নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে তিনমূর্তির শুরুয়াতি ‘অসামলি’

0

নীতিন, অঙ্কিত, দীপক-তখনও হাই-হ্যালো তো দূর কেউ কারও নাম পর্যন্ত জানতেন না। তবে তিন জনেরই মিল ছিল একটা জায়গায়। জীবনের প্রথম ধাপের খোঁজে এক সংস্থা থেকে অন্য সংস্থায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঢুঁ মারা। একমাত্র ভাগ্যই তিন উদ্যোক্তাকে মিলিয়ে দিতে পেরেছিল। পরস্পরের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগে প্রত্যেকেই শুরুয়াতির জন্য নানা ভাবে একাধিক আইডিয়া নিয়ে ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। যার ফল, প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং দলের মধ্যে উৎসাহের অভাবে হেরে গিয়েছেন প্রতিবারই। বাড়ির চাপ, নানা দায়দায়িত্ব এইসব কারণে একটা সময়ের পর আয়ের নিয়মিত উৎসের ব্যবস্থা না করে নানা উদ্যোগ নিয়ে পরীক্ষী নিরীক্ষা চালানো বেশ কঠিন।

গুরগাঁও, ইউডি ব্লকে সেদিন রাতে কয়েক ঘণ্টার জন্য লোডশেডিং নতুন সম্ভাবনার পথ দেখিয়েছিল। ঘরের ভেতর দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। একটু হাওয়ার জন্য বাইরে এসেছিলেন দীপক। প্রতিবেশী নীতিনকে দেখতে পান বাইরেই বসে রয়েছেন। সেই রাতে দুজনে চার ঘণ্টা কথা বলেছিলেন। বুঝতে পারেন তাঁরা একই মানসিকতার। প্রত্যেক প্রজেক্ট এবং প্রযুক্তি যা যা নিয়ে দীপক কাজ করেছেন, সবটাই খুলে বলেন নীতিনকে। দুই আগন্তুকের বন্ধু হতে সময় লাগেনি। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং থেকে এনএলপি, সব রকম খোঁজ চালিয়ে কী করা যায় দুজনেই ভাবলেন। শেষ পর্যন্ত গুরগাঁওয়ের এক পাবে পানীয়ের আড্ডায় মাথায় এল ‘অসামলি’র আইডিয়া।

‘অসামলি’ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্নে উৎস থেকে খবর সংগ্রহ করে এবং তারপর পাঁচ থেকে ছয় লাইনে সারমর্ম তৈরি করে সেটা নিউজ লিস্টিংয়ে তুলে দেয়। শুধু খবরই টার্গেট নয়। যেকোনও লিস্টিংয়ের জন্য সারমর্ম তৈরি করা ‘অসামলি’র লক্ষ্য। হতে পারে খবর অথবা ই-কমার্স ওয়েবসাইটে পণ্যের তালিকা, বই অথবা জায়গার নামের তালিকা অথবা গুগুল সার্চ লিস্টিং। সবকিছুতে ‘অসামলি’র সমান আগ্রহ।

নীতিন বলেন, ‘অন্যান্য প্রতিযোগীরাও সংক্ষিপ্ত খবর প্রকাশ করে। তবে তাদের স্কেল যথেষ্ট নয়, কারণ তারা নিজেরাই (ম্যানুয়েলি)সার সংক্ষেপ তৈরি করে। মোবাইলের যুগে অনলাইন সার্ফিংয়ের সময় খুব লম্বা কিছু দেখলে না পড়েই এড়িয়ে যাই। এই অভ্যেসের কারণে অনেক ভালো জিনিসও আমরা মিস করে যাই। মোবাইলে লম্বা কোনও বিবরণ পড়ার আগে আমরা একটা সারসংক্ষেপ দেখতে চাই। সংক্ষিপ্ত অংশটুকু পড়ে ঠিক করে নিই বাকিটা পড়ার যোগ্য কিনা। এই মঞ্চে এপিআই সামারি এবং অ্যাড থেকে আয়ের পরিকল্পনা রয়েছে ‘অসামলি’র’।

নীতিন সিএস-এ এমটেক। আড়াই বছর কাজ করছেন টিসিএস-এ রিসার্চ ল্যাব-এ। তিনি সবসময় কাজ করেছেন বিল্ডিং স্থাপত্য এবং প্রডাক্ট ডিজাইন, মেশিন লার্নিং এবং এনএলপি টেকনোলজি এবং তার উপর রিসার্চ পেপার ছাপতেন। কিন্তু আরও বড় লক্ষ্য ছিল তাঁর। নীতিন স্বীকার করেন, ব্যবসার ঝুঁকি সবসময় টানত তাঁকে। অনেক আইডিয়া ছিল।কিন্তু ঠিকঠাক টিমের অভাবে করে উঠতে পারেননি। তাই অফিসের একঘেঁয়ে কাজের মধ্যেই সমমনা লোক খুঁজছিলেন।

