WabiSabi, ছদ্ম আধ্যাত্মিক এই ক্যাফেতে মজেছে কলকাতা

2
ওয়াবি সাবি, একটি জাপানি শব্দ, যার অর্থ অসম্পূর্ণতার সৌন্দর্য। এ এক দার্শনিক রহস্যে মোড়া নন্দনতত্ত্বের বিষয়। কলকাতায় সেই দর্শনকে সামনে রেখে তৈরি হয়েছে একটি বুটিক শপ। 

এই ছদ্ম আধ্যাত্মিক পরিবেশের ভিতর প্রবেশ করলে কখনও মনে হতে পারে এমন একটি ক্যাফেতে এসেছেন যার কল্পনা এর আগে করেননি। WOW শব্দটা মুখ থেকে বেরিয়ে আসবেই। আবার একটু চারদিকে তাকালে মনে হতে পারে এখানে বোধহয় শিল্পের প্রদর্শনী চলছে। জিনিসের গায়ে দামের স্টিকার খুঁজে পেলে মনে হবে এটা লাইফ স্টাইল শপ। সাদার্ন অ্যাভিনিউর গলির ভিতর এই বুটিক শপে এলে হাজারো প্রশ্ন আপনাকে ঘিরে ধরবে। আপনি প্রবেশ করবেন শিল্পের মৌলিক সৌন্দর্যের ভিতর।

তরুণ উদ্যোক্তা বিদিশা সেন এই শপের অন্যতম মালকিন। তিনি তথ্য প্রযুক্তি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। বলছিলেন, ২০১৬-র গোঁড়ার দিকে ওরা কয়েকজন বন্ধু মিলে এমন একটা ক্যাফে খোলার প্ল্যান করেন যেটা হবে একদম অন্যরকম। নামটাও তেমনই হওয়া চাই। ওদেরই এক উদ্যোক্তা ওয়াবি সাবি শব্দটার প্রস্তাব দেয়। ভাবনার সঙ্গে নামটার একটা বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এবার খোঁজ পড়ে ইন্টিরিয়র ডিজাইনারের। বিদ্যুৎ রায়, ওদের বন্ধু, ইকো ফ্রেন্ডলি আর্কিটেকচারে তার ব্যাপক ফান্ডা। তাকেই দায়িত্ব দেওয়া হয় ইন্টিরিয়রের।

কো ফাউন্ডার ফাল্গুনী ভাট সাঙ্ঘভি গুজরাতের মেয়ে। স্বামী গৌরব সাঙ্ঘভির সঙ্গে বিবাহ সূত্রে ২০০৮ এ এসেছেন কলকাতায়। এখন পুরো দমে বাংলা বলতে পারেন। বাংলাকে ভালোবেসে ফেলেছেন ফাল্গুনী। নিজে শিল্পী। সিরামিক নিয়ে কাজ করেন। ওয়াবি সাবি ধারার শিল্পকলার প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেন সিরামিকের কাজ করতে করতেই। জাপানে শুধু নয় গোটা বিশ্বের শিল্পভাবনাকে প্রভাবিত করে ওয়াবিসাবির ভাবনা। সাধারণের ভিতর যে নিসর্গের সৌন্দর্য থাকে তাকে মর্যাদা দিতে শেখায় এই ওয়াবিসাবির দর্শন। ফাল্গুনী বোঝাচ্ছিলেন ওর সিরামিকের পাত্রের উদাহরণ দিয়ে। হাত থেকে পড়ে গেলেও তা ভেঙে গেলেও যা সুন্দর তা তো সুন্দরই। ওয়াবি সাবি সেই সৌন্দর্যকে মর্যাদা দেয়। 

ফলে বিদ্যুত রায়ের সঙ্গে ইন্টেরিয়র সাজানোর কাজে হাত লাগান তিনিও। পাশাপাশি ফাল্গুনীর স্বামী গৌরব কনস্ট্রাকশন লাইনে আছেন। ফলে তিনিও লেগে পড়েন ওয়াবিসাবিকে সাজিয়ে তুলতে। ২০১৬র মে মাসে কাজ শুরু হয়। সকলের যৌথ উদ্যোগে স্বপ্নের ওয়াবি সাবি রূপ পায়। ডিসেম্বরে চালু হয়ে যায় ক্যাফে। যেমনটি চেয়েছিলেন, ঠিক তেমনটি। সাদামাঠা। ওয়াবি সাবির দর্শনে সমৃদ্ধ। খাবারেও জৈব মেনু রাখার ইচ্ছে আছে, খুশিতে চিকচিক করে ওঠে বিদিশার চোখ।

