শুধু বেচবেন কেন, "বুকটুক"-এ কিনুন ওজনদরে বই

0

কিলো দরে এতদিন বই বেচতেই অভ্যস্ত ছিল বাঙালি। পুরনো ম্যাগাজিন হোক বা গল্পের বই, রাখার জায়গার অভাবে বাড়িতে ব্রাত্য হত কোনও এক সময়। তারপর কিলো দরে ঠাঁই রদ্দিওয়ালার ঠেলা গাড়ি বা ঝুলিতে। কিন্তু কিলো দরে যে শুধু বই বেচা নয় বই কেনাও যায় তা অজানা ছিল কলকাতার। মনের মত পুরনো বই কিনতে ভরসার জায়গা ছিল কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাতের দোকান বা গোল পার্ক বা গড়িয়াহাটের মত মুষ্টিমেয় কয়েকটা জায়গা। যদিবা খুঁজে মনের মত বই মেলে। তবে দরদাম করে অল্প দামে সেই বই কেনা ছিল একটা বিশেষ আর্ট। যার ফলে পড়ার ইচ্ছে থাকলেও অনেক বইই থেকে যেত নাগালের বাইরে।কলকাতার বই প্রেমিকদের এই খেদ মেটাতে এগিয়ে এসেছেন তিন পুরুষের বই ব্যবসায়ী রমেশ তিওয়ারি।রমেশ ও তার মেয়ে সু্জাতা তিওয়ারির হাত ধরে এবার কলকাতায় পা রাখল বুকস বাই ওয়েট কনসেপ্ট।

বাইপাসের ধারে কালিকাপুরে তাদের দোকানে এলে দুশো টাকা কিলো দরে বই কিনতে পারবেন আপনি। পুনে,মুম্বাই বা বেঙ্গালুরুতে বই বিক্রির এই কনসেপ্ট অনেক দিন আগেই এসেছে। দিল্লির দরিয়াগঞ্জের রবিবার প্রতি কিলো দরে বই এর বাজার বহুদিন ধরেই বসছে। তবে কোনও অজানা কারণে কলকাতায় এই কনসেপ্ট এল অনেকটা দেরিতে। কিলো দরে বই বিক্রির কনসেপ্ট কলকাতাতে চালু করার কৃতিত্ব নিয়ে রীতিমত গর্বিত ব্যবসায়ী রমেশ তিওয়ারি। বললেন, "বই এর ব্যবসার সুবাদে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে।দেখেছি কিভাবে দামের কারণে দোকানে এসেও বই নাড়াচাড়া করে কলেজ পড়ুয়া বা অনেক মানুষ ক্রয় ক্ষমতার অভাবে পিছিয়ে যান।বইয়ের প্রতি ভালবাসা থাকলেও বাদ সাধে চড়া দাম।আবার উল্টোদিকে অনলাইনে বইয়ের দামে চড়া ডিসকাউন্টও কিভাবে প্রভাবিত করে ক্রেতাদের। ডিসকাউন্ট পেয়ে কিভাবে ছোটবেলার চেনা বইয়ের দোকান থেকে মুখ ঘোরায় নতুন প্রজন্ম। সবই দেখেছি। তাই আমার মেয়ে যখন ওজন দরে বই বেচার আইডিয়াটা কলকাতায় চালু করার প্রস্তাব দেয় রাজি হয়ে যাই।"

রমেশের মেয়ে এম ফিল স্টুডেন্ট সুজাতা তিওয়ারি বললেন, কিভাবে এই book by weight কনসেপ্ট তার নজরে আসে। বললেন,"কলেজ জীবনে দেখেছি সব সময় দামের জন্য অনেক বই কেনা সম্ভব হত না। সেসময় আমরা লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে জেরক্স করে কাজ চালাতাম। তারপর কোনও বেস্ট সেলার বই পুরনো হয়ে তার দাম কমলে তারপর স্টুডেন্টরা কিনে পড়ত। তাই যখন নেটে দিল্লি বা বেঙ্গালুরুর বুক বাই ওয়েট কনসেপ্ট সন্মন্ধে জানতে পারি তখন বাবাকে এবিষয়ে বলি। তারপর বেশ কয়েকদিনের চিন্তা ভাবনার পর ডিসেম্বরের শুরুর দিকে কালিকাপুরে আমাদের দোকান খুলি। বাংলায় "বই টই" শব্দ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নাম রাখি "বুক টুক"। একমাস পার করে বলতে পারি কলকাতার লোকজন আপন করে নিয়েছেন আমাদের "বুক টুক"। কোনও রকম প্রচার ছাড়া ভালই সাড়া পেয়েছি।"

বই কিনতে আসা মাস কমিউনিকেশনের ছাত্রী লোপামুদ্রা দাস রীতিমত উচ্ছ্বসিত বুকটুকের প্রশংসায়। বললেন,"এখানে এসে মাত্র দেড়শো টাকায় আমি নোয়াম চোমস্কির ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট বইটি কিনেছি। এত সস্তায় আর কোথাও পেতাম না। আরও আগে এরকম দোকান কলকাতায় খোলা উচিত ছিল।"

তবে শুধু সস্তায় লোকজনের হাতে বই তুলে দেওয়াই নয় এর একটা পরিবেশ বান্ধব দিকও রয়েছে। অব্যবহৃত বই দ্বিতীয়বার নতুন পাঠক পাওয়ায় সম্ভব হয়েছে বইয়ের রি-সাইক্লিং।

কলকাতায় বুক বাই কনসেপ্টকে স্বাগত জানালেন লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। ইওরস্টোরিকে বললেন, "এখন বইয়ের ছাপার খরচ যেভাবে বেড়েছে,তাতে দুশো টাকার কমে বই দেওয়া সম্ভব নয়। কলেজ স্ট্রিটে খুঁজতে গিয়ে অনেক সময় বহু রেয়ার বই লোকজন পান। এখানে এসে যদি ভালভাবে খুঁজে রেয়ার বই পাওয়া যায় তাতে ক্রেতারই লাভ। খালি দেখতে হবে, দোকানে বইয়ের কালেকশন ঠিকঠাক আছে কিনা।"

সবরকমেরই বইয়ের সম্ভার রয়েছে বুক-টুকে। ছোটদের ড্রইং বুক থেকে, জন গ্রাসাম বা ড্যান ব্রাউনের বেস্ট সেলার। গেট পরীক্ষার গাইড বুক থেকে বিভিন্ন বিষয়ের কফি টেবিল বুক। সবই কিলো দরে সহাবস্থান করছে রমেশ ও সুজাতা তিওয়ারির কালিকাপুরের দোকানে। অপেক্ষা শুধু অগুন্তি বইয়ের ভীড়ে আপনার পছন্দমত বইটিকে খুঁজে নেওয়ার। আপাতত কলকাতার বই প্রেমিকদের নতুন ঠিকানা বাইপাসের ধারে কালিকাপুরের " বুক- টুক "।