পড়া ভালো লাগবে কমলা বাক্সের জাদুতে

0

পরিকাঠামো আছে তো পড়ুয়া নেই। কোথাও পড়ুয়া আছে তো যথেষ্ট পরিকাঠামো নেই। ভারত জুড়ে পড়ুয়া এবং পরিকাঠামোর সহবস্থান অর্থাৎ একটা পরিপূর্ণ স্কুল যাকে বলে অনেক জায়গাতেই তার দেখা পাওয়া যায় না। সাত সমুদ্র পেরিয়ে সেই মার্কিন মুলুকেও বিষয়টি বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল তিন ভারতীয় ছাত্রকে। শিবা মণ্ডল, সাকসাম খোসলা এবং প্রকাশ পডেল আমেরিকার ওবারলিন কলেজের তিন ছাত্র ঠিক করে নিলেন ভারতের স্কুলশিক্ষার ক্ষেত্রে এই দুরবস্থার ছবি বদলে দেবেন।

‘লুমিনঅ্যাড’এর বৈপ্লবিক দল
‘লুমিনঅ্যাড’এর বৈপ্লবিক দল

শহরের স্কুলগুলিতে প্রয়ুক্তির ব্যবহারে অত্যাধুনিক ব্যবস্থা চালু হলেও ঠিক উলটো ছবি গ্রামে-গঞ্জে। ক্লাস ঘরে চক-ডাস্টার থাকলেই স্কুল বলা যায় না। এমনও অনেক স্কুল আছে যেখানে সেটুকুও নেই। নেই বেঞ্চও।গ্রামের দিকে এমনিতেই স্কুলছুটের সংখ্যা বেশি। যারা নিয়মিত স্কুলে আসে তাদের জন্য পড়াশোনার পরিবকাঠামো যথেষ্ঠ নেই এমন স্কুলের উদাহরণ ভুরি ভুরি। মার্কিন মুলুকের তিন ভারতীয় ছাত্র সেইসব স্কুলের জন্য নিয়ে এলেন ‘ব্রাইট অরেঞ্জ বক্স’ সলিউশন। উজ্জ্বল কমলা রঙের ওই বাক্সটাই স্কুলের পড়াশোনায় বিপ্লব ঘটিয়ে দিতে পারে বলে মত তিন ছাত্রের।

‘লুমিনঅ্যাড’ নামে একটি সংস্থা গড়ে ফেললেন শিবা-প্রকাশরা। একটা ডিভাইস বানাবেন বলে ঠিক করলেন, যেখানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভিডিও ফুটেজ দেখানোর ব্যবস্থা থাকবে অনুন্নত স্কুলগুলির ক্লাসে ক্লাসে। পরিকাঠামো এবং স্কুলছুটের সমস্যায় জর্জরিত স্কুলগুলিতে এই ‘অরেঞ্জ বক্স’ খানিকটা হলেও পরিবর্তন ঘটাতে পারে বলে মনে করেন তাঁরা। ডিভাইসটা বানাতে হবে,তারপর পরীক্ষা করে দেখা এবং শেষ পর্যন্ত কার্যকর করা-‘লুমিনঅ্যাড’ শরণাপন্ন হল থমাস ক্রিক নামে এক পদার্থবিদের।

২০১৪ র জানুয়ারিতে এল সেই দিন। দিল্লির সংস্কৃত স্কুলে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হল ‘ব্রাইট অরেঞ্জ বক্স’। আইডিয়া একদম হিট। কমলা বাক্স ঠিকঠাক কাজ করল এবং পড়ুদের মনযোগ ধরে রাখতে পারল। প্রজেক্ট দাঁড় করাতে টাকা দরকার। প্রাথমিকভাবে লুমিনঅ্যাডের ভাঁড়ারে ১০০০০ ডলার চলে আসে Kathryn W. Davis 100 Projects for Peace Grant থেকে। ওই অনুদান ছিল ডিভাইসটি ঢেলে সাজানো এবং তাকে ‘টেক ফর ইন্ডিয়া’র সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পাইলট প্রোগ্রামের মাধ্যমে দিল্লির ৬টি স্কুলে প্রাথমিকভাবে শুরু করার জন্য।

