প্রফুল্ল ঘোষের নাতির মেয়ে জাপানের সেরা সুন্দরী

1

বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষের সঙ্গে জাপানের কী সম্পর্ক বলতে পারেন? দাদাগিরির মতো কুইজে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হলে খবরদার পড়ে ফেলা ইতিহাস বইয়ের পাতাগুলি নতুন করে মনে করার চেষ্টা করবেন না। কারণ,লাভ হবে না। মাথা খুঁটেও বইয়ে পাওয়া যাবে না ওই তথ্য। যা ঘটেছে সবটাই সাম্প্রতিক! জাপানের সঙ্গে প্রফুল্ল চন্দ্রের সম্পর্ক তৈরি করে দেওয়ার মতো কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছেন তারই প্রপৌত্রী ২২ বছরের প্রিয়াঙ্কা য়োশিকাওয়া ঘোষ। কারণ তিনিই যে দ্বিতীয় সংকর সুন্দরী হিসেবে ২০১৬-র মিস জাপান ওয়ার্ল্ড খেতাব জিতে ফেলেছেন!

প্রিয়াঙ্কার ব্যবসায়ী বাবা ভারতীয়। মা জাপানি, যোগা প্রশিক্ষক। পদবিতে ঘোষ থাকায় জাপানে তিনি ‘হাফু’ অর্থাৎ সংকর। স্কুলে পড়ার সময় শৈশবে বহু বিদ্রুপ সইতে হয়েছে। যখন ফাইভে পড়তেন ক্লাসে ও একাই ছিলেন হাফু। ভাবতেন বাকি বন্ধুদের মতো ও বোধহয় স্বাভাবিক নয়, নিজের পরিচয় নিয়ে লড়াইয়ের কথা বলছিলেন প্রিয়াঙ্কা। বড় হতে হতে ঠিক করলেন আর নয়। ভারতীয় বংশোদ্ভুত হিসেবে নিজেকে গর্বিত ভাবতে শুরু করলেন। ‘দুর্বল হয়ে যদি মুখ লুকোতে থাকেন তাহলে সবাই পেয়ে বসবে, ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্র নিজেই ঠিক করে নেন। জাপানি ভাষাই প্রিয়াঙ্কার মাতৃভাষা। তবু বাবার দৌলতে বাংলা বেশ ভালোই বলেন। ইংরেজিতেও সাবলীল। হিন্দি শেখা সবে শুরু করেছেন। প্রিয়াঙ্কা জানান, ‘প্রফুল্ল ঘোষের ভাইপোর ছেলে আমার বাবা অরুণ ঘোষ। পড়তে গিয়েছিলেন জাপানে। মা নাওকোর সঙ্গে সেখানেই আলাপ, প্রেম এবং বিয়ে। জাপানি হলেও নিজেকে বাঙালি বলতে ভালোবাসি। আমার তখন ৯ বছর বয়েস। সেই সময় এক বছর কলকাতায় কাটিয়ে গিয়েছি, কলকাতার স্কুলে বাংলা পড়েছি। বাবা আর চারপাশের আত্মীয়রা এত বাংলা বলেন তাই আমারও বাংলা বলতে বা বুঝতে কোনও অসুবিধা হয় না। আরও মজার কথা শুনুন, আমার মা জাপানে বাংলা শেখাতেন’, হেসে গড়িয়ে পড়েন সুন্দরী। কিন্তু সবটা এত সহজ ছিল না প্রিয়াঙ্কার জন্যে। মিশ্র রক্তের জন্য টিটকিরি শুনতে হয়েছে। সমস্যায় পড়েছেন। এমনকি জাপানি সুন্দরী ঘোষণা নিয়েও কম জল ঘোলা হয়নি। যে দেশে বছরে মাত্র ২ শতাংশ সংকর শিশু জন্মায় সেখানে সংকর কোনও কন্যার মাথায় সুন্দরীর তাজ উঠবে সে দেশের অনেকে তা মেনে নিতেই চাননি। ‘শরীরের যে বাংলার রক্ত বইছে তার জন্য গর্বিত। তার মানে এই নয় যে আমি জাপানি নই। যারা আমাকে জয়ী করেছেন তাঁদের ধন্যবাদ। তবে জাতি বিদ্বেষের বিরুদ্ধে আমার লড়াই জারি থাকবে’, দৃপ্ত ঘোষণা সুন্দরীর। ‘আমরা যখন জাপানে ফিরে আসি সবাই কেমন যেন জীবাণু ভাবতো আমাদের, ছুঁয়ে ফেলে ভাবত খারাপ কিছু ছুঁয়েছে। সেই সময় যা ভোগান্তি হয়েছিল সেটাই আমার মনকে শক্ত করেছে। মিস জাপান হয়ে এখানকার মানুষের সেই ধারনা হয়ত বদলে দিতে পারব। কারণ এখানে সংকরের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ফলে তাদের অধিকারও মেনে নিতেই হবে’, বলে চলেন প্রিয়াঙ্কা।

