মা বাড়ি বাড়ি কাজ করেন, ছেলে বাংলার হয়ে গোল ধরেন

2

ভাঙা টালির ছাদ, দরমা আর মাটি লেপা দেওয়াল, তাতে অসংখ্য ফুটো, ছোট্ট একফালি কামরা। ভেতরের অনেকটা জায়গা নিয়ে নিয়েছে বড় বড় ট্রফিগুলো। ভাঙা ঘরে ওইগুলোইতো স্বপ্ন জিইয়ে রাখে। ছোটবেলা থেকে এমন অভাব—অনটনকে সঙ্গী করেই বেড়ে ওঠা বাংলা দলের গোলকিপার শঙ্কর রায়ের। বাবা সেই কবে গত হয়েছেন। সংসার চালাতে লোকের বাড়ি কাজ করতে হয় মা-কে। ক্লান্ত হন, সংসার চালানোর রসদ জোগাড়ে দিন কেটে যায়। এমন অনটনে ছেলের নির্ভরযোগ্য হাত দুটি সাহস যোগায়। মায়ের মনে বিশ্বাস, একদিন লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে অন্ধের যষ্টি ওই ছেলে।

তিনকাঠির সামনে চিনের প্রাচীর যেন। দস্তানায় মোড়া হাত আর স্বচ্ছ দুটি চোখ। গোলার মতো আসতে থাকা এক একটা পাস, অতর্কিত আক্রমণ সব ধাক্কা খায় ওই শঙ্কর রায় নামের কঠিন প্রাচীরে। এবারের সন্তোষ জয়ী বাংলা দলের অন্যতম কারিগর। নির্ভরযোগ্য গোলকিপার। ময়দানের এই রাজার ভাঙা ঘরে সঙ্গী অনটন। তবু ছেলের স্বপ্নে আঁচ লাগতে দেননি মা।

এহেন শঙ্করের হাত ধরে এবার সন্তোষ ট্রফিতে বাংলা চ্যাম্পিয়ন। বাংলাকে চ্যাম্পিয়ন করে ঘরে ফেরার পর মা—কে আর লোকের বাড়ি কাজ করতে দেয় না শঙ্কর। চারিদিক থেকে আসছে সংবর্ধনা আর কাগজে কাগজে ছবি। সেই ছবির কোনও কোনওটা আবার এই বেড়ার দেওয়ালে ফ্রেমে বাঁধাই করে রেখেছে বছর বাইশের এই গোলকিপার। অভাব—অনটন নিত্য সঙ্গী ছিল সেই ছোটবেলা থেকেই।

বাংলা চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফেরার পর আইএফএ সচিব উৎপল গঙ্গোপাধ্যায় শংকরের এমন অভাবের কথা জানতে পেরে তাকে একটি চাকরি দিয়েছিলেন নিজের অফিসে। যার বেতন ছিল ২০০০০ টাকা প্রতিমাসে। এমন পরিবেশ থেকে অভাবের সঙ্গে লড়াই করার জন্য এই টাকাটা অনেকটাই ছিল শঙ্করদের মতো পরিবারের কাছে। কিন্তু অনুশীলন থেকে ফিরে অফিসের কাজ করে ফের অনুশীলনে নামা সম্ভব হচ্ছিল না তার পক্ষে। চোখে যে এখনও বড় দলের জার্সি গায়ে চাপানোর আদম্য ইচ্ছা। গায়ে তুলতে চান জাতীয় দলের জার্সি। গত বছর তার হাতেই কলকাতা লিগে পিয়ারলেসের কাছে আটকে গিয়েছিল মোহনবাগান, মহামেডানের মত দলকে। ম্যান অবদ্যা ম্যাচেরও পুরস্কার পেয়েছিল। সেই জেদটাই যে বড় হয়ে দাঁড়াল আরও একবার। সিদ্ধান্ত নিলেন পেশাদার ফুটবলের জন্য এই চাকরি ছেড়ে দেবেন। ‘ খেলার জন্য সবকিছু আমার। খেলার জন্য লোকে চিনেছে। খেলার জন্যই চাকরি। তাই খেলাই আগে’, অক্লেশে বলে গেলেন শঙ্কর।

মা বীণা রায় সবসময় ছেলের পাশে ছিলেন। ছেলেকে নিয়েই তাঁর যত স্বপ্ন। অভাবের সংসারে তাই শঙ্করের চাকরি পেয়েও ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছেয় মানসিক ভরসা যুগিয়েছেন। ‘খেলাই ওর স্বপ্ন। মা হয়ে সেই স্বপ্ন তো ভেঙে দিতে পারি না। ছেলে বলল চাকরি আর খেলা একসঙ্গে চালানো সম্ভব নয়। নিজেরা বোঝাপড়া করলাম অনেক। ভাবলাম ঠিকই তো বলছে শঙ্কর। এতদিন কষ্ট যখন করেছি, না হয় আরও কটা বছর কষ্টই হল। ছেলাটা যেখানে পৌঁছাতে চায়, যতদূর যেতে চায় যাক’, চোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে বলেন বীণাদেবী।

অভাবের জন্য ক্লাস এইটের বেশী পড়া হয়নি বছর বাইশের শঙ্করের। আজ যত মানুষের ভালোবাসা, পরিচিতি সবই এসেছে ফুটবলের জন্য। তাই ফুটবলকে আঁকড়ে ধরে সব কিছু ছাড়তে পারেন এই বঙ্গ তনয়। এমন লড়াইয়ে শঙ্করে পাশে ওর প্রতিবেশীরাও। সন্তোষ ট্রফির মত এমন কোনও বড় টুর্নামেন্টে নামা এই প্রথমবার। আর প্রথমবারই চ্যাম্পিয়ান, সঙ্গে সার্চ লাইটের তলায় চলে আসা। এখন শঙ্করের লক্ষ্য আইএসএল আর জাতীয় দলে খেলা। সেই লক্ষ্যেই নিবিড় অনুশীলন হতদরিদ্র ঘরের এই সন্তানের। 

(সৌজন্যে: বাংলা টাইমস)