এবার ধনতেরসে 'অরনাটিভা'-র গয়নাই ট্রেন্ড

0

আটপৌরে বাঙালি ঘরের মেয়ে সুপ্তত্থিতা আর মফস্বলের ছেলে নবারুণ। একেবারে নিজেদের চেষ্টায় ই-কমার্সে জমি দখলে দুজনে উঠে পড়ে লেগেছেন। শুরুয়াতির বাজারে কলকাতার খুব একটা সুনাম নেই। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতর সামনে পড়েও অস্তিত্বের লড়াইটা দারুণ লড়ছে সুপ্তত্থিতা-নবারুণের ornativa.com। 

শুধুমাত্র গয়না বেছে তার অর্ডার নয়, একেবারে নিজের মতো করে গয়না ডিজাইন করে আপনি অর্ডার করতে পারেন এই ওয়েবসাইটে। দামও সাধ্যের মধ্যে। তা হলে আর দেরি কেন? আসুন জেনে নিই দুই বন্ধুর এই অনন্য স্টার্ট-আপ এর গল্প।

স্টার্ট-আপের জোয়ারে ভাসছে মুম্বই, পুণে, বেঙ্গালুরু। তবে কলকাতার বুকে দাঁড়িয়ে নিজেদের স্টার্ট-আপের কথা ভাবলেও শেষ পর্যন্ত এগোতে পারেন না অনেকেই। সাহসে ভর করে যদি বা কেউ কেউ এগিয়ে আসেন, প্রতিকূল পরিস্থিতি, অর্থাভাব এবং সর্বোপরি শহরবাসীর মধ্যে অনলাইন শপিং নিয়ে দোলাচল, তাঁদের পিছিয়ে যেতে বাধ্য করে। এরই মধ্যে কেউ কেউ হয়ে ওঠেন ব্যতিক্রমী। যেমন গড়িয়ার সুপ্তত্থিতা নিয়োগী এবং হাওড়া আমতার নবারুণ চক্রবর্তী। ই-কমার্সে নজর কেড়েছে এই দুই বাঙালি তরুণ তরুণীর জুয়েলারি ভেঞ্চার ornativa.com। 

২০১৪ সালে আত্মপ্রকাশ করে এই ওয়েবসাইট। পরিকল্পনা মাথায় থাকলেও তা বাস্তবে রূপায়িত করতে প্রতি পদে বাধা পেতে হয়েছে তাঁদের। কলকাতায় থেকে উদ্যোগপতি হয়ে উঠতে চাইলে যে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে তা অল্প সময়েই বুঝে গিয়েছিলেন তাঁরা। 'আমরা হন্যে হয়ে বিনিয়োগকারী খুঁজেছি। আমাদের কনসেপ্ট তাঁদের পছন্দ হচ্ছিল। কিন্তু প্রত্যেকেই বলছিলেন মুম্বই, বেঙ্গালুরু অথবা দিল্লিতে কোম্পানি খুলতে। তবেই তাঁরা বিনিয়োগ করবেন।' বললেন সুপ্তত্থিতা। শেষ পর্যন্ত দুজনেই নিজেদের জমানো সব পুঁজি উজাড় করে দিয়েছিলেন এই কোম্পানির পিছনে। শুধুমাত্র বিনিয়োগকারী নয়, পরিবারের সকলকে বোঝতেও বেশ বেগ পেতে হয়েছিল দুজনকেই। বন্ধুদের তরফেও সাহায্যের চেয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপই বেশি জুটেছিল। তবে নিজেদের পরিকল্পনা থেকে কখনওই সরে আসার কথা ভাবেননি নবারুণ এবং সুপ্তত্থিতা।

কিন্তু হঠাৎ এই পরিকল্পনা মাথায় এল কীভাবে? উত্তর এল নবারুণের কাছ থেকে। বললেন, 'আমতার স্কুলেই পড়াশুনো করেছি। সেখানকারই একটি প্রতিষ্ঠান থেকে জুয়েলারি ডিজাইনিং এবং CAD-এ ডিপ্লোমা করি। প্লেসমেন্ট হয় বেঙ্গালুরুতে। ২০০৭ থেকে ২০১২। বছর পাঁচেক বেঙ্গালুরুতেই ছিলাম। সেখানে bluestone.com-এ কাজ করতে করতে হঠাৎ মাথায় আসে নিজের স্টার্ট-আপ এর পরিকল্পনা।' তবে নিজের উদ্যোগের ভাবনা থাকলেও অর্থের জোগান পাওয়া যে মুশকিল তা জানতেন তিনি। বেঙ্গালুরুর পর বছর দেড়েক দুবাই-তে দুটি জুয়েলারি সংস্থার সঙ্গে কাজ করেন নবারুণ। বছর সাতেকের সঞ্চিত অভিজ্ঞতা এবং অর্থ সঙ্গে করে ২০১৪য় কলকাতা আসেন তিনি। 

অন্যদিকে সুপ্তত্থিতা তখন কলেজ পাশ করে মার্কেটিং এবং পাবলিক রিলেশন্স এ ফ্রিল্যান্স করছেন। তবে তাঁর মনেও নিজের ব্যবসা গড়ে তোলার ইচ্ছে সুপ্তই ছিল। বাড়িতে সকলে চাকরি করেছেন। ব্যবসার বিষয়টা তাঁদের মাথায় ঢোকেনা। কয়েকজন বন্ধুকে বলেও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। অবশেষে ঠিক করলেন তাঁরা দুজনেই এগোবেন। নবারুণের জুয়েলারি ডিজাইনিংয়ে অভিজ্ঞতা আর সুপ্তত্থিতার মার্কেটিং স্কিল। এই দুয়ের কাঁধে ভর করে নিজেদের জমানো দশ লক্ষ টাকা দিয়ে খুলে ফেললেন ornativa.com।

