'আনপড়' মহিলাদের নিয়েই চেতনার ব্যাঙ্ক-বিপ্লব

0

মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার অখ্যাত মাসোয়াঢ় গ্রাম আজ শিরোনামে। ছোট্ট এই গ্রাম অার্থিক বিপ্লবের প্রাণকেন্দ্র। হার্ভার্ড, ইয়েল থেকে ছাত্র গবেষকরা এই গ্রামে আসেন ব্যবসার মডেল বুঝতে। কারন এখানেই রয়েছে সম্পূর্ণ মহিলাদের দ্বারা চালিত, মহিলাদের জন্য তৈরি ‘মন দেশি’ ব্যাঙ্ক। তথাকথিত গ্রামের আনপড় গাঁওয়ার মহিলাদের নিয়ে এই আন্দোলনের মূল কান্ডারি চেতনা গালা সিনহা। তাঁর হাত ধরেই বদলে গিয়েছে ওই ছোট্ট গ্রামের অর্থনীতি। স্থানীয় মহিলাদের প্রশিক্ষণ দিতে তৈরি করেছেন ‘মন দেশি ফাউন্ডেশন’।

মহিলাদের ক্ষমতায়নে ১৯৮৬-৮৭ সালটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পঞ্চায়েত বিল সংশোধনের মাধ্যমে পঞ্চায়েতে ৩০ শতাংশ মহিলার উপস্থিতি বিধিবদ্ধ হওয়ায় নারী বৈষম্যের জগদ্দল পাথর একটু হলেও নড়ল। সেই শুরু। গ্রামে গ্রামে গিয়ে মহিলাদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করলেন সমাজকর্মী চেতনা। মহিলাদের জন্মগত অধিকারের পাশাপাশি ভারতে মহিলারা যেসব নতুন অধিকার পেলেন সেই নিয়েই মূলত গ্রামের মহিলাদের সচেতন করার কাজ করতেন তখন ।তৈরি হল একটি নতুন সংস্থা যেখানে শুরু হল মহিলাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। যাতে তাঁরা গ্রাম পঞ্চায়েতে অংশগ্রহণ করতে পারেন।

কান্তা আমন্দাস সালুকে নামে এক তাঁতী একদিন এই সংস্থায় এসে হাজির হলেন। তিনি ব্যাঙ্কে কিছু টাকা গচ্ছিত রাখতে চান। কিন্তু ব্যাঙ্ক তাতে রাজি নয়। কান্তার সঙ্গে সেই ব্যাঙ্কে গিয়ে চেতনা জানতে পারেন, কান্তার টাকার অঙ্ক খুবই কম, তাই ব্যাঙ্ক সেই টাকা গচ্ছিত রাখতে চায় না। অদ্ভুত লাগে চেতনার। ব্যাঙ্ক তো এমন হওয়া উচিত, যেখানে দেশের প্রতেকটি মানুষ নিজেদের টাকা গচ্ছিত রাখতে পারে। সমাজকর্মী চেতনার জেদ চেপে গেল। তিনি এবার শুরু করলেন অন্য এক উদ্যোগ। গ্রামের ভিতরই মহিলাদের নিয়ে ব্যাঙ্ক তৈরি করতে লেগে পরলেন। সে এক ধুন্ধুমার লড়াই। একদল অশিক্ষিত মহিলাকে নিয়ে ব্যাঙ্ক তৈরির তোরজোড়ে জল ঢেলে দিল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। মুখের ওপর জানিয়ে দিল ব্যাঙ্ক তৈরির ছাড়পত্র নৈব নৈব চ। কারণ তাদের ব্যাঙ্ক পরিচালন করার শিক্ষা নেই। গুণে গুণে ছয় মাসে ব্যাঙ্ক চালানোর যাবতীয় শিক্ষা দিলেন চেতনা গালা সিনহা। সেই সময় চেতনা মুগ্ধ হয়ে দেখেছেন ওই তথাকথিত আনপড় গাঁওয়ার মহিলারাই কী আগ্রহ নিয়ে কাজ শিখলেন। এবার মাথা তুলে ভারতীয় শীর্ষ ব্যাঙ্কের কর্তাদের সামনে দাঁড়ালো মাসোয়াঢ়ের মহিলারা।

আরবিআই-কর্তাদের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে একটা ব্যাঙ্ক তৈরির দাবি জানালেন। তাঁরা ‘মন দেশি’ ব্যাঙ্ক তৈরির ছাড়পত্র চান। তাঁদের বক্তব্য, ব্যাঙ্কের কাজের জন্য যেটুকু কাজ জানা দরকার, তা তাঁরা জানেন। যে কোনও হিসেবনিকেশ খুব নিখুঁতভাবে করতে পারবেন তাঁরা। গরিব গুর্বো মানুষের আত্মবিশ্বাসকে কুর্নিশ জানালো রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। ওঁরা ব্যাঙ্ক করার ছাড়পত্র পেয়ে গেলেন।

১৯৯৭ সালে শুরু হয় মহিলাদের দ্বারা, মহিলাদের জন্য তৈরি এই ব্যাঙ্ক। ‘মন দেশি ব্যাঙ্ক’ চেতনার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার প্রথম পদক্ষেপ।

