স্নিগ্ধ সৌন্দর্যে ভরা নিউটাউনের জাপানি বাগান

1

এবার কলকাতাতেই এক টুকরো জাপান! হিডকোর উদ্যোগে নিউটাউনের ইকোপার্কে ৩.৫ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে জাপানী গার্ডেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাপান সফরের স্মৃতিকে মনে রাখে এই উদ্যান। শহরের মানুষের ব্যস্ত জীবন থেকে কিছুটা মুহূর্ত নিভৃতে কাটানোর আরেকটা সুযোগ। আর পর্যটকদের জন্য এই শহরে আরও এক নতুন আকর্ষণ।

সূযোদয়ের দেশের প্রকৃতির সৌন্দর্য সর্বজনবিদিত। ছবিতে দেখে দেখে একবার ঘুরে আসার ইচ্ছে দমিয়ে রাখা দুষ্কর। কিন্তু রেস্তরাও তো থাকা চাই। ট্যাঁকের ভরসা না থাকলে জাপান ঘোরা স্বপ্নই থেকে যাবে। তবে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর একটা ব্যবস্থা অবশ্য শহর কলকাতা করে ফেলেছে। ঠিক শহর নয়, শহরের উপকন্ঠ, নিউটাউনের ইকোপার্কে সস্তায় এক টুকরো জাপান দর্শনের ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে জাপানী গার্ডেনে। দুয়ারে কোমাইনুর আর্থাৎ সিংহ-কুকুর স্বাগত জানাবে। পাশে স্বয়ংক্রিয় মেশিনে টিকিট কেটে ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলেই সামনে বিশাল বুদ্ধ মূর্তিতে চোখ জুড়িয়ে যাবে। চারদিকে সবুজে ঘেরা জঙ্গল। বুদ্ধমূর্তি পেরিয়ে বাঁ দিকে বৌদ্ধ মঠ, ডান দিকে ফুজি রেস্তোরাঁ।গতবছর দুর্গাপুজোয় সুরুচি সংঘ ও চেতলা অগ্রণীর তৈরি করা বুদ্ধমূর্তিগুলি স্থান পেয়েছে জাপানী গার্ডেনে। তিন স্তরের এই প্যাগোডা গোটা জায়গায় অন্য মাত্রা যোগ করেছে। বাগানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে লাফিং বুডঢার নানা অবয়ব। পরতে পরতে জাপানী জাপানী সংস্কৃতির ছোঁয়া।

শুধু ঘোরা নয়, খানার ব্যবস্থাও জমপেশ। শরৎ বোস রোডের ফুজি রেস্তোঁরার দ্বিতীয় শাখা আছে এই জাপানী গার্ডেনে। অথেনটিক সুশি পাওয়া যাবে। বেশিরভাগ বসার জায়গা বাইরেই। রেস্তোরাঁ লাগায়া বাগানে বে়ঞ্চ পাতা। বৃষ্টি বা খুব গরম না থাকলে সবাইকে বাইরেই বসতে বলা হয়। কারণ খাবারের সঙ্গে ওই প্রকৃতি উপভোগ করার মজাই আলাদা, বললেন ফুজির ম্যনেজিং ডিরেক্টর পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়। পলাশবাবু নিজেও ২২ বছর বয়সে জাপান চলে গিয়েছিলেন। ২৫ বছর সেখানে থেকে দেশে ফিরেছেন। ফলে জাপানী সংস্কৃতি এবং খাদ্যাভ্যাস তাঁর নখদর্পণে। রেস্তোরাঁ চালাতে গিয়ে সেই অভিজ্ঞতাই কাজে লাগে সবচেয়ে বেশি, বলছিলেন পলাশ।

‘তবে খাওয়ার আগে জঙ্গলটায় একবার চক্কর মেরে আসা ভালো। জায়গায় জায়গায় বোর্ডে লেখা নানা কথা, যেমন, ‘ভোরে জাগো আর মনে করাও, তুমিই পারো’। প্যাগোডায় ঢুকে চাকা ঘোরান, মনে মনে মনস্কামনা জপ করতে থাকুন’, পরামর্শ ফুজির ম্যানেজিং ডিরেক্টরের। বাগানে কান পাতলে শোনা যাবে বাতাসের গান। বাঁশের বিশাল ঝুনঝুনিতে হাওয়ার দোলায় মিষ্টি সুর ভেসে আসে। ফুজিতে ১২০ টাকা প্লেট ওনিয়ন টেম্পুরা পাওয়া যায়, ডিপ ফ্রাই করা পেঁয়াজিও বলতে পারেন। জাপানী গার্ডেনে ঘুরতে ঘুরতে মুচমুচে টেম্পুরা, বেশ লাগবে।

ঘোরা শেষে পেটপুজোর জম্পেশ ব্যবস্থা করে রেখেছে ফুজি। আছে আরও ১০ থেকে ১২টি খাবারের স্টল,যেখানে মূলত জাপানী খাবারই মিলবে। ফুজির মেনুর একটু আভাস দিয়ে দিই। চিকেন টেরিয়াকি, ২৬০ টাকা প্রতি প্লেটে থাকবে প্যান গ্রিল্ড সয়া সসে রান্না করা চিকেন ফিঙ্গার। অ্যাপিটাইজার হিসেবে দারুণ জমবে। চাইলে রাইস বা নুডলসের সঙ্গে সাইড ডিশ হিসেবেও নেওয়া যায়। স্টিয়ার ফ্রাইড এগ নুডলস, প্রতি প্লেট ১২০ টাকা। বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরির পর পকেট মানির সামান্য টাকা জড়ো করে সস্তায় এই নুডলস মন এবং পেট দুইই ভরিয়ে দেবে। জাপানীজ চিকেন কারি। ৩৭৫ টাকা প্রতি প্লেটে কী কী থাকবে জেনে নিন। স্বাভাবিক ঝুরঝুড়ে যে ভাত আমরা খাই সেরকম নয়, একটু আঠালো আঠালো নরম ভাত। সাইড ডিশ ছাড়া খেতে মিষ্টি মিষ্টি লাগবে। এই ভাতের সঙ্গে চিকেন গোল্ডেন কারি। ভাতের সঙ্গে এক থালাতেই পরিবেশন করা হয়, টিপিক্যাল জাপানী খানা বলাই ভাল। সুশির কথা তো আগেই বলেছি। ‘স্পাইসি মাশরুম মাকি, এক ধরনের সুশি। সুশি যে সবসময় মাছ দিয়ে হবে তা কিন্তু নয়। আঠালো ভাতের মধ্যে মাশরুমের পুর। ১৮০ টাকা প্লেট,স্বাদ বদলের জন্য এর থেকে ভালো কিছু হয় না’, একের পর এক মেনু বলে যাচ্ছিলেন পলাশ বন্দ্যোপাধ্যায়।

সব ব্যবস্থা পাকা। ঘোরা, খাওয়া, শহরের কোলাহল থেকে খুব দূরে না হলেও একান্তে সময় কাটানোর জন্য জাপানী গার্ডেনের তুলনা হয় না। আর কলকাতা দর্শনে এসে পর্যটকদের জন্য জাপান দর্শন হবে উপরি পাওনা।