বাপের বেটি দেখিয়ে দিলেন জেতাটা বাঁ হাতের খেলা

0

বাবার দেওয়া আশীর্বাদী পিস্তলটাই আঁকরে ধরলেন মেয়েটি। তারপর শুরু হল আরও বেশি বেশি করে অনুশীলন। কম করে আট থেকে ১০ ঘণ্টা অনুশীলন করতে শুরু করলেন। এক এক করে আরও ফসল ফলতে শুরু করল। ন্যাশনাল গেমসে রূপো এলো। জাতীয় স্তরে পরিচিতি পেলেন। আর সব থেকে আনন্দের মুহূর্তটা ব্যাঙ্ককে সম্প্রতি প্যারা শুটিং বিশ্বকাপের আসরে স্বর্ণ পদক জিতে নিলেন সোনিয়া। বাবার মুখটা বারবার ভেসে উঠছিল। সাফল্যের করতালি আর উল্লাসের ভিতর প্রয়াত বাবার কথাই বারবার মনে পড়ছিল ওঁর।

না বলিউডের কোনও সিনেমার চিত্রনাট্য নয়। সোনিয়ার ওটা বাঁ হাতের খেল। দারিদ্র আর কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে মোকাবিলা করাটা ওর অনেক দিনের অভ্যাস। বাবা সেচ দফতরে কাজ করতেন। অল্প বেতন। বড় সংসার। তার ওপর গোটা পরিবারের একমাত্র রোজগেরে মানুষ ঠাকুরদাস শর্মা। দুই বোনের পর তৃতীয় সন্তান সোনিয়া যখন জন্মান তখন থেকেই ডান হাতটা ওর অকেজো। সচরাচর ভারতীয় সমাজে মেয়েরা অতি অযত্নে বড় হয়। তারওপর পর পর দুই মেয়ের পর তৃতীয় কন্যাসন্তান। এবং বিকলাঙ্গ। অবহেলার পারদ চরেছিল এই আগ্রার শর্মা পরিবারেও। কিন্তু বাবা ঠাকুরদাস চেয়েছিলেন মেয়েরা মাথা তুলে বাঁচুক। লেখায় পড়ায় জীবনের দৌড়ে কোথাও পিছিয়ে যেন না পড়ে তাঁর চার্লিস অ্যাঞ্জেলস। তাই সম্ভাব্য সেরা স্কুলে ভর্তি করেছিলেন। সাহস করে বাঁচার স্পর্ধাটা চিরকালই বাবাই দিয়ে এসেছেন মেয়েদের। একবার কি হল, সোনিয়াদের স্কুলে এয়ার গান শুটিঙয়ের ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছিল। ব্যাপারটায় মজাই পেয়েছিলেন সোনিয়া। বিশাল চাঁদমারি। সার দিয়ে রাখা আছে নিশানার চাকতি। মেয়েরা বন্দুক হাতে তাক করছে। সোনিয়ার মনে হয় বাঁহাতে ও পেরে যাবেন খেলাটা। হলও তাই। নির্ভুল নিশানা। বাবাকে বলতে বাবাও অনেক প্রেরণা দিলেন। যদিও জানতেন এই ধরণের খেলার পিছনে অনেক খরচ লুকিয়ে থাকে। যেমন একটা নিদেন পিস্তল কিনতেই বেরিয়ে যাবে অনেক টাকা। অত টাকা জোগাড় করাই দুষ্কর। তবু মেয়েকে ধনীর মত করে উৎসাহ দিলেন। বললেন, এগিয়ে যাও কুচ পরোয়া নেই। যা লাগবে করা যাবে।

জীবনে দাঁড়ানোর দিশা খুঁজে পেলেন মেয়েটি। শুরু হল প্রশিক্ষণ। অন্য সহযোগীদের বন্দুক ধার করে নিশানা-বাজি চলতে থাকল। কলেজ লেভেল, ডিসট্রিক্ট, স্টেট লেভেল অতিক্রম করে গেলেন অনায়াসে। ঠাকুরদাস খুব করে চেয়েছিলেন মেয়েকে একটা এয়ার গান কিনে দেবেন। অসুস্থ লোকটা মুখে রক্ত তুলে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যা আয় করতেন তা থেকেই একটু একটু করে জমাচ্ছিলেন একটা পিস্তল কেনার জন্য। এমন পিস্তল যার দাম দেড় লাখ টাকা। অত টাকা জোগাড় করতেই হিমসিম খেয়ে গেলেন। ত্রিসীমানায় কোনও সরকার কোনও শুভানুধ্যায়ীর দেখা পেলেন না। অসুস্থ ছিলেন আরও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এভাবেই একদিন চোখ বুজলেন ঠাকুরদাস। বন্দুক কেনা হল না। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী জানকদেবী মেয়ের জন্যে জমিয়ে রাখা টাকা দিয়ে একটা পিস্তল কিনে দিলেন।

১০ মিটার এয়ার পিস্তল ইভেন্টে টিম ক্যাটাগরিতে এই জয় বিশ্বমঞ্চে ভারতের মুখ উজ্জ্বল করেছে। তাঁর টিমের ফাইনাল স্কোর ছিল ১০৭০ পয়েন্ট। প্রতিদ্বন্দ্বী টিমের চেয়ে ২২ পয়েন্ট বেশি পেয়ে শীর্ষ স্থান ছিনিয়ে নেয় সোনিয়ার টিম। চার রাউন্ডে সোনিয়ার নিজের সংগ্রহ ছিল ৩৫৭ পয়েন্ট। টিম-মেট দিল্লির মেয়ে অভিজ্ঞ পূজা আগরওয়ালের স্কোর ৩৫৮ এবং ভোপালের প্রতিযোগী রুবিনা ফ্রেঞ্চিসের স্কোর ৩৫৫। ঘরের মাঠে থাইল্যান্ডকে হারানো বেশ কঠিন ছিল। সেই কাজটাই করেছেন ভারতীয় তিন কন্যা। থাইল্যান্ড ও সাউথ কোরিয়া প্রতিযোগিতায় যথাক্রমে রানার্স আপ এবং তৃতীয়। আর এই জয়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় ক্রীড়ার ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা হয়ে গেল আরেকটি অধ্যায়। প্যারা শুটিং।

ব্যক্তিগত ক্যাটাগরিতে এই মুহূর্তে সোনিয়ার ব়্যাঙ্কিং অষ্টম। উত্তরপ্রদেশ থেকে তিনিই একমাত্র শুটার যিনি নিজের ইভেন্টে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপে অংশ নিলেন। পরিবার পাশে না থকলে ওর এই সাফল্য সম্ভব ছিল না। বিশেষ করে ভগ্নীপতি মানিক শর্মার কথা বার বার বলছিলেন সোনিয়া। বাবার স্বপ্ন পূরণের জন্যে ভগ্নীপতির অবদান অনেক। এই সাফল্যের সূত্র ধরে টনক নড়েছে স্থানীয় প্রশাসনের। সম্বর্ধনার হিড়িক উঠেছে। গর্বে এলাকার মানুষের এখন অন্য চেহারা। নেতা-মন্ত্রী-মিডিয়া এখন ভিড় জমিয়েছে সোনিয়াদের বাড়ির উঠোনে। একের পর এক প্রতিশ্রুতির বন্যা বয়ে যাচ্ছে। আর সোনিয়া বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে সামনের জাতীয় স্তরে প্রতিযোগিতা জয়ের সংকল্প করছেন।