ভেন্যু থেকে মেনুর তত্ত্বতালাশ সন্দীপ লোধার ওয়েডিংস ডট ইন-এ

0

লাখ কথায় নাকি বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের আয়োজন? পুরোহিত, বিয়ের কার্ড, ক্যাটারার, ডেকরেটার্স, তত্ত্ব, ভেন্যু, মেনু....উফ্....তালিকা যেন ফুরোতেই চায় না। বরপক্ষ হোক বা কনেপক্ষ কারোরই রেহাই নেই এর থেকে।

গত বছর এক আত্মীয়ের বিয়েতে যোগ দিতে ওড়িশা গিয়েছিলেন সন্দীপ লোধা। বিয়েবাড়িতে পা ফেলেই বুঝেছিলেন গত দু‍’দশকে পারিবারিক অনুষ্ঠান আয়োজনের হ্যাপা একইরকম রয়ে গেছে।


সন্দীপ লোধা, ওয়িডংস ডট ইন-এর প্রতিষ্ঠাতা। ‌

ফুলওয়ালা থেকে মেহেন্দি, বরের গাড়ি থেকে ফটোগ্রাফি--- এক দরজা থেকে আরেক দরজায় ছুটতে ছুটতে মূল অনুষ্ঠানের আগেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন পরিবারের লোকজন। আর এখান থেকেই একটা ভাবনা খেলে গেল সন্দীপের মাথায়।

বরাবরই অন্ত্রেপ্রেনিওর হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন আইআইটি স্নাতক সন্দীপ। ২০০৬ সালে দ্য ওয়ারটন স্কুল থেকে এমবিএ করার পর বেইন অ্যান্ড কোম্পানি-তে যোগ দেন। সেখানে ভালই রোজগার হচ্ছিল। কিন্তু তিন বছরের মাথায় সব ছেড়ে ভারতে চলে আসেন ব্যবসা করার তাগিদে।এর পিছনে অবশ্য বেশ কয়েকটি কারণ ছিল। “ নিজের দেশের পরিচিত বাজার, ভারতীয় গ্রাহকদের মানসিকতাও জানা। ফলে সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।” বলছিলেন সন্দীপ।

সেবার অবশ্য বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি সন্দীপ। হয়তো সময়টা ঠিক ছিল না। তাই আরও কিছু বছর কাটল বেইন অ্যান্ড কোম্পানিতে। ২০১৩ সালে ডিজনি ইন্ডিয়ার কনজিউমার প্রোডাক্ট ডিভিশনে যোগ দেন তিনি।

২০১৪ সালে সন্দীপ ভারতে ফেরেন তাঁর এক ভাইয়ের বিয়েতে যোগ দিতে। আর সেখানেই তাঁর ব্যবসা করার ইচ্ছা সঠিক দিশা পায়।২০১৫ সালে জন্ম হয় ওয়েডিংস ডট ইন-এর।

ওয়েডিংস— স্বপ্নের বাস্তব রূপ

২০১৫ সালের মে মাসে ওয়েডিংস স্থাপিত হয়। এখানে গ্রাহকরা মাউজের এক ক্লিকেই বিবাহ সম্বন্ধীয় সবরকম সামগ্রী ও পরিষেবা চাক্ষুষ করতে পারেন। একইসঙ্গে, পাত্র-পাত্রীরা বিয়ের বিপুল সংখ্যক ছবির সম্ভার থেকে নিজেদের ‘ড্রিম ওয়েডিং’ প্ল্যান করতে পারেন।

প্রথমেই অবশ্য সাফল্যের মুখ দেখেননি সন্দীপ। একজন সংসারী মানুষের পক্ষে এতবড় ঝুঁকি নেওয়াও মুখের কথা ছিল না। কিন্তু বিভিন্ন মহলে পরিচিতির সুবাদে নেটওয়ার্ক তৈরি করা সহজ হয়েছিল তাঁর মতো একজন স্টার্টআপের পক্ষে।