দেড় বছরে বেশ খানিকটা পথ এগোতে পেরেছে এই সংস্থা। দুই বন্ধুর হাত ধরে শুরু হওয়া সংস্থার আজ মোট সদস্য সংখ্যা দশজন। ফ্যাশন জুয়েলারি প্রস্তুত করে এই কোম্পানি। মুম্বই এবং ব্যাংককে তৈরি হয় গয়না। এই ব্র্যান্ডের নিজস্ব ডিজাইন করা গয়নার পাশাপাশি যেকোনও গ্রাহক একেবারে তাঁর জন্য কাস্টমাইজড জুয়েলারিও কিনতে পারেন এখান থেকে। অর্থাৎ সহজ করে বলতে গেলে, আপনি যদি সকলের থেকে অন্যরকম, নিজের মনের মতো কোনও ডিজাইনের গয়না পরতে চান, তাহলে তা বানিয়ে দেবে এই সংস্থা। ডেলিভারির জন্য সময় লাগতে পারে সর্বাধিক সাত থেকে আটদিন। এখনও পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে এক হাজারটি গয়নার অর্ডার পাচ্ছে এই সংস্থা। যার গড় মূ্ল্য ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকা।

২০১৪-১৫ অর্থবর্ষের শেষে অর্নাটিভার টার্নওভার ছিল ১২লক্ষ টাকা। সেই সংখ্যাকে এবার ৫০লক্ষ-য় নিয়ে যেতে চান সুপ্তত্থিতা এবং নবারুণ। তবে আফশোসের বিষয়, কলকাতা শহরই ornativa.comএর উৎপত্তিস্থল হলেও এখান থেকে অর্ডার আসে বেশ কম। তুলনায় বেঙ্গালুরু, মুম্বই এবং চেন্নাইয়ে এই ফ্যাশন জুয়েলারির চাহিদা অনেক বেশি। সংস্থার রিসার্চ বলছে, তফাতটা এতটাই যে, বেঙ্গালুরু থেকে যদি মোট অর্ডারের ৪০শতাংশ এসে থাকে, তাহলে কলকাতা থেকে আসে মাত্র ২ বা ৩ শতাংশ। শুধুমাত্র এই কারণেই বহু সংস্থা তাদের স্টার্ট-আপ সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মুম্বই, বেঙ্গালুরু, দিল্লির মতো জায়গায়।

তবে ornativa-র পক্ষে খানিকটা স্বস্তির বিষয়, চলতি বছরে Microsoft Ventures এবং ‘Microsoft Bizspark’ নিবেদিত ‘IBM Catalyst Program’, ISDI Creative Accelerator এর জন্য নির্বাচিত হওয়া। এর ফলে সরাসরি বিনিয়োগ না পেলেও, প্রযুক্তিগতভাবে সম্পূর্ণ সাহায্য পাচ্ছে এই সংস্থা। পরোক্ষে সার্ভারের খরচও কমছে। ৬মাসের এই প্রকল্পে সংস্থার অফিসের জায়গা, ব্যবসা এবং প্রযুক্তি সংক্রান্ত সাহায্য, মাইক্রোসফ্ট সফ্টওয়্যার, কার্যনির্বাহী এবং ব্যবহারযোগ্য সহায়তা এবং আর্থিক জোগানের ক্ষেত্রে সহয়াতা করবে ISDI Creative Accelerator। ফলে নবারুণ, সুপ্তত্থিতা এবং তাঁদের টিমের চিন্তার ভাঁজ খানিকটা দূর হয়েছে। এরই মধ্যে নিজেদের ব্র্যান্ড ornativa.com ছাড়াও স্ন্যাপডিল, পেটিএম, ফ্যাশনারা, শপক্লুজ-এর মতো আরও ২৫টি ই-কমার্স সাইটে বিক্রি হচ্ছে অর্নাটিভার ফ্যাশন জুয়েলারি। ফলে সংস্থার এবছরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা হয়তো খানিকটা সহজ হবে। ব্যবসা বাড়াতে অনলাইনের পাশাপাশি নিজেদের অ্যাপস তৈরির পরিকল্পনাও শুরু করে দিয়েছেন তাঁরা।

অন্যান্য শহরের মতো এশহরের নতুন প্রজন্মও ভাবতে জানে। তবে তাদের ভাবনাগুলো বাস্তবে পরিণত হওয়ার পথে বাধা বিপত্তি অনেক বেশি। সেই কারণে অনেকেই কলকাতা ছেড়ে অন্য শহরে বা একেবারে দেশের বাইরে পাড়ি দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতিতেও নিজেদের জায়গা ধরে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে ornativa.com। গড়পড়তা ধারণা ছেড়ে অনেক দূর এগিয়ে এসেছে মধ্যবিত্ত পরিবারের সুপ্তত্থিতা, এবং মফস্বলের ছেলে নবারুণ।

তাঁদের চলার পথ সহজ হোক, সেই আশা করি আমরা। ইওর স্টোরির পক্ষ থেকে টিম অর্নাটিভার জন্য রইল শুভকামনা।