প্রার্থনায় ভর দিয়েই মালতির যাত্রা শুরু

মালতি ভোজওয়ানি প্রথিতযশা জীবন শিক্ষক। একজন তত্ত্ববিদ। অন্যদের জীবনের আলোর পথ দেখান তিনি। নিজের জীবনের সংকটকে সুযোগে বদলে দিয়ে তিনি এখন অনেকের সামনেই জলজ্যান্ত উদাহরণ। বহু মানুষকে এগোবার প্রেরণা এবং শক্তি জোগাচ্ছেন। আমরা এইরকম শক্তিশালী মহিলার সঙ্গে সাক্ষাত করার সুযোগ পাই, জানতে পারি তাঁর জীবনের উত্থান পতন, ঝড়ঝাপ্টার গল্প।

0
মালতি ভোজওয়ানি
মালতি ভোজওয়ানি

কোনও ক্রমে ইন্দোনেশিয়ায় ইংরেজির শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। ফ্যাশান ডিজাইনিং এবং রত্নবিদ্যা নিয়েও পড়াশুনো করতেন। পরে অস্ট্রেলিয়ায় পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দেন। আর পাঁচটা মেয়ের মতই সংসার করার স্বপ্ন দেখতেন অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া মালতি। কিন্তু যখন বিয়েটা টিকল না জীবনের মোড় ঘুরে গেল। ২৬ বছর বয়সে আলাদা হয়ে গেলেন। সঙ্গে তাঁর ছোট্ট মেয়ে।

"সেই প্রথম টনি রবিনসের সেমিনারে গিয়েছিলাম। সেই ছিল প্রথমবার জ্বলন্ত কয়লার ওপর দিয়ে হাঁটা। এটাই ছিল আমার প্রথম কোনও ব্যক্তিত্ব বিকাশের কোর্সে যোগ দেওয়া। আমি LGAT (Large Group Awareness Training) এ অংশগ্রহণ করেছিলাম। এটা HPM (Human Potential Movement) এরই একটা অংশ। আমি আমার জীবনের দায়িত্ব নিতে শিখলাম। এবং পরিস্থিতির শিকার হয়েছি অথবা নিজের জন্য দুঃখপ্রকাশ করা ছাড়তে শিখলাম। একই সঙ্গে এই প্রশিক্ষণ থেকে আমি দেখলাম প্রশিক্ষকের ভূমিকাটা ঠিক কী। আমার দারুণ লেগেছিল। বেশ উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম।" কীভাবে তাঁর পথচলা শুরু হল সেকথাই বলেছিলেন মালতি। 

প্রশিক্ষিত জীবন শিক্ষক হিসাবে তিনি আন্তর্জাতিক কোচ ফেডারেশনে নিজেকে নথিভুক্ত করিয়েছেন। কিন্তু মাথার ভিতর জীবন শিক্ষার প্রতিষ্ঠান করার কথাই ঘুরছিল। যদিও সেটা বেশ কঠিন কাজ। বাজার সম্পর্কে তাঁর স্বচ্ছ ধারণা ছিল না। গ্রাহকদের কাছে কীভাবে পৌঁছবেন সেটাই ছিল চিন্তার বিষয়। ২০০০ সালের শুরু থেকে টানা তিন বছর ব্যক্তিগত সমস্যার পাশাপাশি আর্থিক সমস্যার সঙ্গে কঠিন লড়াই লড়তে হয়েছে মালতিকে। "শুভাকাঙ্খীরা আমায় ঠিকঠাক চাকরি করতে বলতেন। কিন্তু আমার জেদ চেপে গিয়েছিল। বলতে পারেন, আজ তারই সুফল পাচ্ছি।" একগাল হেসে বললেন মালতি।

ইস্পাত কঠিন সংকল্প আর ভগবানের প্রতি অটল বিশ্বাস মালতিকে সংকট থেকে বের করে এনেছে। তাঁর এই কঠিন অভিজ্ঞতার কথাই তাঁর প্রবন্ধ ‘7 Recovery Steps to get over a break up’-এ লিখেছেন। সহানুভুতিকে দূরে সরিয়ে জীবনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া মালতি সকলের কাছে এক প্রেরণা।

বলছিলেন, তিনি নাকি তখন বেশ মোটা ছিলেন, অতিরিক্ত ওজন ছিল। আর এখন এক কণাও বাড়তি মেদ নেই। তন্বি ছিমছাম। মালতি বলছিলেন "আমি উপলব্ধি করলাম বাহ্যিক কোনও শক্তি বা কোনও ব্যক্তি নয়, আমার এই আনন্দের স্রোত এসেছে হৃদয় থেকে। সত্যি সত্যি নিজের প্রেমে পড়তে শিখেছি, নিজের উদ্দেশ্যের প্রেমে। আমি এই ব্যবসা এবং ব্র্যান্ডকে তৈরি করতে আমার সমস্ত ক্ষমতা আর সময় নিয়োগ করেছি।"


