কাটাতাম। বড়লোক হয়ে মরার জন্য সারা জীবন টাকা জমানো আমার ধাতে নেই। এটা ঠিক, এমনভাবে রোজগার করতে হবে এবং জমাতে হবে যাতে আয় বন্ধ হয়ে গেলেও জীবন থেমে থাকবে না। তার মানে এই নয় সারা জীবন যন্ত্রের মতো বাঁচতে হবে। অবসরের পর ভালোভাবে থাকার জন্য তার আগের সময়টা কষ্ট করে কাটানোর মানে হল, বৃদ্ধ বয়সের জন্য যৌনতা তুলে রাখার মতোই। বরং সারা জীবন ধরে অল্প অল্প সময়ের জন্য অবসর নেওয়া ভালো। প্রথম দিকে সময় করে ওঠা সম্ভব মনে নাও হতে পারে, তবে এটা কিন্তু সম্ভব। জীবনে মনে রাখার মতো সময় যদি ১০ মিনিটেরও কম হয়, তাহলে বেঁচে থাকার কারণ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। সারা বছর সাময়িক অবসর কীভাবে নেওয়া যায় ভাবতে হবে। অবসর মানে কাজ থেকে একেবারে দূরে সরে যাওয়া নয়, বরং যখন যেমন ইচ্ছে হবে তেমন কাজ করা। আমার জীবনের প্রথম সাময়িক অবসর এক মাসের গোয়া বাস। দারুণ উপভোগ করেছিলাম। আর যখন যেমন ইচ্ছে হয়েছিল কাজও করেছিলাম।

কথা হল, নিজের মতো বাঁচতে হবে। বাঁচার মধ্যে দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া বা নোংরা না করা এবং পারিপার্শ্বিক দিকটারও দেখভাল করার জন্য কেউ যেন জ্ঞান দিতে আসতে না পারে। একটু বোধ থাকলেই ব্যক্তিগত এবং ব্যবসায়িক জীবনে সৎ থাকা যায়। মানুষকে ভালোবাসবে, মানুষ সেটাই তোমাকে ফিরিয়ে দেবে।

লেখক-প্রদীপ গোয়েল

অনুবাদ-তিয়াসা বিশ্বাস