সল্টলেক QMS স্কুলের TEDX দিল প্রেরণার বার্তা

8

কলকাতায় খুব একটা টেড টক আয়োজিত হয় না। হলেও কখনও কোনও স্কুলে হয়েছে বলে খুব একটা মনে পড়ছে না। খুব সম্প্রতি কলকাতার আওয়ার লেডি কুইন অব দ্য মিশন স্কুলে হয়ে গেল টেড টক। স্কুল কর্তৃপক্ষের অসীম উৎসাহ তো ছিলই পাশাপাশি ছিল ছাত্রীদের একটি টিমের বিপুল আগ্রহ। প্ৰথম হল টেড টক। হয়ত ভাবছেন এতে আর এমন কী! কিন্তু কলকাতায় যেখানে আর পাঁচটা স্কুল পড়াশুনোর বাইরে কখনও কোনও জানলা দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের উঁকি মারতেই শেখায় না সেখানে এই স্কুলের এই উদ্যোগ কলকাতার শিক্ষার অঙ্গনে নতুন বাতাস এনে দিল।

স্পিকার হিসেবে এসেছিলেন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী অলকানন্দা রায়। যারা প্রথম থেকে ইওরস্টোরি বাংলার কাহিনিগুলি পড়ে আসছেন তাঁদের কাছে অলকানন্দা নতুন নাম নয়। কিন্তু বারংবার উচ্চারণ করার মত কাজই করেন অলকানন্দা। কারাগারের অন্দরমহলে তাঁর অবাধ যাতায়াত। সাজাপ্রাপ্ত মানুষের অন্দর মহলটাও এতদিনে ভীষণ ভালো জানেন এই নৃত্যশিল্পী। টেড-টকের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি নিজেই বলছিলেন কিভাবে তিনিও বদলে গিয়েছেন।

সমাজ চিরকালই তাঁর আগ্রহের একটি বিষয়। একজন সাধারণ শিল্পী থেকে পথবাসী এক শিশুর সঙ্গে কথা বলতে গিয়েই উপলব্ধি করেন পথবাসী শিশুর ক্রাইসিস। কিভাবে ওরা বদলে যায়। ফুটপাথই ওদের চিনিয়ে দেয় ওদের ঠিকানা। ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই করতে করতে কখনও কোনওদিন একটা খাবার দোকানের কাচের দরজা ভেঙে ফেলেছিল ও। তাই ওই শিশুটিকে হাজত থেকে ঘুরে আসতে হয়। তারপর গোটা ফুটপাথ ওর গায়ে অদৃশ্য একটা আঠা দিয়ে সেঁটে দিয়েছে চোরের বদনাম। তারপর থেকে ওই দশ বছরের শিশুটিও জানে তার পরিচয় কোট আনকোট চোর।

বাকিটা সমাজই শিখিয়ে দিয়েছে চোর হওয়া মানে কী। কীভাবে দুনিয়াটাকে একজন চোর হিসেবে দেখতে হয়, কীভাবে চোরদের ইকোসিস্টেমে টিকে থাকতে হয়, কী হওয়া উচিত ড্রেস কোড, কেমন হবে ভাষা, সব সব শিখিয়ে দিয়েছে তার চারপাশের সমাজ। এগারো বছরে সে পাক্কা ঘাগু আর বিন্দাস চোর। এই শিশুটিকে দেখে গভীর মমতা উপলব্ধি করেন অলকানন্দা। ধীরে ধীরে ঢুঁ মারেন ওদের অন্দর মহলে। দেখেন অপরাধী মানুষের ভিতরও মানুষ আছে। যে বা যারা আকাশে মাথা তুলতে চায়। স্বাধীনভাবে বাঁচতে চায় আর নিজেদের ভিতরের সৌন্দর্যকে মেলে ধরতে চায় অনাবিল আনন্দের মাঝখানে। অন্তত এভাবেই বন্দি মানুষের মন পড়েছেন অলকানন্দা। বললেন তাঁর অভিজ্ঞতার কাহিনি। বন্দিদের নাচ শিখিয়েছেন অলকানন্দা। নাচের ভাষায় সারিয়ে তুলেছেন শতাধিক হৃদয়। মানুষকে মানুষের মর্যাদাই দিতে চেয়েছেন অলকানন্দা। মন্ত্রমুগ্ধের মত তাঁর অভিজ্ঞতার কথা শুনলো আওয়ার লেডি কুইন অব দ্য মিশন স্কুল। শুনলো নাট্য ব্যক্তিত্ব নিবেদিতা ভট্টাচার্যের নীরবতার মুখর সংলাপ। অভিনয় যখন জীবনকে সুন্দর করে তোলে শিল্পিত করে তোলে তখনই নাট্য শাস্ত্র সাফল্য পায়। নিবেদিতার ভাষণে উঠে এলো নাট্যশাস্ত্রের প্রায়োগিক দিক। জয় পানসারিকেও আপনারা চেনেন। যারা ইওরস্টোরি বাংলা পড়ছেন তাদের কাছে জয় ও নতুন নাম নন। তরুণ এই উদ্যোগপতি পৃথিবীটাকে সুন্দর দেখতে চান। তাই আবর্জনা সাফাইয়ের যে উদ্যোগ কেন্দ্রীয় সরকার নিয়েছে সেই উদ্যোগকেই আরও উন্নত এবং আরও প্রযুক্তি নির্ভর করে তুলতে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন জয়। গ্রিন বিন বিলি করছেন শহরের বিভিন্ন জায়গায়। গত একটি বছরে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বিভিন্ন বাজারে তাঁরা লাগিয়েছেন তাঁদের অ্যাড মাই বিন। সাড়াও পেয়েছেন ভালোই। শোনালেন তাঁর যাত্রার কাহিনি। ছিলেন বিবি আই ফাউন্ডেশনের ডক্টর সাগর ভার্গব এবং মোটিভেশনাল স্পিকার অরুণাভ ভট্টাচার্য।

গোটা অনুষ্ঠানের আরও একটা অভিনবত্ব ছিল, সেটা হল সব স্পিকারের হাতেই তুলে দেওয়া হয়েছিল একটা ছোট্ট টব। টবে ছোট্ট একটা চারা গাছ। সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন নিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ যেন এই ছোট্ট চারাগাছ। নিয়মিত এরকমই টক শোর মারফত সেই চারাগাছ একদিন মহীরুহ হবে। তাই ধন্যবাদ আওয়ার লেডি কুইন অব দ্য মিশন স্কুল।