কলকাতায় গোলাপী বিপ্লব ঘটালেন যে পুরুষ

3

নারী আর পুরুষ গোটা দুনিয়া দ্বিধা বিভক্ত। তুমুল তর্কের ইন্ধন। তুমুল প্রেমের ছলাৎ ছল। তীব্র প্রতিহিংসা, রিরংসা আর প্রতিযোগিতার জটিল এক কূটনৈতিক সম্পর্ক। আদিম সময় থেকেই ইভ প্রভাব খাটিয়ে আসছেন। আর আদম ন্যালা খ্যাপার মতো ডাহা বোকা বনে যাচ্ছেন। পেশীর আস্ফালনে আদম চিরদিন হাল্‌কের মতো শরীরী। ইভ তার পেলব স্পর্শ আর তীক্ষ্ণ মেধায় ফুসলে রেখেছে দুনিয়ার সমস্ত হাল্‌ককে। প্রাচীন গ্রিস, মিশর রোম কিংবা আর্য সভ্যতা সব এক ফ্রেমে বাঁধা। কিন্তু তারও স্থান মাহাত্মে ভিন্ন রূপ। ভারতের নারী দীর্ঘ গবেষণার বিষয়। তবু একথা অনস্বীকার্য এবং সোজা সাপটা ভাবে বলাই যায় যে সে পৃথিবীর অন্য সমাজের থেকে পৃথক। কেননা আজ কয়েক হাজার বছর ধরে ভারতীয় পুরুষ-তন্ত্র মাতৃত্বের মহিমায় নারীকে মহিমান্বিত করে পূজ্য করে রেখেছে। নিরাপত্তার নামে অন্তঃপুরে ঠেলে দিয়ে এক-ফালি পরাধীন উঠোন দিয়েছে বিচরণের জন্যে। গার্গী, মৈত্রেয়ী, অনসূয়ার ভারতে এভাবেই একদিন পর্দার আড়ালে চলে গিয়েছে নারী। মহাকাব্যের কাহিনিগুলির ফাঁদ তাঁকে ধীরে ধীরে উন্নীত করেছে নির্যাতিতার মর্যাদায়। বর্ণাশ্রম যেমন একশ্রেণির মানুষকে দলিত করেছে। তেমনি নারীকেও দুর্বল করে দেওয়ার জন্যে, তাঁদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার জন্যে তৈরি হয়েছে সংহিতা। হিন্দু প্রথার নাম করে দিনের পর দিন লক্ষ লক্ষ নারীকে পুড়িয়ে মেরেছে এই সমাজ। নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থে দুর্বল আর অশিক্ষিত করে রেখেছে তাঁদের। হ্যাঁ রেখেছে, এখনও রেখেছে। 

এত সামাজিক আন্দোলনের পরও। কন্যাসন্তানের প্রতি সমান দৃষ্টি নেই। বাড়তি সুযোগ আর সংরক্ষণের ফিকির আছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে এখনও নিপীড়ন, নির্যাতন আর নারীকে বৈবাহিক বেড়া জালে বন্দি করে রাখার ঘটনা এখনও বহাল তবিয়তে চলছে।

কেউ কেউ বলেন শিক্ষিত সমাজে এসব কম। কেউ বলেন নিম্নবিত্তের জীবনে এর পরিমাণ বেশি। ঘটনা তেমন নয়। ভারতের প্রায় সব গোষ্ঠী এবং সব সমাজেই এই কু-প্রচলন আছে। নিম্নবিত্তের ক্ষেত্রে সমস্যা অন্যরকম। অশিক্ষার অন্ধকারে সে এক বিভীষিকা। আর উচ্চবিত্ত রক্ষণশীল সমাজে চেহারাটা পর্দার আড়ালে একই রকম। যেন ফাঁসির দড়িতে বিলেতি মোম লাগানো। রেশমের ডোর দিয়ে শ্বাস রোধ করা। নারী সেখানেও সমান ভাবে সম্পত্তি জ্ঞানে পূজিতা, সংরক্ষিতা দেবী। ফারাক ওটুকুই। সংসারের সব দায় দায়িত্বের ভার তাঁর কাঁধে। গেরস্থালীর দোহাই দিয়ে তাদের অ-সমানাধিকার যেন নির্ণীত সত্য। অথচ কার্যকর সমস্ত ক্ষমতা আয়ত্তে থাকে পুরুষের। সেই পুরুষ যিনি মনে মনে বিশ্বাস করেন তিনি উদার। তিনি নারীবাদী। তিনি তাঁর স্ত্রীকে স্বাধীনতা দেন, তবে নারীটি স্বাধীনতা পান।