১৭ বছর বয়েসে মডেলিংয়ে কেরিয়ার শুরু করেন জাপানি—এই সুন্দরী। সম্প্রতি হাতি সংরক্ষণ নিয়ে কর্মশালায় যোগ দিতে গুয়াহাটি এসেছিলেন। সৌন্দর্য চর্চার পাশাপাশি জংলি হাতি ধরা ও বশ মানানোয় বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন হাফ বাঙালি কন্যা। হাতি সংরক্ষণের বার্তা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চান তিনি। ‘ছোট বেলায় বাবার কাছে বায়না ধরেছিলাম হাতি পুষব বলে। তখন চার পাঁচ বছর বয়েস হবে। বাবা বলেছিলেন, হাতি প্রচুর খায় আর অনেক বড় হয়। সব খাবার যদি ও খেয়ে নেয় আর গোটা বাড়িটাই দখল করে থাকে তবে আমরা কোথায় যাব? কী ই বা খাব? এইসব বলে নিরস্ত করেছিলেন’, মনে করে হাসেন প্রিয়াঙ্কা। সুন্দরী কিক-বক্সিংয়েও হাত পাকিছেন ভালোই। তাছাড়া ফ্রিল্যান্স অনুবাদক হিসেবে কাজ করেছেন। ডাক্তারদের ইংরেজি পড়ানোর কাজও করেছেন বিভিন্ন সময়।

পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রীর বংশের পরিচয় সেভাবে তাঁকে প্রভাবিত করে না। ‘উনি আমার বাবার দাদু, আমার বড় দাদু। ওনার সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানিন না। তবে আমাদের পরিবার ওঁকে নিয়ে গর্বিত। বাবা প্রায় চার দশক আগে জাপানে গিয়েছিলেন। আমাদের পরিবার রাজনীতি থেকে বহু দূরে, জানালেন মিস জাপান ওয়ার্ল্ড। ছোটবেলার এক করুণ স্মৃতি এখনও তাড়িয়ে বেড়ায় প্রিয়াঙ্কাকে। ‘আমরা তখন প্রায়ই দক্ষিণেশ্বর যেতাম। ওখানে অনেক ভিখিরি ভিক্ষা করতেন। একবার আমার বয়েসী এক শিশু ভিক্ষের জন্য আমাদেরই গাড়ির পেছনে অনেকটা ছুটে এসেছিল। আমি জাপানে কখনও এই ছবি দেখিনি। ওই ঘটনা নাড়া দিয়ে গিয়েছিল মনে’, বলতে বলতে মন খারাপ হয়ে যায় প্রিয়াঙ্কার। কিন্তু ওই ঘটনাই সমাজসেবায় টেনে আনে সুন্দরীকে। বাবার শহর কলকাতায় গরিব শিশুদের আশ্রয়ের জন্য হোম খুলতে চান প্রিয়ঙ্কা।

হিন্দি সিনেমা খুব দেখেন শাহরুখের বিরাট ফ্যান। ঐশ্বরিয়া রাইকে মিস ওয়ার্ল্ড হতেও দেখেছিলেন। সুস্মিতা সেনের মিস ইউনিভার্স হওয়ার দৃশ্যটাও বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেছেন। এগুলোই তার অনুপ্রেরণা। ফলে অভিনয়ে পা রাখার ইচ্ছে আছে। ভারতে ছবির ডাক পেলে কী করবেন? সপাটে ব্যাট চালিয়ে সুন্দরীর উত্তর, ‘প্রস্তাব এলে এক লাফে লুফে নেব’।

Related Stories