ডোকরার সৌজন্যে দরিয়াপুরে অভাব অতীত

0

ভিনরাজ্য থেকে এরাজ্যে এসে ডেরা বাঁধা। তারপর মাতৃভূমির পেশা এবঙ্গেও শুরু করা। মোম, ধুনো, পিতল ও কয়লার ধোঁয়ার মাধ্যমে অপরূপ শিল্পকর্ম দেখে প্রভাবিত হন এলাকার ভূমিপুত্ররাও। তারাও চলে আসেন এই পেশায়। এভাবেই বর্ধমানের আউশগ্রামের দরিয়াপুর ডোকরা গ্রাম হিসাবে পরিচিত হয়। হাতের কাজ আদিবাসী প্রভাবিত এই গ্রামের মানুষের অভাব অনেকটাই ভুলিয়েছে। বেশ কিছু উদ্যোগে ডোকরার এই শিল্পকর্ম এখন আধুনিক হয়েছে।


পড়ন্ত হেমন্তেও উজ্জ্বল দরিয়াপুর। ধানক্ষেতে শিসের দোলা মন ভরিয়ে দেয়। নতুন ধানের দোলার মতো মানানসই এখানকার মানুষের হাতের কাজ। বর্ধমানের ডোকরা শিল্পের অহঙ্কার আউশগ্রামের এই জনপদ। কয়েক শতক আগে মধ্য প্রদেশের বস্তার থেকে ঘুরতে ঘুরতে কয়েকজন ডোকরা শিল্পী এসেছিলেন এই দরিয়াপুরে। মোম, ধুনো, কয়েক ধরনের মাটি, পিতল, সর্ষের তেল ও কয়লার ধোঁয়ার কেরামতিতে তাঁদের অপরূপ কাজ মন জয় করে নেয় স্থানীয়দের। তাঁরাও ধীরে ধীরে চলে আসেন ডোকরার পেশায়। কিন্তু প্রাচীন প্রথা ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে এই কাজ করতে গিয়ে ক্রমেই অসুস্থ হতে থাকেন শিল্পীরা। ফুসফুসের নানা সমস্যা তাঁদের মধ্যে দেখা দেয়। কেউ কেউ মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। শীর্ষে উঠার সময় এধরনের ঘটনায় অনেকের মোহভঙ্গ হয়। কেউ কেউ অন্য পেশার দিকে ঝুঁকে পড়েন।


২০১৩ সালে এই শিল্পের পুনরুজ্জীবনের কাজটা শুরু হয়। রাজ্য সরকারের ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প ও বস্ত্র মন্ত্রকের সঙ্গে ইউনেস্কোর একটি মউ সাক্ষরিত হয়। এরপরই রাজ্যের ১০টি কুটিরশিল্পকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। এই কাজের জন্য ইউনেস্কো এরাজ্যের সংস্থা বাংলা নাটক ডট কমের সঙ্গে কথা বলে। ওই বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগে আউশগ্রামের ওই এলাকায় তৈরি হয়েছে দরিয়াপুর ডোকরা আর্টিজান কো-অপারেটিভ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সোসাইটি লিমিটেড। খাদি দফতর বানিয়ে দিয়েছে সোসাইটির নিজস্ব ভবন। তৈরি করা হয়েছে রুরাল ক্রাফট হাব। তারপরই ধুঁকতে থাকা শিল্পে প্রাণ ফিরেছে।


বর্তমানে এই সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ৪২টি পরিবার।পুরনো অবৈজ্ঞানিক প্রথায় চুল্লির বদলে বিজ্ঞানসম্মতভাবে তৈরি করা হচ্ছে দুটি বৃহদাকার চুল্লি বা ভাটি। যেখানে শিল্পীরা তাঁদের শিল্পকর্ম আগুনে পোড়াতে পারবেন। আর এর ফলে দূষিত ধোঁয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সুযোগও কম আসবে। প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি এলাকার মানুষও বুঝতে পারেন এই শিল্পকর্মই তাদের অনেক কিছু দেবে।


দিনভর কাজ, হাতে আসছে টাকা। মদের প্রতি আসক্তি তাই ধীরে ধীরে কমছে। শিল্পীরা বুঝতে পারছেন দরিয়াপুরের নাম অনেক দূরে পৌঁছে দিতে গেল তাঁদের আরও খাটতে হবে। নানা উদ্যোগের ফলে কয়লার ধোঁয়ায় আর তাঁদের চোখ খারাপ হবে না, ফুসফুসও ঠিক থাকবে। তাই নতুন উদ্যমে কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে দরিয়াপুরে। যাদের মোহভঙ্গ হয়েছিল তারাও ফিরছেন বাপ, ঠাকুর্দার পেশায়। শিল্পীদের পরামর্শ দেওয়ার জন্য দরিয়াপুরে সর্বক্ষণই থাকছেন ওই বেসরকারি সংস্থার কর্মীরা। সরকারি উদ্যোগে ডোকারা শিল্পীদের শিল্পকর্ম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ডে পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই, বেঙ্গালুরুর মতো শহরে নানা শিল্পমেলায় এই সব সামগ্রী তুলে ধরা হচ্ছে।


বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি ছিলই, এখন ডোকরার মাধ্যমে মহিলাদের নানারকম অলঙ্কার তৈরি হচ্ছে। এর চাহিদাও যথেষ্ট। শিল্পীরা যাতে ঠিকমতো দাম পান তার ব্যবস্থাও হয়েছে। পাশাপাশি তাদের অল্প সুদে ঋণের বন্দোবস্তও করা হয়েছে। একদিকে কাজের প্রতি টান, অন্যদিকে প্রশাসনিক উদ্যোগ। দুইয়ে মিলে দরিয়াপুরের অভাব অনেকটাই অতীত। আধুনিক প্রযুক্তি ও পরামর্শে নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখছে দরিয়াপুর।

Related Stories