আঞ্চলিকভাষায় স্বল্পদৈর্ঘ্যের নিউজ সার্ভিস-ওয়েটুনিউজ

0

একদশক আগে অবধিও সংবাদমাধ্যম বলতে ছিল সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা রেডিও। খবর জানার জন্য এই গণমাধ্যমগুলির ওপরই ভরসা করতে হত। কিন্তু গত এক দশকে চিত্রটা অনেকটাই বদলেছে, দ্রুত জায়গা করে নিয়েছে ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যম। ডিজিটাল যুগের হাত ধরেই এসেছে তথ্য বিস্ফোরণের যুগ। এক্সেলাকম-এর রিপোর্ট বলছে প্রতি ইন্টারনেট মিনিটে তৈরি হয় ৩২০টি নতুন ট্যুইটার অ্যাকাউন্ট, শেয়ার হয় প্রায় ৫,৪৭,০০০টি ট্যুইট। ভাইনে প্রতি মিনিটে শেয়ার হয় ৮,৪৩৩টি ভিডিও, চলে ১.০৩ মিলিয়ন ভিডিও লুপ।

স্থানীয় থেকে আন্তর্জাতিক বিভিন্নরকম খবরের জন্য রয়েছে অসংখ্য নিউজ পোর্টাল, কেউ মৌলিক খবর প্রকাশ করে তো কেউ অন্যান্য জায়গা থেকে খবর সংগ্রহ করে তা পরিবেশন করে পাঠকের জন্য। সাম্প্রতিককালে আরও দুটি ধারা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, স্বল্প দৈর্ঘ্যের খবর ও আঞ্চলিক ভাষায় পরিবেশিত খবর। এই দুটি ক্ষেত্রেই পা রাখতে চাইছে ওয়েটুনিউজ।

ওয়েটুনিউজ কী?

ওয়েটুনিউজ একটি মোবাইল অ্যাপভিত্তিক নিউজ সার্ভিস। বিভিন্ন সূত্র থেকে খবর সংগ্রহ করে ভারতীয় আঞ্চলিকভাষায় ম্যাগাজিন স্টাইলে তা পরিবেশন করাই উদ্দেশ্য ওয়েটুনিউজের। দ্বিতীয় স্তরের শহর থেকে ক্রমেই তৃতীয়স্তরের শহরে ছড়িয়ে পড়ছে স্মার্টফোন, এবং তা বৃদ্ধি করবে আঞ্চলিকভাষায় খবরের চাহিদা, এমনটাই মনে করছে ওয়েটুনিউজ টিম। ওয়েটুএসএমএস খ্যাত ওয়েটুঅনলাইন কোম্পানিই বাজারে এনেছে এই নিউজ সার্ভিস। ২০০৬ সালে ওয়েটুএসএমএস শুরু করেন রাজু ভানপালা। বিজয়ওয়াড়া শহরের এক কৃষক পরিবারে জন্ম রাজুর। বর্তমানে ওয়েটুএসএমএস-এর গ্রাহক সংখ্যা ৪০মিলিয়ন ছাড়িয়েছে।


রাজু ভানপালা
রাজু ভানপালা

অনলাইন এডুকেশন প্ল্যাটফর্ম লার্নঅনলাইন-এরও প্রতিষ্ঠাতা ও কর্ণধার রাজু। কোম্পানির অপারেশন ও সামগ্রিক পরিকল্পনার দায়িত্ব তাঁর। ইন্ডিয়া গ্রোথ স্টোরিতে উদ্বুদ্ধ রাজুর স্বপ্ন, ভারতে ইন্টারনেট ভিত্তিক বিলিয়ন ডলারের কোম্পানি তৈরি।

রাজুর মতে, বর্তমানে ভারত পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ইন্টারনেট বাজার। ভারতে এর পরবর্তী পর্যায়ের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা হবেন অনেক বেশি গ্রামীণ, বয়স্ক ও আঞ্চলিক। এই অংশের মানুষ সেইসব খবর দেখতে চান, জানতে চান, তর্ক করতে চান যা অনেক বেশি আঞ্চলিক এবং ভাষা নির্দিষ্ট।

৩০ জনকে নিয়ে তৈরি ওয়েটুনিউজ টিমে ১৯জন সংবাদ সম্পাদনার কাজে যুক্ত, বাকিরা রয়েছেন মোবাইল ডেভেলপমেন্ট ও ম্যানেজমেন্ট টিমে। প্রথমে ঠিক করা হয়েছিল বিভিন্ন অ্যালগরিদমের মাধ্যমে স্বয়ংচালিত ব্যবস্থায় খবর পরিবেশন করা হবে, কিন্তু পরে নিজস্ব সম্পাদকমণ্ডলী মাধ্যমেই সংবাদ প্রকাশের সিদ্ধান্ত হয়।


