গোপীচাঁদের ছাত্রী বাংলার শ্রেয়ার স্বপ্ন অলিম্পিক

1

ছোটবেলায় খালি ভুগত মেয়েটা। ওকে ফিট রাখতে ব্যাডমিন্টন খেলানো শুরু করিয়েছিলেন বাবা। সেদিন কেউ কি ভেবেছিল এই মেয়েই একদিন দেশের সম্পদ হয়ে উঠবে। বুঝেছিলেন একজন। পার্ক সার্কাস ব্যায়াম সমিতির কোচ তাপস বিশ্বাস। বাবাকে ডেকে বলেছিলেন এই মেয়ে অনেক দূর যাবে। জুহুরি চোখ ভুল বলেনি। মাত্র ১৩ বছর বয়েসেই রাজ্যে তো বটেই জাতীয় পর্যায়েও বহু পুরস্কার ঝুলিতে পুরে ফেলেছে শ্রেয়া তিওয়ারি। এখন থেকেই অলিম্পিকসের স্বপ্ন দেখছে শ্রেয়া।

৭ বছর বয়সে বাবার হাত ধরে পার্ক সার্কাস ব্যায়াম সমিতিতে গিয়েছিল শ্রেয়া। বাবা চেয়েছিলেন প্রায়শই রোগে ভোগা মেয়েটিকে কোনও খেলায় দিলে শরীর স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। ব্যাডমিন্টনে ট্রেনিং শুরু করার কয়েকদিনের মধ্যে শ্রেয়ার বাবা সঞ্জয় তিওয়ারিকে ডেকে পাঠান কোচ। পার্ক সার্কাস ব্যায়াম সমিতির কোচ তাপস বিশ্বাস। সেদিন একটা অস্পষ্ট অথচ নিশ্চিত স্বপ্ন দেখছিলেন। সঞ্জয়বাবুকে বলেন ‘মেয়ের কোচিং চালিয়ে যান। ওর মধ্যে রসদ আছে। ঠিক মতো প্র্যাকটিস করলে দেখে নেবেন একদিন ভারতের হয়ে খেলবে এই মেয়ে।’ শ্রেয়াও কিছুদিনের মধ্যে খেলাটা ভালোবেসে ফেলল, শ্রেয়ার বাবা সঞ্জয়বাবু ইন্দিরা অ্যাকাডেমির প্রিন্সিপাল। বলছিলেন রায়গঞ্জে সদ্য অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব পনেরোর রাজ্য ব্যাডমিন্টন চ্যাঅম্পিয়নশিপ জিতে এসেছে শ্রেয়া। মেয়ের উৎসাহ দেখে চেষ্টার খামতি রাখেননি বাবা। সেরা কোচিং দিতে নিয়ে গিয়েছেন ব্যাডমিন্টনের দ্রোণাচার্য পুল্লেলা গোপীচাঁদের কাছে। গত দেড় বছর ধরে সে গোপীচাঁদের একাডেমির মনোযোগী ছাত্রী।

দেশের অন্যতম ব্যাডমিন্টন তারকা শ্রীকান্ত কিদম্বীর ফ্যান। ২০১২ সাল থেকে জেলা পর্যায়ে টুর্নামেন্ট খেলা শুরু করে। কয়েক বছর জেলা পর্যায়ে টুর্নামেন্ট খেলার পর রাজ্যে এবং জাতীয় পর্যায়ে সুযোগ পায়। শ্রেয়া খুব মনোযোগী ছাত্রী। খেলাটাকে বড্ড ভালোবাসে। খুব দ্রুত শিখে নেওয়ার গুণ আছে। তাই মাত্র কিছু দিনের ট্রেনিংয়েই জেলা পর্যায়ে টুর্নামেন্টে নেমে যেতে পেরেছিল। মাত্র ৯ বছর বয়সে স্টেট লেভেল টুর্নামেন্ট জিততে শুরু করে। এমন নজির দেশে খুব বেশি নেই, এসব বলতে খুব গর্ব বোধ করেন ওর প্রথম কোচ তাপসবাবু।

