শূন্য থেকে রেস্তোরাঁ মালকিন, শিলগুড়ি কন্যার অন্য এক জীবন দর্শন

0

জীবনের যে কটা মোড় হতে পারে, প্রায় সবকটাই বোধহয় ঘুরে আসা হয়ে গিয়েছে পায়েলের। শিক্ষকতা করেছেন, ইনসুরেন্স সংস্থায় কাজ করেছেন বেশ কয়েকটা বছর। পরিস্থিতির চাপে শ্বশুড়বাড়ি ছেড়েছেন, একাকী বড় করছেন একমাত্র পুত্র সন্তানকে। এখন শিলিগুড়িতে রেস্তারাঁর মালকিন। জীবনের কোনও বাঁকেই পিছলে যাননি কখনও সদা হাস্য বছর তেত্রিশের এই শিলিগুড়ি কন্যা। এগিয়ে গিয়েছেন সাহসে ভর করে। নিজের সেরাটা উজার করে দিয়েছেন।সফলও হয়েছেন। প্রতিদিনের লড়াই তাঁকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। জীবনকে তাই তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় মাস্টারমশাই’।

পুরও নাম পায়েল আগরওয়াল। বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান হলেও পা্য়েলদের মারওয়াড়ি পরিবারে তিনি চতুর্থ মেয়ে। জন্মেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মংপুতে। ব্যবসায়ী বাবা তাঁর জন্মের কিছুদিন পর শিলিগুড়ি চলে আসেন পরিবার নিয়ে। সেখানেই পায়েলের পড়াশোনা, বেড়ে ওঠা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুব বেশিদূর এগোয়নি। টুয়েলভ অবধি টেনেটুনে। বাবার আর্থিক অবস্থা তেমন একটা স্বচ্ছল ছিল না। উচ্চমাধ্যমিকের পর মেয়েকে আর পড়াশোনা করাতে চাইলেন না। ১৯ বছর বয়সে বিয়ে হয় পায়েলের।

যে বয়সে বেশিরভাগ মেয়ে পৃথিবীকে চোখ মেলে দেখতে শেখে, ক্যারিয়ারের পেছনে ছোটে, পায়েল তখন অন্য জগতে। জীবনের প্রথম বড় ধাক্কা সামলাতে হয়েছিল সেই সময়। বিয়ের কিছু দিন পরই পায়েল গর্ভবতী হন। শারীরিক কিছু জটিলতায় মা হওয়া হল না সেবার। সন্তান নষ্ট হয়ে যায়। ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছিলেন, আর কখনও মা হতে পারবেন না পায়েল। কিন্তু ইশ্বর বোধহয় অন্যকিছু ভেবে রেখেছিলেন তাঁর জন্য।

প্রথম সন্তান নষ্ট হওয়ার কিছুদিন পর পায়েল ঠিক করলেন প্লে-স্কুল শুরু করবেন। এই উদ্যোগে পাশে পেয়েছিলেন শ্বশুরমশাইকে। ‘আমার শ্বশুরই একমাত্র প্লে-স্কুল খোলার জন্য সবসময় উৎসাহ দিয়ে গিয়েছিলেন। আমি যে কাজটা করতে পারবো, সেই বিশ্বাস রেখেছিলেন’, বলেন পায়েল। ছোট্ট ছোট্ট শিশুগুলির সঙ্গে সারাক্ষণ পড়ে থাকা, তাদের জীবনের প্রথম পাঠ দেওয়ার মধ্যে হঠাৎই সবাইকে অবাক করে দিয়ে দ্বিতীয়বার কনসিভ করেন তিনি।

ছেলের জন্মের পর দায়িত্ব আরও বাড়ল। পায়েল অবশ্য কোনও দায়িত্ব থেকে কখনও পালিয়ে বেড়াননি। তাঁর স্বামীর ভালো চাকরি ছিল না।পরিবারে সেভাবে টাকা দিতে পারতেন না। বাড়ির আর্থিক অবস্থার কথা ভেবে শেষ পর্যন্ত ইনসুরেন্স সংস্থায় কাজ নেন পায়েল, কোনও রকম অভিজ্ঞতা এবং পেশাদার ডিগ্রি ছাড়াই। ধীরে ধীরে কাজ শেখেন এবং এই অভিজ্ঞতা তাঁকে যথেষ্ট শিক্ষা দিয়েছিল। অনেক জায়গায় যেতে হত, ঘোরাঘুরি করতে হত। পাঁচ বছর ইনসুরেন্স সংস্থায় ছিলেন। ওই সময় ছেলেকে দেখাশোনা করতেন শাশুড়ি।

