স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ছে বাংলার টোটাল স্টার্ট

0

গত ১৩ বছর ধরে, উদ্যোগের জগতে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলিতে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গঠনে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে চলেছে টোটালস্টার্ট (www.totalstart.org)। সংস্থার শুরু ২০০২ সালে, ড.সূর্যনীল ঘোষ ও তাঁর স্ত্রী কর্নেলিয়া হাইনেনের হাত ধরে। শুরুটা হয়েছিল জার্মানির সারব্রুকেনে, সারল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।

স্টার্ট-আপ এবং ছোট ও মাঝারি ব্যবসার প্রসার ও তাদের উন্নতি ও নিরাপত্তা রক্ষার উদ্দেশ্যে কাজ করে টোটাল স্টার্ট। অান্ত্রেপ্রন্যায়ারশিপে উৎসাহ দিয়ে একটি শক্তিশালী ইকোসিস্টেম গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য। এর জন্য মেন্টরিং, এঞ্জেল ইনভেস্টমেন্ট, ভিসি ফান্ড পেতে সাহায্য করা ও ইনকিউবেশনের ব্যবস্থা করে টোটালস্টার্ট। এখনও অবধি ৫৭টিরও বেশি সংস্থাকে সহায়তা করেছে তারা।

২০১০ সাল থেকে ভারতের বিভিন্ন অনগ্রসর এলাকায় জেলাস্তরে অ্যান্ত্রঁপ্রন্যায়ারশিপ প্রসারের কাজে ব্রতী হয়েছেন ড. ঘোষ। প্রথম ইনকিউবেশন কেন্দ্রটি খোলেন সিকিমের গ্যাংটকে। নিজের যাবতীয় সঞ্চয় এই কাজে ব্যয় করেছেন তিনি, এবং প্রায় সম্পূর্ণ উদ্যোগটিই চালিয়েছেন নিজের টাকায়।

স্টার্টআপ সংস্কৃতির প্রসারের ক্ষেত্রে কয়েকটি সমস্যার জায়গা লক্ষ্য করেছিলেন ড. ঘোষ।

  1. মানুষকে উদ্যোগের পথে নিয়ে আসা
  2. তাঁদের এই পথে চলতে সাহায্য করা যাতে তাঁরা ছোট কিন্তু বৃদ্ধিযোগ্য ব্যবসা গড়ে তুলতে পারে ও তাঁদের এমন স্তরে পৌঁছে দেওয়া যখন তাঁরা ফান্ড পেতে পারেন
  3. ভিসি বা অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের থেকে বিনিয়োগ পাওয়ার ব্যবস্থা করা

এই তিনটি জায়গাকেই নিজেদের কাজের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে টোটাল স্টার্ট। প্রথমটির জন্য টোটাল আর্লি মেন্টর ও টোটাল ইন্টার্ন এই দুটি প্রোগ্রাম রয়েছে তাদের। টোটাল আর্লি মেন্টরে যাঁরা এখনও উদ্যোগের পথে অগ্রসর হননি কিন্তু সম্ভাবনা রয়েছে, সেই সব ব্যক্তিকে মেন্টরিং ও অন্যান্য বিষয়ে সহায়তা দেওয়া হয়। টোটাল ইন্টার্ন বিভিন্ন এমবিএ, এমটেক,বিটেকের তৃতীয় ও শেষ বর্ষের ছাত্রদের জন্য ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম।

দ্বিতীয়টির জন্য রয়েছে একগুচ্ছ প্রোগ্রাম। টোটালকিউব, টোটাল ডিস্ট্রিক্টপ্রনয়্যাঁর, টোটালইনকিউব- সরকার ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় বিভিন্ন জায়গায় ইনকিউবেশন কেন্দ্র চালানো হয়।

রয়েছে টোটাল ইনক্ল্যুড- সামাজিক উদ্যোগ গঠনে উত্সাহ প্রদানের জন্য। টোটাল মেন্টরে, কোনো ইনকিউবেশন কেন্দ্রের সদস্য নয় এমন স্টার্টআপদের মেন্টরিংয়ের সুবিধা দেওয়া হয়। টোটাল ক্লাস্টার, উদ্ভাবনী পণ্য উৎপাদন ক্লাস্টার।

এছাড়া বাংলা, সিকিম, ত্রিপুরা, ঝাড়খণ্ড, বিহার, উত্তরাখণ্ডের বিভিন্ন জেলায় তৈরি হচ্ছে জেলা ইনোভেশন অ্যান্ড ইনকিউবেশন ইউনিট।