প্রথম যে চ্যালেঞ্জ ছিল পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া। বাইরের কাজ ফেলে কোনও মহিলাই ব্যাঙ্কে আসতে চাইতেন না। তাই ‘মন দেশি’ শুরু করল ‘ডোরস্টেপ ব্যাঙ্কিং’। মহিলাদের সেক্ষেত্রে নিজেদের কাছে পাসবুক রাখলেই হত। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেল টাকা গচ্ছিত রাখার এই হিসেব রাখতে শুরু করেছিল পুরুষেরা এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই টাকা মদ্যপানের পেছনেই তাঁরা ওড়াতো। তাই ‘মন দেশি’ শুরু করল স্মার্ট কার্ডের ব্যবস্থা। মহিলাদের লোন দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু করলেন চেতনা।

চেতনা বলছিলেন, ওই গ্রামেরই এক মহিলা নাম কেরাবাঈ ব্যাঙ্কে এসেছিলেন লোন নিতে। কারণ তিনি মোবাইল ফোন কিনতে চান। ব্যাঙ্কের কর্মীরা ভাবছিলেন, তাঁর ছেলেমেয়েরা হয়তো বায়না জুড়েছে মোবাইল কিনে দেওয়ার জন্যে। কিন্তু দেখা গেল ব্যাপারটা তা নয়, কেরাবাঈকে ছাগল চরানোর জন্য অনেক দূর যেতে হয়। তাই বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক রাখার জন্য মোবাইলটি তাঁর দরকার। কেরাবাঈ, চেতনাকে বলেন মোবাইল কী ভাবে চালাতে হয়, শিখিয়ে দেওয়ার জন্য। চেতনা অনুভব করলেন, এই মহিলাদের প্রয়োজনীয় কাজ শেখানোর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। 

এবার তৈরি হল একটি বিজনেস স্কুল। যেখানে শুরু হল অশিক্ষিত মহিলাদের কাজ শেখানো তাও আবার ‘অডিও-ভিজুয়াল’ ক্লাসের মাধ্যমে। এছাড়াও মহিলারা যাতে নিজেদের ব্যবসা চালু করতে পারে, সে ব্যাপারেও শুরু হল সাহায্য করা।

চেতনার উদ্যোগে শুরু হল ক্যাম্প করা। প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূর থেকে বহু মানুষ এখানে জড়ো হতেন। বেশিরভাগই আসতেন জলকষ্ট নিয়ে। সঙ্গে থাকত তাঁদের পোষ্যরাও। সরকারের সাহায্য যথেষ্ট ছিল না। একবার এক গর্ভবতী মহিলা তাঁর মায়ের সঙ্গে ক্যাম্পে আসেন। তাঁর অবস্থা দেখে চেতনা তাঁকে গ্রামে ফিরে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। কিন্তু গ্রামে জলের কষ্ট। তাই ক্যাম্পেই একটি ছেলের জন্ম দেন ওই মহিলা। ছেলেটি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি নামে। নিমেষের মধ্যে ক্যাম্পের চিত্র বদলে যায়। ছেলেটির নাম দেওয়া হয় মেঘরাজ। এখানেই শেষ নয়। ক্যাম্পের প্রত্যেকেই কিছু না কিছু করতে চাইলেন সদ্যোজাতর জন্য। ব্যাঙ্কের সিইও রেখা প্রত্যেককে ১০ টাকা করে দিতে বললেন। এর সঙ্গে ব্যাঙ্ক কিছু টাকা দিয়ে ১ লক্ষ টাকা মেঘরাজের নামে ব্যাঙ্কে গচ্ছিত রাখল।

এতক্ষণে আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন ‘মন দেশি’ ব্যাঙ্কের কাজকর্ম। কিন্তু কে এই চেতনা? যার মস্তিস্কপ্রসূত এই ‘মন দেশি’ ব্যাঙ্ক। মুম্বইয়ে জন্ম চেতনার। বিয়ে হয়েছিল মাসোয়া‌ঢ়ে বিজয় সিনহার সঙ্গে। এঁরা দুজনেই যুক্ত হয়ে পড়েন জয়প্রকাশ নারায়ণ আন্দোলনের সঙ্গে। মাসোয়া‌ঢ়ে থাকাকালিন চেতনা অনুভব করেন এখানকার জীবনযাত্রা কোথাও যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। যাতায়াতের অসুবিধে, বিদ্যুৎ নেই। সারা পৃথিবী থেকে এঁরা যেন কোথাও বিচ্ছিন্ন। আর মহিলাদের কথা তো বলারই নয়। নিজেদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ এঁরা। ঠিক এখান থেকেই নিজের যুদ্ধ শুরু করেন চেতনা। আর আজ তাঁর এই প্রচেষ্টার ফল দিনের আলোর মত উজ্জ্বল। হার্ভার্ড, ইয়েল থেকেও বিশেষজ্ঞরা আসছেন হরবখত। শিখে যান তাঁর ব্যবসার মডেল।

Related Stories