অক্টোবর এবং নভেম্বর মাসের মধ্যে ওয়েডিংস দিল্লি, পুনে, গোয়া, জয়পুর, ব্যাঙ্গালোর, যোধপুর, জয়সলমীরের মতো ১১ টি শহরে বিয়ের আয়োজন করার বরাত পেয়েছিল। ২০০০ ভেন্যু এবং প্রত্যেকটি ক্ষেত্রের জন্য নির্দিষ্ট ভেন্ডারদের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে ফেলেছিল তারা। বর্তমানে ওয়েডিংসের কর্মীসংখ্যা ৮০। এদের মধ্যে ২০ জনই রয়েছেন কাস্টমার সাপোর্ট সেলে। কারণ গ্রাহকদের সন্তুষ্টিই তাঁর ব্যবসায়িক উন্নতির পাথেয়, বিশ্বাস করেন সন্দীপ।


স্বপ্নের উড়ান

দিনে দিনে আড়ে বহরে বাড়ছে তাঁর সংস্থা। প্রতি মাসে অন্তত ৫০ হাজার গ্রাহক এই সাইট সার্ফ করছেন। শুধু নভেম্বর মাসেই ৮০০-র বেশি বরাত পেয়েছ ওয়েডিংস। অক্টোবরে যেই সংখ্যাটা ছিল ৪৫০! অর্থাৎ প্রতি মাসে ৫০% এর বেশি বাড়ছে ব্যবসা। নভেম্বর মাসে ১০০‍র বেশি ভেন্যু বুকিং হয়েছে। অক্টোবরে যেই সংখ্যাটা ছিল ৭০। ভেন্যু বুকিং থেকেই মূল আয় হয় ওয়েডিংসের। আগামী বছরের মধ্যে ব্যবসায় ১০০ গুণ বৃদ্ধি আনতে চান সন্দীপ।

‌যদিও বর্তমান বা ভবিষ্যত আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আলোচনায় উৎসাহী নন সন্দীপ। প্রশ্ন করায় তাই উত্তর দিলেন ঘুরিয়ে, “ভারতে বিরাট বাজার রয়েছে যার চাহিদা পূরণ করতে এই মুহূর্তে অপারগ আমরা।এই ক্ষেত্রের সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য হল, কখনওই অভাব হয় না ইভেন্টের। চাইলে হরেক রকম সামগ্রী আর নতুন নতুন পরিষেবা গ্রাহকের সামনে তুলে ধরা যায়।”

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

চাহিদা ক্রমশ বাড়তে থাকায় এবার স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ভেন্যু বুকিংয়ের চিন্তাভাবনা শুরু করেছেন সন্দীপ। একইসঙ্গে থ্রি ডি‍ ভেন্যু দেখার সুবিধা গ্রাহকদের সামনে তুলে ধরতে কাজ চালাচ্ছে ওয়েডিংস। আগামী তিন মাসের মধ্যে মোবাইল অ্যাপও বাজারে আনছে তারা।

ইওরস্টোরির মত

কনডে নাস্ট ইন্ডিয়ার সমীক্ষা অনুযায়ী ২০১৪ সালে ওয়েডিং প্ল্যানিং ইন্ডাস্ট্রির বাজার ছিল ৩৮০০ কোটি মার্কিন ডলারের। বৃদ্ধির হার ২৫%-৩০%। কিন্তু এই ক্ষেত্রটি সংগঠিত নয়। আর বেশিরভাগ শহরেই অফলাইন ওয়েডিং প্ল্যানার আর ভেন্ডারদের চাহিদা তুঙ্গে। যদিও ৭বচন, মাইশাদি, ওয়েডিংস নাইন, আরবানরেস্ট্রো এবং গেটইওরভেন্যু’র মতো অনলাইন প্ল্যানাররাও ধীরে ধীরে বাজার দখল করছে।

যেভাবে অন্যান্য ক্ষেত্রে অনলাইন মার্কেটিং জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, তেমনই বিয়ের মতো পারিবারিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও তার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। গুগল আর ফরেস্টার কনসাল্টিংয়ের সমীক্ষা অনুযায়ী আগামী বছরের মধ্যে ভারতের ১০ কোটি অনলাইন গ্রাহকের ৪০শতাংশই হবেন মহিলা। শহুরে এলাকায় যেহেতু বিয়ের কেনাকাটা সংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেন কনেরা, তাই সেইদিন আর দূরে নেই, ‌যখন ভেন্যু থেকে মেনু সবকিছুর জন্যেই প্রথম পছন্দ হবে অনলাইন ওয়েডিং সাইট।

লেখক- তারুশ ওয়ালিয়া

অনুবাদ- শিল্পী চক্রবর্তী