এনআইটি রউরকেল্লা থেকে সিএসইতে বি-টেক দীপক বারবার চাকরি বদলেছেন। কাজ শুরুর পঞ্চম বছরে পাঁচ নম্বর সংস্থা সিভেন্ট এ কাজ করছিলেন দীপক। তার আগে তিনটে শুরুয়াতিও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। উদ্যোক্তা হিসেবে দীপক অনন্ত ১০টি আইডিয়া নিয়ে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রত্যেকটাই ছাড়তে হয়েছে মাঝ পথে। টিমের ওপর ভরসা হারিয়ে একা চেষ্টা করেও বেশি দূর এগোতে পারেননি। চাকরি ছেড়ে দিয়ে কোনও রকম বিনিয়োগ ছাড়া কোনও শুরুয়াতিতেও রাজি ছিল না পরিবার। তাঁর পুরনো সংস্থার হুপুসের সিইও বিজয় জুমানিকে দেখে তিনি উদ্ভুদ্ধ হন এবং তিনি যেমন পরিবেশে কাজ করেছেন তেমনি কর্মী-বান্ধব সংস্থা বানাতে চেয়েছেন দীপক।

নীতিন এবং দীপক দুজনের পক্ষে নতুন কিছু শুরু করা সম্ভব ছিল না। নীতিন একটি শুরুয়াতি ‘ত্রিপোটো’তে যোগ দেন। দীপকের অবশ্য তাও করা হয়ে ওঠেনি। প্রতি রাতে১০ মিনিটের জন্য একসঙ্গে চা খেতে যেতেন দুজনে। নানা আইডিয়া নিয়ে ভাবতেন। ছুটির দিনে দুজনে লিয়েন স্টার্টআপ ওয়ার্কশপে যেতেন। সেখানে তাঁরা কিছু যোগাযোগ তৈরি করেন। যখন অবশেষে মনে হচ্ছিল কিছু একটা করতে চলেছেন, তখনই নতুন চাকরি নিয়ে নয়ডা যেতে হল নীতিনকে । ‘নিউরন’ নামে একটি সংস্থায় যোগ দেন। পরিবারের চাপ এবং আরও নানা সমস্যায় দীপক বাধ্য হয়ে মুম্বই যান। তিনি তাঁর ষষ্ঠ সংস্থা ‘হাউসিং’য়ে যোগ দেন। একমাসের মধ্যে নীতিন ‘নিউরনে’র সিটিও(CTO) হয়ে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। প্রযুক্তিতে উৎসাহীদের তাঁর সঙ্গে কাজ করতে নিয়ে আসেন। অঙ্কিত- তরুণ, তরতাজা, উৎসাহী সংকেত রচয়িতার (coder) সঙ্গে এখানেই দেখা হয় নীতিনের।

অঙ্কিতকে প্রথম দেখাতেই নীতিনের পছন্দ হয়ে যায়। জিআইটিএম গুরগাঁও থেকে সিএস-এ বি-টেক অঙ্কিতের কলেজে পড়ার সময় থেকে নিজে কিছু করা বা ব্যবসা করার দিকে ঝোঁক ছিল। ‘অসামলি’র আগে অঙ্কিত আরও তিনিটি স্টার্টআপে কাজ করেছিল শুধুমাত্র নিজের সংস্থা খোলার আগে হাত পাকানোর জন্য। একটা ভাল টিম তৈরি করতে পারছিলেন না বলে নিজের শুরুয়াতিটাও লঞ্চ করতে পারছিলেন না। পরিপূর্ণ স্টেক ডেভেলপারের পাশাপাশি আই.ট্রিপল-ই সোসাইটিতে মার্কেটিং ও অপারেশন হেড হিসেবেও কাজ করেছেন।

একরাতের জন্য দীপক দিল্লি গিয়ে নীতিনের সঙ্গে দেখা করলেন। একসঙ্গে ওয়াইনে চুমুক দিতে দিতেই ‘অসামলি’কে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পানা শুরু হয়ে গেল। টানা পাঁচদিন কাজ। ছোটার জন্য তৈরি হয়ে যায় ‘অসামলি’। দীপকের কাছে এখনও রহস্য কীভাবে এটা সম্ভব হয়েছিল? কেনই বা এতদিন এই কাজটাই হয়নি? হাজারো বাধা, নিরুৎসাহিত করার লোকের অভাব ছিল না। পরিবার বন্ধু-বান্ধব কেউ পাশে ছিল না। তবু সব বাধা টপকে আপম খেয়ালে এগিয়ে চলেছেন তিন তরুণ তুর্কি।