সৃষ্টিসুখে মেতে আছেন বাগনানের দত্ত দম্পতি

0

কোনও সৃষ্টির উদ্দেশ্য যদি হয় অপরকে আনন্দ দেওয়া এবং আনন্দের শরিক হওয়া। কিংবা কাজটা করার মাধ্যমে যদি মনে হয় এ হল ইশ্বরের প্রতি ভক্তের ফুল। এমন দর্শনেই আজ অন্য ভুবনের পথিক ঝুনু দত্ত ও মিহির দত্ত। বাগনানের এই দম্পতি তাঁদের শিল্পকর্মের মাধ্যমে দেশ ও বিদেশের কাছে তুলে ধরেছেন বাংলার হরেক মণিমুক্তো। সুপারি পাতা, নারকেল পাতা, কচুরিপানা কিংবা বেতের মতো প্রাকৃতিক সামগ্রী দিয়ে তাঁদের সৃষ্টিকে কুর্নিশ করেছেন সমালোচকরা। এসবের সুবাদে জাতীয় পুরস্কার পালা করে পেয়েছেন দত্ত বাড়ির কর্তা-গিন্নি।

কলকাতার গর্ভমেন্ট আর্ট কলেজ তখন সবে শুরু হয়েছে। সেই সময় বাগনানের আন্টিলার মতো প্রত্যন্ত এলাকা থেকে কলকাতায় যেতেন সতীশচন্দ্র দত্ত। শিল্পী নন্দলাল বসুর সান্নিধ্য পাওয়া সতীশচন্দ্রর পরবর্তী প্রজন্মও আর্ট কলেজের মায়া ছাড়তে পারেননি। সতীশচন্দ্রর দুই নাতি শিশির ও মিহির ঠাকুরদার ভাবনাকে নিজেদের মতো করে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। শিশির দত্ত দিল্লিতে থাকেন ডিএভিসির সিনিয়র আর্টিস্ট। মিহির দত্ত আর্ট কলেজের আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটের ছাত্র ছিলেন। আর্ট কলেজে থাকাকালীন রাজ্যপালের কাছ থেকে পুরস্কার পেয়েছিলেন মিহিরবাবু। সাধারণত আর্ট বিভাগের পড়ুয়ারাই এই পুরস্কার পেতেন। আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট থেকে সেই নজির প্রথম ভাঙেন শিল্পী। আর্ট কলেজ থেকে পাশ করার পর একটি স্কুলে আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটের শিক্ষকের নিশ্চিন্তের চাকরি পেলেও কাজের প্রতি তাগিদ যেন আরও বেড়ে যায়। ছুটির দিনে সৃষ্টিতে বুঁদ হয়ে থাকতেন তিনি। ঝুনু দত্তকে বিয়ে করার পর তাতে যেন আরও গতি পায়।

সুপারি পাতা, নারকেল পাতা, বেত, কচুরিপানা, বাঁশ, পাট থেকে কাঠ। নাগালে থাকা নানা সামগ্রী নিয়েই এই দম্পতির যত কারুকাজ। কখনও কচুরিপানার ফল দিয়ে তারা তৈরি করেন বেলুড় মঠ, হোগলার মাধ্য,মে সূক্ষ্ম কাজ। স্বামী, স্ত্রীর যুগলবন্দিতে সেই সব সৃষ্টি নানা মহলে প্রশংসিত হয়েছে। ২০১২ সালে ঝুনু দত্ত পেয়েছেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কার। তাঁর স্বামী মিহির দত্ত ২০১৪ সালে ন্যাশন্যাল মেরিট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। সুপারি পাতার নীচের অংশ দিয়ে ফুলদানি বানিয়ে তিনি এই স্বীকৃতি পান। দত্ত বাড়ির সৃজনশীলতা এখন পৌঁছে যাচ্ছে জার্মানি, কানাডায়। মিহিরবাবুর কথায়, এই দেশগুলিতে পরিবেশবান্ধব সামগ্রীর দারুণ কদর। আর আমাদের সবকিছুতেই প্রকৃতির ছোঁয়া। তাঁদের তৈরি সামগ্রী রাজ্যেপর মেলা, প্রদর্শনীতেও যথেষ্ট সমাদর পেয়েছে।

শুধু অর্থের জন্যী নয়, মনের খোরাক থেকে এভাবে স্বপ্ন বুনে চলেছেন এই দম্পতি। অর্ডার পেলে সব ছেড়ে তখন কাজ নিয়ে মেতে থাকেন তাঁরা। স্কুলের চাকরির পাশাপাশি কীভাবে সামলান এত কিছু। মিহির দত্ত বলেন, “কাজই আমার নেশা। সৃষ্টির মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পাই। মনে হয় এর মাধ্য,মে অন্যমকেও আনন্দ দিতে পারি।” কাজের ক্ষেত্রে দুজনেই যেন একে অপরের পরিপূরক। একেবারে মেড ফর ইচ আদার। একে অন্য কে পরামর্শ দিয়ে সমৃদ্ধ করেন। ঝুনুদেবী বিয়ের আগে সেভাবে কিছু করেননি। স্বামীর স্পর্শে নতুন ভুবনে এসে তাঁর কাছে যেন প্রতিটা দিন নতুন কিছু পাওয়ার। তাঁর কথায়, “কাজটা আমার কাছে পুজোর মতো। যার মাধ্য মে মনের শান্তি মিলে।” তাঁদের শান্তির রসদ অনেকের কাছেই ভাবনার খোরাক জোগায়।