পকেটে আইন নিয়ে বিন্দাস ঘুরে বেড়াতে শেখাচ্ছেন শঙ্খ-তনুশ্রী

4

ধরুন আপনি আর গিন্নি তুমুল দাম্পত্য কলহ করছেন। পাশের ফ্ল্যাটের কাকাবাবু দেওয়ালে কান পেতে শোনার চেষ্টা করছেন আজকের এপিসোড। আপনি তিরিশ ডেসিবল তো গিন্নি ষাট। আপনি ষাটে পৌঁছতে পৌঁছতে তিনি একশ কুড়ি ছাড়িয়ে গিয়েছেন। ভাবছেন সকালে দুধ আনতে যাওয়ার সময় মিস্টার সামন্তকে মুখ দেখাবেন কী করে! উল্টোদিকের ফ্ল্যাটের দত্ত বৌদি সকালে দাঁত ক্যালাবেন... গুড মর্নিং বলার ফাঁকে মনে মনে শুধিয়ে নেবেন "কী! এখন সব ঠিক আছে তো!" আপনার একটা স্পেল ব্রেকার দরকার। আমি বলি কি... চেপে যান। আর হাল্কা করে গিন্নি কে বলে দিন আপনার কাছে The Layman's Lawyer আছে।

এটা বোমা-পিস্তল নয়, বাড়ি-গাড়ি-ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স কিংবা "মেরে পাস মা হ্যাঁয়" গোছের সেন্টু টাচ নয়। ধরে নিতে পারেন এটা একটা থ্রেট। আবার দুর্দান্ত সুযোগও। হাতের মোবাইল ফোন তুলে কয়েক কেবি ডেটা ব্যয় করে ডাউনলোড করে ফেলতে পারেন যেকোনও লিগাল ডকুমেন্ট।...

জাস্ট দেখান। যদি ঘৃতাহুতি না হয়, তবে মধুরেন সমাপয়েত হবেই হবে। খুব কাজের ওয়েব সাইট। দরকারি নানান আইনি কাগজ পত্র আপনি ডাউনলোড করতে পারেন এই সাইট থেকে। ডিড, এফিডেভিট থেকে শুরু করে সম্পত্তির জটিল আইনি কাগজ পত্র সবই পাওয়া যাবে সাইটে। প্রয়োজনে আপনি আইনি পরামর্শও নিতে পারেন। জানেন কি শুধু ফাঁকা আওয়াজ নয়, কোর্ট কাছারি মামলার হ্যাপাও উৎরে দেবেন ওঁরা। অনেক কম খরচে দক্ষ এবং যোগ্য আইনজীবীরা এখন আপনার সাইডে। আপনার নিজস্ব অনলাইন আইনি সহায়তা কেন্দ্র এখন আপনি পকেটে নিয়ে ঘোরেন।

ওরা মানে এই সংস্থার দুই কর্ণধার। দুই জিগরি দোস্ত। শঙ্খশুভ্র কুণ্ডু এবং তনুশ্রী নন্দন। দুজনেই দুঁদে আইনজীবী। একজন কর্পোরেট আইনে দক্ষ। তো অন্যজন ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে আইনজীবী হবেন। কালো কোট পরে অন্যায়ের প্রতিবাদ করবেন। তুমুল তর্কে বিপক্ষের আইনজীবীকে ধরাশায়ী করবেন। আর দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন করবেন। আর এসব ভাববেন নাই বা কেন... শঙ্খশুভ্রর রক্তে আইন। মা আইনজীবী। মামা বিখ্যাত অ্যাডভোকেট শাক্য সেন। দাদুও ছিলেন বিখ্যাত আইনজীবী নিশীথ চন্দ্র সেন। চিত্তরঞ্জন দাসের সঙ্গে অরবিন্দ ঘোষের মুরারি পুকুর বোমা মামলায় সঙ্গী আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন। একসময় কলকাতার মেয়রও হয়েছিলেন নিশীথবাবু। বাবা আইনজীবী ছিলেন না ঠিকই কিন্তু শঙ্খর ঠাকুরদাদা ছিলেন ওপার বাংলার ডাক সাইটে আইনজীবী শৈলেন্দ্র নাথ কুণ্ডু। পাবনা কোর্টে প্রায় আশি শতাংশ মামলাই তিনি জিততেন। দেশ ভাগের পর এপারে এসে আর সেভাবে প্র্যাকটিস করেননি। 

