ছোট শহর থেকে বিশ্বের আঙিনায় ভাবনা কালরা

0

একজন মহিলা হিসাবে, তাও আবার ছোট শহর থেকে উঠে আসা একজন মহিলার পক্ষে, প্রযুক্তি ক্ষেত্রে কিছু করা বেশ শক্ত। প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জ দুটোই বেশি। এমনই বহু চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন ভাবনা কালরা। মধ্যপ্রদেশের ভিলাইয়ে জন্ম ও বেড়ে ওঠা ভাবনার বরাবর কম্পিউটারের থেকে ম্যাথমেটিক্সই বেশি ভালো লাগত।

উচ্চ-মাধ্যমিকে খুব ভালো রেজাল্ট হয়নি ভাবনার। ফলে ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়া সম্ভব ছিল না। তাই ভিলাই মহিলা মহাবিদ্যালয়ে গণিত নিয়ে বি এসসি-তে ভর্তি হয়ে যান। গণিতের প্রতি ভালোবাসা আরও বাড়ে। কম্পিউটারেও নিজেকে পারদর্শী করতে বেসিক কম্পিউটার সায়েন্স কোর্স করতে শুরু করে দেন। গ্র্যাজুয়েট হতেই ভাবনার বিয়ের জন্য জোর দিতে শুরু করেন তার বাবা-মা। কিন্তু তখনই বিয়েতে রাজি ছিলেন না ভাবনা। কোনও একটা কাজ খুঁজে নেওয়ার জন্য ছ-মাসের সময় চান তিনি। একটি কম্পিউটার ইনস্টিটিউটে ট্রেনার হিসাবে যোগ দেন ভাবনা। এরপর ২০০০ সালে বিয়ে হয়ে যায়।

বিয়ের পরে স্বামীর সঙ্গে আমেরিকায় চলে যান ভাবনা। নতুন একটা দেশ, সেই দেশের রীতিনীতি দেখে একটু ঘাবড়েই যান। দেশে ফেরার জন্য মন কেমন করতে থাকে তার। বাড়ির লোকের সঙ্গে যোগাযোগের উপায় বলতে ইন্টারন্যাশনাল কল। সেজন্য খরচ বেশ চড়া। তার ওপর কথা বলবেন কী। অধিকাংশ সময় কান্নায় ভেঙে পড়তেন তিনি। সারাদিন কাজকর্ম না থাকায় অবসাদ পেয়ে বসতে থাকে ভাবনাকে।

এরপর হঠাৎ করেই ভাবনার স্বামীর কোম্পানি উঠে যায়। তারপরেই ঘটল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে সেই জঙ্গি হামলার ঘটনা। কাজ পেতে সুবিধা হবে বলে স্বামীর পরামর্শে বস্টন ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে মাস্টার অব সায়েন্সে ভর্তি হয়ে যান ভাবনা। ডিগ্রি মেলার পরে স্বামীর সঙ্গে দেশে ফিরে আসেন। যোগ দেন স্বামীর তৈরি সংস্থা Integral Systems-এ। এইসময় H1B visa-র ছাড়পত্র পান ভাবনা।

২০০৫ সালে বস্টন ফিরে যান ভাবনা। সেখানে এনজিও-র হয়ে তাদের ওয়েবসাইট তৈরি ও অন্যান্য আইটি কাজ শুরু করে দেন। খুব শিগগিরই যোগ একটি ক্রীড়াভিত্তিক স্টার্টআপ Sports Royalty Systems-এ। কাজটা ছিল ক্রীড়াপ্রেমীদের পছন্দের দলকে সমর্থনের একটা প্ল্যাটফর্ম। পুরো ব্যাপারটা নিজের হাতেই সামলানোর দায়িত্ব পান ভাবনা। এই দায়িত্বকে তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ বলেই মনে করেন ভাবনা। প্রচুর দায়িত্ব। সঙ্গে প্রত্যাশা। দক্ষতা আর পরিশ্রমকে হাতিয়ার করে লড়াই জারি রাখেন ভাবনা।

স্পোর্টস রয়্যালটি সিস্টেমস বন্ধ হয়ে যায় ২০০৬ সালে। সেইসময় মাতৃত্বের জন্য ছুটির দরকার ছিল ভাবনারও। পরে তিনি যোগ দেন care.com নামে একটি সংস্থায়। সেখানে তার স্বামী ছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তবে ঘরে থেকেই কাজটা করতেন ভাবনা। স্বামীর প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি চাকরিতে ঢুকেছেন, এমন একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি না হওয়ার জন্যই অফিস যেতে চাননি তিনি। সে যাই হোক, প্রযুক্তি ক্ষেত্রে অধিকাংশ মহিলাকে যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হল পরিবার না কেরিয়ার, কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটা বেছে নেওয়া। ভাবনা কিন্তু দুটোকেই সমান দক্ষতায় সামলাতে থাকেন। কিন্তু একাজটাও একঘেয়ে লাগায় তিনি সংস্থা পরিবর্তন করেন।

২০০৮ সালে UPromise নামে একটি সংস্থায় যোগ দেন ভাবনা। সেখানেই কাজ করতেন তার স্বামী। এরপর যোগ দেন Bank of America-তে। সেখানে কাস্টমার সার্ভিস অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করেন ভাবনা। ২০১০ সালে দেশে ফিরে আসেন ভাবনা ও তার স্বামী। সন্তানের জন্য ভালো স্কুল খুঁজতে থাকেন তারা। কিন্তু মনের মতো স্কুল মেলেনি। এই সমস্যার সমাধান করতে এগিয়ে আসেন তার স্বামী। সমস্ত স্কুলের নামধাম দিয়ে একটি পোর্টাল চালু করেন তিনি। এই প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে ভাবনার পরিচয় হয় TeacherJi (টিচারজি)সংস্থার প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে। এই পরিচয়েরই ফলশ্রুতি হল ThinkVidya.


সেই সময় IBM-এ কাজ করছিলেন ভাবনা। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক সেই কাজের পরিবেশ তার ভালো লাগেনি। এর আগে প্রায় সবক্ষেত্রেই স্টার্টআপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। তাছাড়া সেখানে করার মতো কোনও কাজও ছিল না। ইতিমধ্যে ThinkVidya-র সহ-প্রতিষ্ঠাতাও সংস্থা ছেড়ে বেরিয়ে যান। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে IBM ছেড়ে

ThinkVidya-তে Chief Technology Officer (CTO) হিসাবে যোগ দেন ভাবনা। থিংক বিদ্যা যে উচ্চতায় পৌঁছেছে তার মূলে কিন্তু ভাবনার পরিশ্রম। থিংক বিদ্যার এখন নতুন নাম আর্বানপ্রো (Urbanpro). শিক্ষামূলক বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত এই সংস্থা। সবমিলিয়ে এখনও পর্যন্ত এভাবেই এগিয়ে চলেছেন ভাবনা। তিনি মনে করেন, কেউ যদি কোনও কাজের প্রতি একনিষ্ঠ হন সাফল্য আসবেই। তাই মন দিয়ে কাজ করে যেতে হবে। সেটাই সাফল্যের চাবিকাঠি।

লেখা - আদিত্যভূষণ দ্বিবেদী