“আমাদের পেশাদার সম্পাদকরা স্থানীয় দৈনিক, টিভি সংবাদের চ্যানেল, ওয়েবসাইট, ব্লগ ইত্যাদি নানা জায়গা থেকে খবর সংগ্রহ করে সেগুলিকে সারসংক্ষেপ করে ৪০০ অক্ষরে পরিবেশন করেন। লম্বা আর্টিক্যল না পড়েই খুব সহজেই যাতে পাঠক পৃথিবীর বিভিন্নপ্রান্তের খবর জানতে পারেন সেই উদ্দেশ্যেই তৈরি ওয়েটুনিউজ,” জানালেন রাজু।

অ্যাপটিকে বিভিন্ন ডিভাইসে চালিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে এবং পাইলট রান হয়েছে ৫,০০০ জন গ্রাহকের মধ্যে। ৪০০অক্ষরের খবরের পাশাপাশি ছবি ও ভিডিও গ্যালারিও রয়েছে ওয়েটুনিউজে। কোনও সংবাদের হেডলাইনটি ক্লিক করে, খবরটি সবিস্তারে পড়ার সুবিধাও রয়েছে। অ্যাপটি যাতে টুজি, থ্রিজি ও ওয়াইফাই সবরকম পরিষেবাতেই ভালভাবে দেখা যায় সেদিকে বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়েছে।

স্বল্পদৈর্ঘ্যের সংবাদের বাজার

জেনারেশন ওয়াই-এর পছন্দ স্বল্প দৈর্ঘ্যের লেখা বা ভিডিও, যেখানে কম সময় জেনে নেওয়া যায় মূল তথ্যটি। ট্যুইটার, ভাইন, স্ন্যাপচ্যাটের মত অ্যাপগুলির জনপ্রিয়তাও এটাই প্রমাণ করে। স্বল্প দৈর্ঘ্যের সংবাদ প্রকাশের অন্যতম পথপ্রদর্শক সিরকা মোট ৫.৭ মিলিয়ন বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছিল, কিন্তু ব্যবসার মডেলকে সঠিকভাবে এগিয়ে না নিয়ে যেতে পেরে এবছরের গোড়ার দিকে তারা অর্নিদিষ্টকালের জন্য ব্যবসা স্থগিত করে দেয়।

ভারতের নিউজইনশর্টস এবছরের জুলাইতে ২০ মিলিয়ন ইউএস ডলার বিনিয়োগ পায় টাইগার গ্লোবালের থেকে। সম্প্রতি তারা খবরের বাইরে অন্যান্য ক্ষেত্রেও স্বল্প দৈর্ঘ্যের লেখা প্রকাশে উদ্যোগী হয়েছে আর তাই নাম পরিবর্তন করে হয়েছে ইনশর্টস। এছাড়া এই ক্ষেত্রের ছোট সংস্থা ক্রুক্সেটর খবর প্রকাশ করে টাইমলাইন আকারে, অন্যদিকে অসামলি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে খবরের সারসংক্ষেপ প্রকাশ করে। আঞ্চলিক ভাষার ক্ষেত্রে ভারতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম নিউজহান্ট। আঞ্চলিকভাষায় বই ও খবর প্রকাশই মূল লক্ষ্য এই সংস্থার। গত বছর ১০০কোটি ও এবছর ২৫০কোটি বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে সংস্থাটি।

“ভারতে আঞ্চলিক ভাষার সংবাদের একটি বড় বাজার রয়েছে, তিন থেকে চারটি বড় সংস্থা অনায়াসেই ব্যবসা করতে পারে এই ক্ষেত্রে। গুগল প্লে স্টোরে প্রথম দশটি নিউজ অ্যাপের মধ্যে বেশিরভাগই আঞ্চলিকভাষার, দু’বছর আগেও চিত্রটা সম্পূর্ণ উল্টো ছিল,” জানালেন রাজু।

ওয়েটুএসএমএস এর মাধ্যমে সহজেই দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের শহরগুলিতে নিজেদের প্রচার করতে পারে ওয়েটুনিউজ। এছাড়াও এনআরআইরা তাদের নিজেদের শহর বা রাজ্যের খবর জানতে চায়, তাঁরাও ওয়েটুনিউজের গুরুত্বপূর্ণ গ্রাহক।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা

দুই থেকে তিন মিলিয়ন গ্রাহক সংখ্যায় পৌঁছনোর আগে পণ্য থেকে আয়ের কথা ভাবছেনা ওয়েটুনিউজ। বিটুবি মডেলে, স্থানীয় ও অন্যান্য জায়গা থেকে আয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মূল লক্ষ্য স্থানীয়ভাষার লেখা, যদিও এখনও অবধি সারসংক্ষেপ হয় ইংরিজিতেই। আগামী কিছুদিনের মধ্যেই ওয়েটুনিউজের আইওএস অ্যাপ শুরু হবে, ভবিষ্যতে আরও বেশি পরিমান খবর ও অন্যান্য ভাষা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সুনীল পাতিল, সংস্থার চিফ কনটেন্ট অফিসারা জানালেন, “খবরই আমাদের মূল, বর্তমানে হিন্দি, তেলুগু ও ইংরিজি এই তিনটি ভাষায় পাওয়া যাচ্ছে ওয়েটুনিউজ, আগামী কিছুদিনের মধ্যেই আমরা আরও আটটি ভাষাকে যুক্ত করব”।