এরকম জটিল দমবন্ধ সমাজে এক সংস্কারক দীর্ঘ পঁচিশ বছর ধরে নীরবে লড়াই করে যাচ্ছেন। শুধু এই সমস্যার সমাধান করবেন বলে। নাম বিষ্ণু কুমার ধানুকা। পেশায় ব্যবসায়ী। কলকাতার মাড়োয়ারি। মিলেনিয়াম ম্যামের প্রতিষ্ঠাতা। বলছিলেন তাঁর নিজের গল্প। ব্যবসায়ীক কাজে ব্যস্ত থাকতেন তিনি। ১০টা পাঁচটার কাজ কোনও দিন করেননি। ফলে ঘরে ফিরে যেটুকু সময় স্ত্রীর সঙ্গে কাটাতেন তাতে তাঁর বিশ্বাস ছিল যে অর্ধাঙ্গিনী মেধায় বুদ্ধিমত্তায় কোনও অংশে কম নন। বিষ্ণু বারংবার চেষ্টা করেছিলেন তাঁর নিহিত মেধাকে প্রয়োগ করতে। বিভিন্ন ভাবে চেষ্টা করেও সফল হননি। ঘটনাচক্রে, বিপত্নীক হন বিষ্ণু তারপর থেকে আফসোসটা আরও বাড়তে থাকে। ভাবনাটাও আরও বৃহত্তর হয়। ভাবতে থাকেন। শিক্ষিত উচ্চবিত্ত পরিবারের ঘরের মহিলাদের জীবন কেবল মাত্র ঘরের চারটে দেওয়ালে কেন আবদ্ধ হয়ে থাকবে! কেন শুধু গয়নাগাটি আর পরনিন্দা পরচর্চায় সময় অতিবাহিত হয়ে যাবে! কেন ঘরের মহিলারাও সম্পদ সৃষ্টির কাজে সমান ভাবে স্বামীর কাঁধে কাঁধ মেলাবেন না! বিশ্বসংসারের বাণিজ্যের কিংবা কাজের আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন নাই বা কেন! শিক্ষা যা সকলের জন্মগত অধিকার তা থেকে কেউ তাদের বঞ্চিত করতে পারে না। এসব নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেন বান্ধব মহলে। আইডিয়া ছিল ঘরের মহিলাদের আর্থিক বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষিত করে তোলা। যাতে ঘরে বসেই তারা ক্যাপিটাল মার্কেটে টাকা লাগাতে পারেন। এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে এক বন্ধুর স্ত্রী স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে তার কাছে ব্যক্ত করেন তাঁর ইচ্ছের কথা। জানান তিনি রাজি। ১৯৯৩ সাল। শুরু হয় তার ভাবনা প্রয়োগ করার কাজ। প্রশিক্ষণের জন্যে এক পয়সাও নেন না বিষ্ণুজি। উল্টে চা বিস্কুট খাওয়ানো, ক্লাসরুমের বন্দোবস্ত করা সব করেন। একটু একটু করে শুরু হয়ে যায় মিলেনিয়াম ম্যামের যাত্রা। একজন দুজন করে বাড়তে থাকে তাঁর ছাত্রসংখ্যাও। শুধু শিক্ষিত করে তোলা নয়, সমাজে তাদের প্রতিষ্ঠিত করার কাজটাও করেন তিনি। সঙ্গে পান বন্ধুদের। এগিয়ে আসেন সঞ্জয় ভুবনিয়া। এগিয়ে আসেন সি কে ধানুকা, সঞ্জীব গোয়েঙ্কার মত মানুষ। কলকাতার বুকে নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটে যায়। কলকাতার প্রায় সব শিল্পপতির গৃহিণীরাই বিষ্ণু ধানুকার ফ্রি কোচিংয়ে নাম লেখান। এখন এই ২৫ বছরে কয়েক হাজার ছাত্রী ছড়িয়ে রয়েছে গোটা বিশ্ব জুড়ে। শিক্ষার পাশাপাশি দীক্ষাও দেন তিনি। গীতার ক্লাস নেন। এ-টিকেট শেখান। বিজনেসের কঠিন টার্ম টার্মিনোলজি, জার্গন জলবৎ তরলং করে বুঝিয়ে দেন এই টিচার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাওয়া বিশ্বকেও বিশ্লেষণ করে বোঝান নিয়মিত। ফলে ঘরের ঘরোয়া মহিলারাও স্বামীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে শেখেন। স্বামীর ব্যবসায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার হিম্মত পান। আর তাদের অন্তঃপুরের হেঁসেলে বন্দি হয়ে থাকতে হয় না। সমাজে সম্মানের সঙ্গে মাথা তুলে বাঁচার রশদ পান। শুধু মাত্র বিষ্ণু ধানুকার মিলেনিয়াম ম্যামের দৌলতে।

শুধু কি পড়াশুনো! না, বেড়ানো খেলানোও আছে। নিয়মিত পার্টি হয়। একটু আধটু আউটিং এক্সকারশন। সব হয়। আর হয় প্রাণ খুলে বাঁচা।

আর এভাবেই মিলেনিয়াম ম্যাম নজর কাড়ে ভারতের তাবড় শিল্পোদ্যোগীদের। এই স্বনির্ভর স্বয়ং সম্পূর্ণাদের দেখে খোদ রতন টাটা মুগ্ধ। আবেগাপ্লুত সাইরাস মিস্ত্রি। রাজ্যপাল কেশরী নাথ ত্রিপাঠীও প্রশংসায় পঞ্চমুখ। বাংলার বুকে সমান্তরাল শক্তির বিকাশে যে নীরব আন্দোলন করেছেন বিষ্ণু কুমার ধানুকা তা কেউ মনে রাখুন নাই রাখুন তাঁর সাফল্য একটি ইতিহাস তৈরি করে ফেলেছে।