বেশিদিন চলল না এভাবে। পায়েলের জীবনে এবার নতুন বাঁক। হঠাৎ বাবাকে হারান। আর ঠিক সেই সময় তাঁর স্বামীও অন্য মহিলার সঙ্গে নতুন করে ঘর বাঁধেন। বাপের বাড়ি ফিরে আসেন পায়েল। এবার নতুন লড়াই। পরিবারে মা, দুই ছোট ভাই,৭ বছরের সন্তান-সবার দায় নিজের ঘাড়েই তুলে নিলেন। এত ঘোরাঘুরি করতে হত বলে পরিস্থিতির চাপে ইনসুরেন্স সংস্থার কাজটা ছেড়ে দিতে হয়। স্বামীর ঘর ছেড়ে এসেছেন। প্লে-স্কুলটি যেহেতু স্বামীর সম্পত্তি, সেই স্কুলেও তালা পড়ল অচিরে।

কথায় বলে যখন বিপদ আসে, সব রাস্তাই কঠিন মনে হয়। পায়েলও এক অভুতপূর্ব পরিস্থিতির মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার করেন। কোনও প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি না থাকায় কীভাবে কোন কাজ বাছবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। সামনের রাস্তা একেবারে অজানা। শুধু জানতেন গোটা পরিবারের দায়িত্ব তাঁর ঘাড়ে। রোজগারের রাস্তা তাঁকেই খুঁজে বের করতে হবে।

বিপদের দিনে স্বর্গীয় বাবার দেওয়া একসময়ের উৎসাহের কথা মনে পড়ে যায় পায়েলের। ‘ছোটবেলা থেকে রান্নার শো-গুলি আমাকে খুব টানত। এমনকী একসময় বাবা চাইতেন আমি যেন একদিন ক্যাটারিংয়ের ব্যবসা শুরু করি। ভাবলাম, বাবার উপদেশ মানার এটাই উপযুক্ত সময়। মনে মনে খুব নার্ভস ছিলাম। তবুও ইশ্বরের ওপর বিশ্বাস রেখে শিলিগুড়িতে আমার প্রথম রেস্তোরাঁ খুলে ফেললাম’, বলে চলেন পায়েল। কপর্দকশূন্য সেই পায়েল এখন রোমহর্ষ হসপিটালিটি গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর। সংস্থার দুটি রেস্তোরাঁ এবং একটি ব্যাঙ্কোয়েট হল আছে। সবকটাই শিলিগুড়িতে।

মহিলা উদ্যোক্তা হিসেবে যে যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন পায়েল বলতে গিয়ে জানান, যেকোনও কাজে না বলার কোনও জায়গাই তাঁর ছিল না। কারণ সংসারে খাবার জোটানোর দায় ছিল তাঁরই কাঁধে এবং গত ১৫ বছর ধরে সেটাই করে আসছেন। তিনি বলেন, ‘সব কিছু সামলাতে গিয়ে একসময় ভুলে গিয়েছিলাম আমি মহিলা উদ্যোক্তা। পুরুষ শাসিত এই সেক্টরে প্রায় সব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাকে’। ৩৩ বছরের এই উদ্যোগপতি জীবনের এক মন্ত্র কঠোরভাবে মেনে চলেন-জীবন যদি লেবু দেয়, লেমোনেড বানাও। সেটাই করে গিয়েছেন এতদিন। সমালোচকদের ঘৃণা নয়, ধন্যবাদ দেন তিনি। যারা ব্যবসা শুরুর সেই দিনগুলিতে কোনওরকম সহানুভূতি দেখায়নি তাঁকে। একাকী মা হওয়ার একসময় পাড়া প্রতিবেশীর বাঁকা চোখ সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে।‘ছেলের চোখের জল আমাকে আরও কঠোর পরিশ্রমের দিকে ঠেলে দেয়। মায়ের কাজ তাকে গর্বিত করবে একদিন’,বলেন পায়েল।

ভারত হোটেলের কর্নধার (সিএমডি) জ্যোৎস্না সুরি পায়েলের আদর্শ। প্রাণপনে বিশ্বাস করেন একদিন জ্যোৎস্ন সুরির সঙ্গে সামনা সামনি বলে কথা বলার সুযোগ পাবেন। দীপা মল্লিক, পায়েলের আরেক আদর্শ। যিনি তরুণ এই উদ্যোগপতিকে বলেছিলেন, দৌড়ানোর জন্য পা নয়, মনের জোর দরকার। নাইজেলা লসন, জনপ্রিয় কুকারি শোয়ের অ্যাঙ্কর তাঁর আরও এক আদর্শ। ‘যা খুশি দিয়ে দিন, নাগেলা জিভে জল আনা খাবার তৈরি করে দেবেই। আমিও একদিন সেই জায়গায় পৌঁছাতে চাই’, বলেন পায়েল।

একটা কথা ভেবে পায়েল রীতিমতো বিরক্ত হন, যে মহিলারাই নিজেদের অবমূল্যায়ণ করেন, শাসিত হওয়ার জায়গা তৈরি করে দেন। ‘প্রত্যেক পুরুষকে সম্মান দিন, কিন্তু কোনও পুরুষের দ্বারা নিজেকে অসম্মানিত হওয়ার জায়গা দেবেন না’, শেষ করেন শিলিগুড়ির সফল ব্যবসায়ী পায়েল।