২০১৫ সালে এক বছরে জাতীয় পর্যায়ে অনূর্ধ্ব ১৩র চার চারটে টুর্নামেন্ট জিতে নজরে আসে বাংলার এই মেধাবী কন্যা। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৬-র জানুয়ারিতে অনূর্ধ্ব তেরো পর্যায়ে দেশের মধ্যে তাঁর ব়্যাঙ্কিং ছিল ১৭। এরপর থেকে যা ঘটে চলেছে তা শ্রেয়ারও ধারণার বাইরে। নিজেকে এই জায়গায় নিয়ে আসতে পারবে এতটা স্বপ্নেও ভাবেনি ছোট্ট মেয়েটা। যখন থেকে খেলা শুরু করে গোপী স্যারকেই নিজের আইডল মেনে এসেছে। যখনই টিভিতে দেখতো ভাবতো যদি কখনও সামনে যেতে পারে। কখনও যদি ওনার অ্যাকাডেমিতে কোচিং করতে পারে ধন্য হয়ে যাবে। ভাবতেই পারেনি টিভির পর্দায়, খবরের কাগজে দেখা ওই বিখ্যাত লোকটার নজরে আসবে কোনওদিন। গোপী স্যারের অ্যাকাডেমি থেকে যেদিন ফোনটা আসে বিশ্বাসই হয়নি। প্রায় কেঁদে ফেলেছিলো মেয়েটা। এখনও সেকথা মনে করলে খুশিতে চনমন করতে থাকে এই কিশোরী।

গোপীচাঁদের ফোন পেয়ে একমুহূর্ত কালক্ষেপ করেননি বাবা সঞ্জয় তিওয়ারি। মেয়েকে নিয়ে বেঙ্গালুরু ছুটেছেন। পুল্লেলা গোপীচাঁদ অ্যাকাডেমিতে অনূর্ধ্ব ১৩-র বাছাইয়ে নির্বাচিত হয় এই কলকাতার মেয়ে। ‘বাছাই পর্বের জন্য ছিল ৬০০ জন। সারা দেশের মধ্যে মাত্র ৬ জনকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। বাংলা থেকে একমাত্র শ্রেয়া এই সুযোগ পায়’, বলছিলেন সঞ্জয়বাবু। গোপীচাঁদ অ্যাকাডেমিতে নিয়মিত অনুশীলনে আরও উন্নতি করেছে শ্রেয়া। টেকনিক থেকে ফিটনেস সবেতেই গোপী স্যারের কড়া নজর। ইতিমধ্যে গোপীচাঁদের ফেভারিটও হয়ে উঠেছে শ্রেয়া বলছিলেন গর্বিত বাবা। ‘স্যার সবসময় বলে চলেছেন কী করতে হয়। আমাকে ওঁর মেয়ে গায়েত্রীর মতো তৈরি করবেন বলে উৎসাহ দিতে থাকেন’, ঘোরের মধ্যে বলে চলে শ্রেয়াও। ‘শ্রেয়া পারবে গোপীচাঁদের আশা মেটাতে। আগাগোড়া পেশাদার খেলোয়াড়। শুধু একটু ফিটনেসের দিকে নজর দিতে হবে, ইনজুরিতে খুব ভোগে মেয়েটা’, একটু চিন্তিত শোনায় কোচ তাপস বিশ্বাসের গলা।

যত কড়াই হোন গোপীচাঁদের পাঠশালা দারুণ পছন্দ বাংলার বাঁহাতি এই খেলোয়াড়ের। কিন্তু হস্টেল একদম পছন্দ নয়। বাড়ির জন্য মন খারাপ করে। বাড়িকে, মাকে খুব মিস করে এক রত্তি মেয়েটা। কলকাতায় এলে মোটেও ছুটি নয়। পার্ক সার্কাস অ্যাকাডেমিতেই ট্রেনিং চলে। কারণ অলিম্পিকের ভিকট্রি স্ট্যান্ডে গলায় সোনার মেডেল আর নেপথ্যে গায়ে কাঁটা দেওয়া জনগণমন শোনার দারুণ লোভ হয় মেয়েটার।