সংস্থার মতে, তৃতীয় অর্থাৎ বিনিয়োগ পাওয়ার সমস্যার ক্ষেত্রে মেট্রো শহর ও তার আশেপাশের অঞ্চলে যথেষ্ট কাজ হলেও জেলাস্তরে সেভাবে কিছু হচ্ছে না, এই সমস্যা কাটাতে গত চার বছর ধরে লাগাতার কাজ করে চলেছে টোটালস্টার্ট।

রাজ্যগুলির ছোট, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প দফতরের আওতায় থাকা জেলা শিল্প কেন্দ্রগুলির সঙ্গে কাজ করে টোটাল স্টার্ট। সরকার তাদের এই উদ্যোগকে সমর্থন করলেও কোনোরকম আর্থিক সাহায্য মেলেনি। তবে আর্থিক সমস্যা হলেও কাজ কখনোই থেমে থাকেনি। ড. ঘোষ ও বোর্ড মেম্বারদের চেষ্টায় ও অর্থে কাজ চালিয়ে গেছেন তারা।

জেলাস্তরে ক্ষুদ্র ও ছোট শিল্পগুলিকে ইক্যুইটি বেসড এঞ্জেল ও ভেঞ্চার ক্যাপিটালের মাধ্যমে উন্নয়নের জন্য মেন্টরিংয়ের চেষ্টা করছে টোটালস্টার্ট। কাজটা নতুন এবং কঠিন, কারণ পৃথিবী জুড়ে যে ধরণের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ হয় এটা তার থেকে অনেকটাই আলাদা। টোটালস্টার্ট নিজেদের ফান্ড দিয়ে কাজ করছে এখন, ভবিষ্যতে ভিসি ফান্ড তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে যেখানে বাইরে থেকে আসা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তারা দায়িত্বশীল থাকবে।

পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম, বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরাখণ্ড ইত্যাদি যে রাজ্য গুলিতে তারা কাজ করছে সেখানে প্রতি বছর কিছু জেলাস্তরের স্টার্টআপকে বেছে নেওয়া হয়। ১ বছরের বিজনেস অ্যাক্সেলারেশন প্রোগ্রামের জন্য নির্বাচন করা হয় ৩-৬টি স্টার্ট আপ প্রতি রাজ্য। তাদের এঞ্জেল ফান্ডিং, ভিসি ফান্ডিং বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে বাড়তে সাহায্য করা হয়। এছাড়া প্রতি রাজ্য থেকে ১০-২০ টি স্টার্টআপকে বেছে নেওয়া হয় ২ বছরের বিজনেস মেন্টরিং প্রোগ্রামের জন্য। এদের মধ্যে সেরা ১০ শতাংশকে পুরো স্কলারশিপ দেওয়া হয়, বাকি ৯০ শতাংশ থেকে টাকা নেওয়া হয় এই প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য। তবে এই টাকা যাতে তারা ফান্ডিং হিসেবে পেয়ে যায় সেই চেষ্টাও করা হয়, তার জন্য কাজে লাগানো হয় টোটালস্টার্টের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের যোগাযোগকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই স্টার্টআপগুলি হয় একেবারেই নতুন, বা শুরু করতে চলেছে ফলে টাকা দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়, সেক্ষেত্রে প্রায় পুরোটাই হয় বিনামূল্যে।

এখনও অবধি তাদের কোনো ভারতীয় বিনিয়োগে এক্সিট করেনি টোটালস্টার্ট এবং সেটাই তাদের সাফল্য বলে মনে করেন সংস্থার অধিকর্তারা।

সামনে মাস থেকে ১০০ কোটি টাকা ভিসি ফান্ড সংগ্রহ শুরু করবে তারা, ন্যুনতম টিকিট সাইজ ২৫ লক্ষ টাকা, প্রথম ধাপে তা চলবে অন্তত ২০ কোটি টাকা পর্যন্ত। জেলা স্তরের স্টার্টআপের জন্যই এই ভিসি ফান্ড ব্যবহার হবে। এছাড়াও তাদের এঞ্জেল নেটওয়ার্ককেও পুনরুজ্জীবিত করে সুসংহত করবে টোটাল স্টার্টআপ।

ড. সূর্যনীল ঘোষের পড়াশোনা নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে। স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে উদ্বুদ্ধ ড. ঘোষের চলার পথের মূল অনুপ্রেরণা স্বামী বিবেকানন্দের বাণী, “এসেছিস তো দাগ রেখে যা”।