স্বাবলম্বী রাজ্যের ‘কার্পেট গ্রাম’ মালগাঁও

0

নিছকই বেড়াতে গিয়েছিলেন বেনারস, ভাদোহিতে। ঘোরাঘুরির মধ্যেই কৌতুহলী চোখ খুঁজে নিয়েছিল সুতো, উলের কেরামতি। কার্পেটের শহর ভাদোহি ও বেনারস অনেক কিছুই শিখিয়েছিল আবু তাহেরকে। উত্তর প্রদেশ থেকে ‌উত্তর দিনাজপুরের মালগাঁওয়ের বাড়িতে ফিরে ঠিক করলেন একবার চেষ্টা করলে কেমন হয়। সেই চেষ্টাই আজ মালগাঁওকে স্বনির্ভর করেছে। কৃষিকাজ ভুলে পাণ্ডববর্জিত গ্রামের বাসিন্দারা এখন সৌখিন কার্পেট তৈরিতে সারা বছর ব্যস্ত থাকেন। তাদের তৈরি কার্পেট ভাদোহি, বেনারসের হাত ঘুরে পৌঁছে যাচ্ছে আমেরিকা, ইউরোপে।

উত্তর দিনাজপুরের জেলা সদর রায়গঞ্জ থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরত্ব। বছর পঁচিশ আগেও চাষের বাইরে কোনও বিকল্প পেশা যে থাকতে পারে তা জানতেন না ভূমিপুত্ররা। চাষ করে ভাল কিছু করতে চাইলেও মহাজনের ঋণের ফাঁস আর প্রাকৃতিক দুর্যোগে হেরে যাচ্ছিলেন এলাকার কৃষিজীবী মানুষরা। গ্রামেরই এক বাসিন্দা আবু তাহের ১৯৮০ সালে বেড়াতে গিয়েছিলেন উত্তর প্রদেশের বেশ কিছু জায়গায়। বেনারস, ভাদোহিতে গিয়ে সেখানকার হস্তশিল্প দেখে তাজ্জব বনে যান আবু সাহেব। দেখেন ভাদোহি ও বেনারসের গ্রামগুলিতে সবাই কার্পেট তৈরিতে ব্যস্ত। এর জন্য উপকরণও দারুণ কিছু নয়। বেড়ানো ভুলে আবু তখন ঘুরে ঘুরে দেখলেন সুত ও উলের কারুকাজ। সেই থেকেই কার্পেট তৈরির ভূত তার মাথায় চেপে বসল।

একরাশ স্বপ্ন নিয়ে বাড়িতে ফেরার পর প্রতিবেশীদের থেকে তেমন উত্সাহ পাননি। একরকম জেদ করেই মেশিন বসিয়ে কার্পেট তৈরিতে হাত লাগান। কার্পেট বিক্রির জন্য আগেভাগেই কথা বলে রেখেছিলেন ভাদোহির ব্যবসায়ীদের। তাই কার্পেট আর বাড়িতে থাকল না। আবু তাহেরের হাতযশে প্রতিবেশীরা পরে প্রভাবিত হন। দেখাদেখিতে কাজে হাত দেন অন্যরাও। ধীরে ধীরে মালগাঁও গ্রামের প্রায় ৫০০ জন এই পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

কার্পেটের কাঁচামাল আসে উত্তর প্রদেশের ভাদোহি, মির্জাপুর ও পঞ্জাবের লুধিয়ানা থেকে। এক কেজি সুতো আনতে খরচ পড়ে প্রায় ২০ টাকা। ১০০ টাকা স্ক্যোয়ার ফিট থেকে এখানকার কার্পেটের দাম শুরু। সর্বোচ্চ দাম ১০০০ টাকা। শিল্পীদের মজুরি দৈনিক ২০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা। বছরে প্রায় কোটি টাকার কার্পেট রফতানি হয় এই গ্রাম থেকে। মূলত অফিস, বাড়ি, শোরুমের কার্পেট এই গ্রামে তৈরি হয়। পাশাপাশি ওয়াল হ্যাঙ্গিং-এর চাহিদা পূরণ করে মালগাঁও। সারা বছর কাজ। তাই সাইকেল ছেড়ে এখন মোটরবাইকে ঘোরেন এলাকার যুবকরা। সাধারণ রঙিন টিভির জায়গায় এসেছে ফ্ল্যাট টিভি। কার্পেট তাঁদের অনেক অন্ধকারই ঢেকে দিয়েছে। গ্রামের কার্পেট শিল্পের পুরোধা আবু তাহের বলেন, ‘‘আমরা উত্পাদিত সামগ্রী উত্তর প্রদেশ ও পঞ্জাবে পাঠাই। সেখান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জাপানে যায়। শীতপ্রধান এলাকায় এর ভাল চাহিদা রয়েছে। চাহিদা যথেষ্টই রয়েছে, কিন্তু বিপণনটা আমরা নিজেরা করতে পারলে আরও বেশি ভাল লাভ পেতাম।’’

আবু তাহের যেখানে শুরু করেছিলেন, সেখান থেকে এই শিল্পের ব্যাটনটা ধরে দিয়েছেন শাহনওয়াজ হুসেন, শামিম রিয়াজরা। তাঁদের মতো নতুন প্রজন্মও কার্পেট নিয়ে সমানভাবে উত্সাহী। শাহনওয়াজের মতো অনেকেই কয়েক বছর আগে চাষ করতেন। এখন লাঙুল ছেড়ে কার্পেট তৈরিতেই তাঁরা মগ্ন। শুধু প্রশাসনের মুখাপেক্ষীন না হয়ে এই কুটির শিল্পকে কীভাবে আরও অনেকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায় তার জন্য নানা পরিকল্পনা নিয়েছেন এই শিল্পীরা। শাহনওয়াজরা নিজেদের সামগ্রী নিয়ে দেশের বিভিন্ন হস্তশিল্প মেলায় অংশ নেন। মঞ্জুষার মতো সরকারি সংস্থা এবং বেশ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মালগাঁওয়ের কার্পেট নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। উত্তর দিনাজপুরের ‘কার্পেট গ্রাম’-এর শিল্পীরা মনে করেন ঠিকঠাক বিপণন হলে তাঁদের কারুকাজের কথা পৌঁছে যাবে আরও অনেক জায়গায়।