পূর্বস্থলী, কাটোয়ায় চাষাবাদে সাফল্যের ফোড়ন

ধান, সর্ষে বা ডাল লাগালেই দারুণ ফলন। বাধ্যের জমি। তাই আশাও ছিল অনেক। এবার কাটোয়া পূর্বস্থলীর মতো বর্ধমানের জমিতে ধনে, কালোজিরে, মেথির ফোড়নদারি দেখে তো তাজ্জব কৃষি মহল। পরীক্ষা-নিরীক্ষার শুরুতেই চমকপদ সাফল্য।

0

তিনফসলি জমি। সারা বছর কার্যত সবুজে সবুজ। মাটির উর্বরতার জন্য সবুজের এমন ঘনঘটা কাটোয়া এক ও দু নম্বর ব্লক এবং পূর্বস্থলী এক ও দু নম্বর ব্লকে। ধানের রমরমা আছেই, পাশাপাশি আলু, সর্ষে, পেঁয়াজও এখানে ভাল চাষ হয়। পূর্বস্থলীর ১ এর নোয়াচুরের প্রভাতচন্দ্র মাহাতো গত বছরও ধান, মুসুরির ডাল আর সর্ষে চাষ করেছেন।

জেলা উদ্যানপালন দফতরের পরামর্শে এবার জমিতে কালো জিরে, মেথি ও ধনে চাষ করেন। বাড়ির তৈরি নয়, বীজ পেয়েছিলেন রাজস্থানের আজমেঢ়ের মশলা গবেষণাগার থেকে। মাধ্যম ছিলেন সরকারি আধিকারিকরা। সেরা বীজ পেয়ে মশলা চাষও বেশ জমেছে। প্রভাতচন্দ্রর মতো ঠোঁটের কোণে হাসি কাটোয়ার মোয়াইলের বাসিন্দা গোবিন্দ্র প্রসাদ মাহাতোরও। তিনিও এবার মশলা চাষে ঝোঁকেন। কার্তিক মাস চাষ শুরু করেছিলেন। এখন ফসল ওঠার সময়ে ওই কৃষক হিসেব করে দেখেছেন অন্য চাষের থেকে মশলায় কয়েক গুন বেশি লাভ। খাটনিও কম। এবার এঁদের মতো বর্ধমানের পূর্বস্থলী ও কাটোয়ার কয়েকশো চাষি মশলা চাষ করলেন। সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে তাদের নতুন ধারার চাষ নিয়ে অন্য কৃষকদের কৌতুহলের শেষ নেই।

পূর্বস্থলী ১ নম্বরের রাজাপুর, বোলাহাট, ২ ব্লকের মোয়াইল, নোয়াচুর, কাটোয়ার শ্রীখণ্ড, মুস্থলি, মোয়াইলের মতো গ্রামগুলিতে এবার মশলা চাষের রমরমা। কয়েক দশক আগেও এই এলাকাতেই নানা রকম মশলার চাষ হত। কিন্তু ভাল বীজ না পাওয়ায় অন্য ধরনের চাষ কার্যত বন্ধ হতে বসেছিল। এবার রাজস্থানের বীজ পেয়ে চেনা জমিতে ফিরেছে চেনা মশলা। আবার পুরনো পেশায় ফিরছেন চাষিদের একাংশ। এই চাষের পুরোটাই জৈব পদ্ধতিতে হয়। এতে কীটনাশক ও রাসয়নিক সারের কার্যত ব্যবহার নেই। মূলত গোবর, কেঁচো সারের প্রয়োগ হয়েছে মশলা চাষে। তার জন্য ফলনও ভাল হয়েছে, পাশাপাশি জমির উর্বরতাও বজায় থেকেছে বলে মত চাষিদের। চারটি ব্লকের প্রায় ১৫০ বিঘে জমিতে এবার মেথি, কালো জিরে ও ধনে চাষ হয়েছে।

চাষিরা বিনামূল্যে পেয়েছেন বীজ। তবে একটাই শর্ত ছিল। যে যতটা বীজ নিয়ে এবার চাষ করেছেন তার তিন গুন বীজ ফিরিয়ে দিতে হবে। জেলা উদ্যানপালন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে এর ফলে আগামী বছর আরও তিন গুন জমি মশলা চাষের আওতায় আসবে। কাটোয়া ও পূর্বস্থলী মশলা চাষ চাষ নিয়ে চাষিদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আজমেঢ় থেকে আসা এই নতুন বীজ নিয়ে শুরুর দিকে কিছুটা জড়তা ছিল। কাটোয়ার চাষি গোবিন্দ প্রসাদ মাহাতোর কথায়, ‘‘প্রথমবার চাষ করেছিলাম, বলে একটা ধন্ধ ছিল। কিন্তু পরে বুঝতে পারি মশলা চাষ করলে আমাদের লাভের পরিমাণটা অনেকটাই বাড়বে। অন্য চাষের মতো সময়ও বেশি দিতে হয় না।’’ চাষিদের মশলার বীজ সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত তরুণ রায়। পূর্বস্থলী এলাকায় তিনি কাজ করছেন। তরুণ রায়ের কথায়, ‘‘বর্ধমান জেলায় মশলা চাষ হারিয়ে যাচ্ছিল। নতুন উদ্যমে আবার সব শুরু হয়েছে। মশলা চাষে জলের ব্যবহারও বেশ কম হওয়ায় চাষিদের মনে ধরেছে।’’

অন্য ফসলের থেকে মশলার মজুত করার সমস্যা অনেকটাই কম। তার জন্য এধরনের চাষের কদর বাড়ছে বলে মনে করেন জেলার উদ্যানপালন আধিকারিক সুপ্রতীক মৈত্র। সুপ্রতীকবাবুর কথায়, ‘‘আমরা নতুন ধরনের চাষ ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলাম। বর্ধমান জেলায় মাটি বৈচিত্র্য রয়েছে। সেটাই কাজে লাগানো হয়েছে। কাটোয়া, পূর্বস্থলীতে এবারই প্রথম মশনা নিয়ে পরীক্ষা হল। তাতেই ভাল সাড়া পড়েছে‌।’’ রাজ্যে এখনও সংগঠিতভাবে কোথাও মশলা চাষ হয় না। জলের খরচ নগন্য, অথচ পরিবেশ বান্ধব। মেথি, কালো জিরে, ধনে চাষে সাফল্যের ভরসায় এবার আরও একটু দামি মশলা, যেমন জিরে, মৌরি চাষের পরিকল্পনা নিচ্ছে জেলা উদ্যানপালন দফতর। মশলার মাধ্যমে এভাবেই এগিয়ে যাওয়ার মশলা খুঁজে পেয়েছেন সকলে।