আদ্যা ভারতী চান পথশিশুরা হোক সৃজনশীল

0

চ্যালেঞ্জ হোক বা অ্যাডভেঞ্চার। এগিয়ে চলার রসদ খুঁজে পায় অষ্টাদশী। পছন্দ স্ন্যাপচ্যাট। ছুটিতে বিদেশ ভ্রমণ হলে কো সামুইয়ে স্কুবা ডাইভ ভালোবাসে। আর ভালোবাসে শপিং। অদ্যা ভারতীর আরও একটা পছন্দের কাজ আছে। প্রতি বুধবার ঘড়ির কাঁটায় ঠিক ১.৪০ এ লরেটো হাউসের ভাইস—হেডকে আরও কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ আদ্যা তখন স্কুলেরই ছাদে জনা চল্লিশেক পথশিশু নিয়ে ওদের ফিকে হতে থাকা ভবিষ্যতকে রাঙিয়ে দিতে ব্যস্ত।

বাড়িতে ঠাম্মাকে দেখে শেখা। পথশিশুদের পড়াশোনা করায় এমন একটি সংস্থার ট্র্রাস্টি তিনি। সেই সব শিশুদের নিয়ে ছাদের একটি দেওয়াল রঙ করতে গিয়ে কিশোরীর মনে হয়েছিল এই কাজটা তো নিয়মিত করাই যেতে পারে। ভাবনা আর বাস্তবের মধ্যে বেশি সময় নষ্ট করেনি আদ্যা। পথশিশুদের নিয়ে স্কুলেরই ছাদে রং তুলি নিয়ে বসে পড়ে। প্রতি সপ্তাহে একদল বাচ্চাকে নিয়ে ওই দু’ঘণ্টার ক্লাসে দিদিমণি, মানে আদ্যা নিজে যা শেখে তা চার বছরের পেন্টিং ট্রেনিং এবং কয়েক বছরের ফ্লোরাল ইনস্টলেশন ততটা শেখাতে পারেনি। ‘এই বাচ্চাগুলির সঙ্গে কথা বলে জীবনের অন্য মানে খুঁজে পাই আমি। বাচ্চাগুলির একজনকে আমি একবার একটা ঘরের ছবি আঁকতে বলি। সে একটা ঘর এবং তাতে নিজেকে এবং তার মাকে রেখে ছবিটা এঁকে আমাকে এনে দেখায়। আমি তাকে বললাম ঘর আঁকা হয়নি একদম। বাচ্চাটি অবাক হয়ে কী বলল জানেন? একটা ঘর বলতে এটাই সে বোঝে’, মজার মজার সব ঘটনার কথা মনে পড়ে আদ্যার। যখন থেকে আঁকা এবং হস্তশিল্পের ক্লাস শুরু হয়েছে আদ্যা বুঝতে পারে অন্য সবকিছুর চাইতে তার ছাত্রছাত্রীরাই আঁকার প্রতি তার ঝোঁক বাড়িয়ে দিয়েছে। ‘বাচ্চাগুলি আঁকার ক্ষেত্রে কোনও নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা করে না। মন থেকে আঁকে। যা যেখানে যেমনভাবে দেখেছে,যা শিখেছে তাকেই রং তুলিতে রূপ দেয় ক্যানভাসে। আমার ধারনা আমার আঁকার ধরন ওরাই পাল্টে দিয়েছে। আবার ওদেরও আমি বদলে দিতে পেরিছি। ওদের মধ্যে অনুভুতিগুলি আগের থেকে অনেক বেশি সক্রিয় হয়েছে’,এক নাগাড়ে বলে যাচ্ছিল পথ শিশুগুলির প্রিয় ‘দিদি’।

আদ্যার ইচ্ছে আমেরিকায় স্থাপত্য নিয়ে পড়ার। কিন্তু তাতে তো প্রচুর পড়াশোনা এবং ভালো প্রস্তুতি নিতে হবে। পড়াশোনার হাজার ব্যস্ততার ফাঁকেও বুধবারের আঁকার ক্লাসে ছেদ দেওয়া কথা ভাবতেই পারে না লরেটো হাউজের ছাত্রী। ‘একটা রুটিনের অভ্যস্ত হযে পড়লে ব্যালেন্স করা আপনিই শিখে যায় সবাই’, টাইম ম্যানেজমেন্ট নিয়ে বলছিল আদ্যা। লরেটো হাউসের ভাইস প্রিন্সিপল ছাত্রীকে নিয়ে রীতিমতো গর্বিত। বলেন, ‘ও বেশ দায়িত্ববান। পড়া, আর্ট ক্লাস, খেলাধূলা এবং বাকি কাজগুলি কীভাবে সময়ের মধ্যে সেরে ফেলতে হয় ভালোভাবেই জানে আদ্যা। একাই দায়িত্ব নিয়ে স্কুলের ছাদের রেনবো হোমে অভাবী ঘরের বাচ্চাগুলিকে নিয়ে আঁকা এবং হস্তশিল্পের কাজ শেখাতে শুরু করে। শুধু তাই নয়, স্কুলের অন্য মেয়েদেরও এই কাজে যোগ দিতে উৎসাহ যুগিয়ে যাচ্ছে’।

আদ্যার হাফ ইয়ারলি পরীক্ষার জন্য এক মাস আর্ট ক্লাস বন্ধ রাখতে হয়েছিল। বাচ্চাগুলির সেই সময় যেন অস্থির হয়ে উঠছিল কবে ‘দিদি’ আবার ক্লাস শুরু করবে। কয়েকজন তো আদ্যার কাছে গিয়ে প্রশ্নও করে ফেলে। জানতে চায় তাদের মজার রং তুলির ক্লাস বন্ধ কেন। ক্লাস না হোক মাঝে মাঝে ‘দিদি’ দেখা করলেও তো পারে, শুনে তৃপ্তি পায় আদ্যা। ‘ওরা ঘন ঘন জানতে চায় করে পরের ক্লাস করতে আসবে, কেন এতগুলি দিন ক্লাস করাচ্ছি না —এমন নানা প্রশ্ন করতে থাকে। একজন তো আবার স্কুলে এসে অপেক্ষা করে বসেই ছিল কখন আমার পরীক্ষা শেষ হবে, তারপর দেখা করে বাড়ি গেল। তার আগে মুখ কালো করে বলে গিয়েছিল, আমার ক্লাস মিস করছে সে’, বলতে গিয়ে খুশির ঝিলিক আদ্যার চোখে, প্রাপ্তির পরম তৃপ্তি চোখে মুখে। এনজিও ‘ভাসা’র হয়েও বাচ্চাদের পড়ায় লরেটো হাউজের এই ছাত্রী। আদ্যার আঁকা ছবি নিয়ে ICCR এ প্রদর্শনী। সেই প্রদর্শনীতে তার খুদে ছাত্রছাত্রীদের আঁকা ছবিও স্থান পাচ্ছে।