আড়াই হাজার স্কয়ার ফুটের ক্যাফে কাম লাইফ-স্টাইল বুটিকে ঢুকলে মনে হবে রত্নগর্ভে ঢুকে পড়েছেন। আকর্ষণীয় গয়না চোখ টানবে। ত্বকের যত্ন নেওয়ার নানা জিনিসপত্র, ঘর সাজানোর শোপিস, জামা-কাপড়, হস্তশিল্প…কী নেই। শিল্প, সাহিত্য চর্চার জন্য আদর্শ জায়গা। চাইলে তেমন অনুষ্ঠানের আয়োজনের ব্যবস্থাও থাকছে। ক্যাফেতে সঙ্গী নিয়ে না এলেও একাকীত্বে ভুগবেন না। তাক থেকে বই পেড়ে সময় কেটে যাবে। কাঠের প্যানেলে তৈরি ক্যাফেতে পছন্দের পানীয় এবং খাবার অর্ডার করুন। কাচ অথবা কাঠের পাত্রে চা অথবা কফি আর নিরামিষ খাবার। ধাতব ল্যাম্প শেড, পাটের দড়িতে ঝুলছে। খাবার টেবিলের ঠিক ওপরে। দেওয়ালের চারদিকে হস্তশিল্পের ছোঁয়া, সজ্জায় কোথাও যান্ত্রিকতার লেশ মাত্র নেই। বুটিকে পাওয়া যাবে অ্যান্টিক লুকের নানান এক্সক্লুসিভ শোপিস, কুশন কভার, টেবিল ম্যাট, নানারকম ডায়েরি ঠিক যেমনটা মন চায়।

খাবারের কথা বলতে গেলে স্বাস্থ্যসম্মত কতটা সেই প্রশ্নটা সবার আগে উঠে আসে। ফাল্গুনী বলছিলেন, মাল্টি কুইজিন পদ রয়েছে মেনুতে। এমন খাবার এখানে পাবেন যা সচরাচর পাওয়া যায় না। গুণ এবং মান বজায় রাখার পাশাপাশি খাবার তৈরির উপকরণও আলাদা। যেমন ধরুন গ্লুটেন ফ্রি মোমোস। মোমো কিন্তু ময়দা দিয়ে তৈরি নয়। আলু মাখা খোলসে নানা সবজি ঠাসা। চাটনি দিয়ে মুখরোচক মোমো, ট্রাই করে দেখতে পারেন, স্বাদ বদল হবেই। ওপেন বাও, খানিকটা পাওভাজির মতো। সেঁকা পাউরুটির মধ্যে মাঞ্চুরিয়ান বল আর সব্‌জি। টোম্যাটো সস দিয়ে খেলে আমিষ খানার কথা ভুলেই যাবেন। ব্ল্যাক রাইস ইন রোজমারি ক্রিম সস। প্রোটিনে ভরা কালোচালের ভাত। আর ক্রিম সেস ডোবানো সয়াবিন বড়ি, স্বাস্থ্যকর লাঞ্চের জন্য আদর্শ। বানানা অশ্বগন্ধা শেক, ভ্যানিলা চকোলেট, নানারকম আইসক্রিম, কফি মন ভরিয়ে দেবে।

আড্ডাপ্রিয় বাঙালি একসঙ্গে হৈচৈ করে কাটাতে ভালোবাসে। আজকালকার টিনএজাররা অনেক বেশি সচেতন। নিখাদ আড্ডা বলতে আমরা যা বুঝি তার থেকেও কিছু গঠনমূলক আইডিয়া পাওয়ার চেষ্টা করে তারা। ওয়াবিসাবি তেমনি একটা জায়গা যেখানে আড্ডার সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেককিছুর প্রাপ্তি ঘটে। কারণ ওরা নতুন ব্যান্ড এবং উঠতি কবিদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দেয়, শিল্প ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নিজেদের ক্যাফে কাম বুটিকে তাঁর রুচির ছোঁয়া রেখেছেন বিদিশা।