শঙ্খ এবং তনুশ্রী পুনের সিম্বায়োসিস ল কলেজ থেকে পাশ করেছেন। কলেজ থেকে বেরিয়ে শঙ্খ মেইনস্ট্রিম আইনজীবী হতে চেয়েছিলেন মামার মত, মার মত, দুই দাদুর মত। আর তনুশ্রীর গল্পটা একটু অন্যরকম। তনুশ্রীর পরিবারে প্রায় সকলেই ইঞ্জিনিয়ার। ইঞ্জিনিয়ার হওয়াটা যেন ওদের বার্থ রাইট। মহাদেবী বিড়লা গার্লস স্কুলের ছাত্রী তনুশ্রীও একসময় বিশ্বাস করতে শুরু করেন তিনিও ব্যতিক্রম হবেন না। কিন্তু একদিন খাবার টেবিলে ওর কেরিয়ার নিয়ে বড়দের আলোচনাই ওকে ব্যতিক্রম হওয়ার সাহস দিয়েছে। তখনও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা হয়নি। ওর কেরিয়ার প্রসঙ্গে অভিভাবকরা যেন ইঞ্জিনিয়ারিংকে কনস্ট্যান্ট ধরেই অঙ্ক কষছিলেন। ভাবটা এমন যেন ইঞ্জিনিয়ার হতেই হবে তনুশ্রীকে। যেনতেন প্রকারেণ পরিবারের সকলের মতো। এক ছাঁচে ঢালা। এই ধরে নেওয়ার ভঙ্গিমাটাই ওর আত্মসম্মানে আঘাত করে। ও স্থির করে নেয় আর যাই হোক ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বেন না। একরত্তি মেয়ের জিদের কাছে মাথা নোয়াতে বাধ্য হয় পরিবার। রীতিমত স্রোতের উল্টোদিকে কেরিয়ারের নৌকো বয়েছেন তনুশ্রী। পুনের ল কলেজ থেকে বেরিয়ে অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেলের দফতরে ইন্টার্ন করেন। ভালো লাগত কর্পোরেট ল। ডিএলএফ এ যোগ দেন। তার পর জেনপ্যাক্টে। 

কর্পোরেট দুনিয়ার আইনজীবী হওয়ার দৌলতে উদ্যোগের ছারপোকা কীভাবে কামড়ায়, কামড়ালে কতটা লাগে এসব জানেন তনুশ্রী। একবার বেড়াতে গিয়েছিলেন উত্তরাখণ্ড সেখানে গিয়ে ওকেও কামড়াল আন্ত্রেপ্রেনিওরিয়াল বাগ। 

দেখেন, ওখানে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইন্টারনেট সচেতনতা বেশ ভালো। ইকমার্সের ব্যবহার করেন প্রত্যন্ত পাহাড়ের গাঁয়ের মানুষ। কিন্তু স্থানীয় লোকজনের মধ্যে আইনি সমস্যা হলে সেটার সমাধান সহজে হওয়ার নয়। পাহাড় বেয়ে নেমে আসতে হয় শহরাঞ্চলে, সাদা জামা কালো কোটের আইনজীবীর যেন মৌরসি পাট্টা। পাঁচ মিনিটের কাজের জন্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় বসে থাকতে হয়। তারওপর মোনোপলি বাজারের যা রীতি! সোজা কাজেও মোটা টাকা লাগে। সাধারণ একটা ড্রাফট বানাতে, এগ্রিমেন্টের পেপার তৈরি করতে এত খরচ হওয়ার কথাই নয়, উপলব্ধি করেন তনুশ্রী। ফিরে এসেই শুরু করে দেন অনলাইনে আইনি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি। বলছিলেন আইন ব্যবস্থাকে আর বেশি গণতান্ত্রিক করার চেষ্টা করছেন ওরা। কলেজের বন্ধু শঙ্খশুভ্রর সঙ্গে যোগাযোগ করতেই শঙ্খও এক পায়ে খাড়া।

শুরু হয়ে গেল আইনকে সস্তায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এই অভিনব উদ্যোগ। উন্নত দেশ গুলোয় এই ধরণের অনলাইন ল-চেম্বার দীর্ঘদিন ধরেই আছে। কিন্তু ভারতে হাতে গোণা মাত্র কয়েকটি। কলকাতায় প্রায় নেই বললেই চলে। এই সংস্থাকে একটি স্টার্টআপ হিসেবেই দেখছেন শঙ্খ এবং তনুশ্রী। অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসেন দুজনেই। দুজনেরই পায়ের তলায় সরষে। এই যাচ্ছেন পাহাড়ে তো ওই ডাকছে সমুদ্র। সামাজিক কোনও উদ্যোগে কখনও না নেই তনুশ্রীর কিংবা শঙ্খর। সবসময় ওরা ফুটছেন নতুনের সন্ধানে। দুজনেই গান ভালো বাসেন। শঙ্খ মাউথ অর্গান বাজান। তনুশ্রীরও দারুণ শখ গানে। বইয়েরও নেশা খুব। গান-বই-বেড়ানোর পাশাপাশি পেশাও তাদের প্যাশন। এই দুটো বিন্দুকে দুর্দান্ত মিলিয়েছে ওদের আইনি স্টার্টআপ The Layman's Lawyer, আপনার দরকারি একটি ওয়েবসাইট।