বাণিজ্যিক সফর

মালতি এতদিনে পাঁচশোরও বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তাঁদের জীবনকে অন্যভাবে দেখতে সাহায্য করেছেন। ব্যক্তিপিছু তিন-চার মাস ধরে জীবন শিক্ষক হিসেবে পরিষেবা দেন। এদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করেন। কথা বলেন। সমস্যায় পড়লে উত্তরণের পথ খুঁজে দেন। তাঁর সংস্থা মালতি কোচিং ইন্টারন্যাশনাল ব্যক্তিগত কাউন্সেলিং ছাড়াও প্রশিক্ষণের কর্মশালার আয়োজন করে এবং কর্পোরেট প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকে। এরকমই একবার মাইক্রোসফটের বড়কর্তাদের প্রশিক্ষিত করতে একদিনের একটি কর্মশালার জন্য ডাক পেলেন। তাইল্যান্ড গিয়েছিলেন মালতি। "এর আগে কখনও কর্পোরেট জগতের কাজ করিনি। প্রথমে কিছুটা ভয় ভয় করছিলো। কিন্তু তা সামলে শ্রোতাদের সঙ্গে যোগাযোগটা ভালোই তৈরি করতে পারি। উপস্থিত শ্রোতাদের অনেকের দৃষ্টিভঙ্গিতেই বেশকিছু দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আনতে পেরেছিলাম।" বলতে বলতে মুখ চোখ উজ্বল হয়ে উঠছিল মালতির।

ইতিমধ্যে দুটি বই লিখে ফেলেছেন তিনি। তাঁর ‘Don’t Think of a Blue Ball’ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রশংসিত হয়েছে। ইন্দোনিশিয়ায় স্থানীয় ভাষা ভাসায় অনুদিতও হয়েছে বইটি। আরও একটি বই‘Thankfulness Appreciation Gratitude’ এত বিক্রি হয়েছে যে এখন পুনর্মুদ্রিত হচ্ছে। আগামি বছর আরও কিছু বই প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভরসা আছে ওঁর, নিজস্ব ওয়েবসাইট, ইউটিউব চ্যানেল মারফত সম্ভাব্য গ্রাহকদের কাছে পৌঁছন। বলছিলেন, "তত্ত্ববিদ্যা প্রশিক্ষণ আসলে আমাদের অস্তিত্ব এবং আমাদের হয়েওঠার শিক্ষাই দেয়। আমি বিভিন্ন ধরণের মানুষ নিয়ে কাজ করেছি। বড় সংস্থার কর্ণধার হোন বা সাধারণ গৃহবধূ বা শিল্পী সকলের ক্ষেত্রেই বিষয়টা কোথাও এক। চাহিদা এবং তাগিদের প্রশ্নে সকলেই সমান। আমরা যা, আমরা ঠিক তাই হয়ে উঠতে গেলে নতুন কিছু অভ্যাস অর্জন করতে হয়। মানুষ যে আসলে কী তার অনুসন্ধান প্রয়োজন।"

মানুষের সেবায় নিয়োজিত একটা প্রতিষ্ঠান তৈরির স্বপ্ন দেখেন মালতি ভোজওয়ানি। মূলত মহিলাদের জন্য। তাঁরা যে জীবন পেতে চান তাই যেন পেতে পারেন সেই সহযোগিতার হাত বাডিয়ে দেবেন তাঁর সংস্থার বিশেষজ্ঞরা। সেই প্রতিষ্ঠান শুধু ভারতের ভিতর নয়, গোটা দুনিয়ার মানুষের জন্যে নিবেদিত হবে। খুব শীঘ্রই তাঁর জীবন শিক্ষার ছোঁয়া পেতে চলেছে বেঙ্গালুরুর ইন্দিরানগর। খুলতে চলেছেন তাঁর ব্রেন স্পা। মালতির সরল স্বীকারোক্তি, "আমি ওপরা উইনফ্রের দ্বারা ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত।"

ভারতীয় গ্রাহকদের নিয়ে বেশ কিছু সমস্যাও রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “এখনও জীবন শিক্ষা এবং তত্ত্ববিদ্যা নিয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারণা ভাঙতে হবে। ভারতে একজন থেরাপিস্ট বা জীবনশৈলীর শিক্ষককে বাঁকা চোখে দেখা হয়। এই ক্ষেত্রে ডিজিটাল বিশ্ব আমাদের সাহায্য করতে পারে।” সেক্ষেত্রে মালতি বলছেন, অনলাইন মিডিয়া তাদের দূরত্ব এবং গোপনীয়তা দিতে পারবে। যে কেউ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন খুব সচেতন না হয়েই। এখনও অনেক পথ পারি দিতে হবে মালতিকে। এই কঠিন সফরে তাঁর প্রেরণা তাঁর বাইশ বছরের মেয়ে। যে এখন অস্ট্রেলিয়ায় একটি প্রকাশন সংস্থায় কাজ করেন।

ব্যক্তিগত দুরবস্থা সামাল দিতে মালতির তিনটি দাওয়াই

১. ভুল এবং অনুতাপকে যেতে দাও। আমরা আমাদের যেটুকু জ্ঞান এবং সম্পদ থাকে তার ভিত্তিতে সেরাটাই দিই। যে বা যারা কখনও তোমায় আঘাত দিয়েছে এটা তাদের জন্যেও সত্যি। তারাও সেসময় তাদের যা করার ছিল করেছেন, কিছুই ব্যক্তিগত নয়।

২. চেষ্টা করতে হয়। কখনই মনে কোরো না এটা সোজা। এবং কখনই নিজে লড়াইকে অন্যের সঙ্গে তুলনা কোরো না। সাফল্য ব্যতিক্রম, তাই ব্যতিক্রমী হও। যুক্তিতর্কের ঊর্ধ্বে ওঠো। তর্ক আসলে অজুহাত, আমাদের পিছিয়ে দেয়।

৩. আমি যথেষ্ট ভালো নই, আমি পারব না বা এটা বেশ কঠিন এসব কথা মাথা থেকে বের করে দাও। বরং তার জায়গায় জোরালো গলায় বলো আমি বেশ ভালো, শরীরটাকে এমন মর্যাদায় নিয়ে‌ যাও, যেন ইতিবাচক স্বরগুলো চিৎকার করে ফুটে ওঠে।