কী আছে ‘ব্রাইট অরেঞ্জ বক্স’এ? একটা প্রজেক্টর, কমিপউটর এবং ভিডিও ক্যামেরা। অরেঞ্জ বক্স একসঙ্গে দুটি কাজ করে। ক্লাসে একটি সবাক ভিডিও দেখানো হয় এবং পুরও বিষয়টা রেকর্ড করা হয় ‘প্যান পাল প্রোগ্রাম’এর জন্য। ‘প্যান পাল প্রোগ্রাম’ হল শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, নানা কাহিনীর সাপ্তাহিক আদান প্রদানের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের স্কুলগুলির শ্রেণিকক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করা ।এই প্রোগ্রাম ভারতের ৬টি স্কুল এবং আমেরিকার বেশ কয়েকটি স্কুলে চালু আছে।

অনেকগুলি শিক্ষনীয় বিষয় এবং ভিডিও নিয়ে একটা পুল বা তথ্য ভান্ডার তৈরি হয়। পড়ার মান অনুযায়ী, যেমন সিবিএসই,কমন কোর যে সিলেবাস অনুসরণ করে সেই অনুযায়ী পড়ানোর বিষয়গুলি সাজিয়ে নেন শিক্ষকরাই। এবার পড়ানোর জন্য যা যা প্রয়োজন কমলা রঙের ম্যাজিক বাক্সটি সেগুলি খুঁজে দেয় শিক্ষকদের। বাক্সের মধ্যে বিজ্ঞান, ইংরেজি সাহিত্য, গণিতের মতো বিষয় নিয়ে ১৫০০ ওপর ভিডিও রয়েছে। ‘শিক্ষকরা চাইলে নতুন বিষয় ঢোকাতে পারেন, কোনও কিছু বাদ দিতে পারেন, আবার ওর মধ্যে থেকে কোনও কিছু খুঁজেও নিতে পারেন। এভাবে সিলেবাসে ক্রামগত নতুন নতুন বিষয় নিয়ে আসতে পারেন’, জানালেন সাকশাম।

এবার আসা যাক ব্যবসায়িক দিকটায়। তিন বন্ধু যখন শিক্ষা প্রসারের নানা দিকটা সামলাচ্ছেন তখন প্রকল্পের ব্যাবসায়িক দিকটায় নজর রেখেছেন ওহনরি হারবো। বেশ কয়েকটি উপার্জনের জায়গা রয়েছে এখানে। প্রথমেই যেটা বলার সেটা হল প্যান পল প্রোগ্রামের মাধ্যমে ক্রস সাবসিডি। অর্থাৎ কোনও কিছুর জন্য একদল প্রচুর টাকা খরচ করছে অন্য কোনও দল যাতে সস্তায় সেই সুবিধা ভোগ করতে পারে।দুটি উপায়ে ‘প্যান পল প্রোগ্রাম’ চলে।প্রথমটি হল, ‘প্যান পল’ সার্ভিসের জন্য বাৎসরিক একটা ভাড়ায় ভারতের প্রান্তিক স্কুলগুলির জন্য ডিভাইস দিয়ে দেওয়া হয়। দ্বিতায়টি হল, কোনও এনজিও বা যে কেউ সরাসরি ‘ব্রাইট অরেঞ্জ বক্স’ কিনে নিতে পারেন। কী খরচ পড়বে তার একটি বিবরণ নিচে দিয়ে দেওয়া হল-

প্যান পল প্রোগ্রাম

  • ডিভাইস সস্পরশিপ-৮৭০ ডলার
  • বাৎসরিক ভাড়া-১০০০ ডলার
  • প্রথম বছরের ভাড়া-১,৮৭০ ডলার
  • পরের বছরের ভাড়া-১০০০ ডলার
  • মার্কিন স্কুল অথবা ব্যক্তিগত স্তরে সরাসরি বিক্রি
  • এনজিও-৮৭০ ডলার
  • স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন-৭০০ ডলার
  • প্রতি ইউনিটের জন্য (ডিজাইন,যন্ত্রপাতি,সার্ভার,সফটওয়ার, আমদানি শুল্ক সব ধরে) এখন খরচ পড়ে ৬৭০ ডলার।

ভারতে পুরও প্রক্রিয়াটির দেখভাল করেন আইআইটি দিল্লির আশিস রঞ্জন। কমলা বাক্সটি মধ্যে অনেক দামি জিনিসপত্র রয়েছে। বাক্সটির একটা বিশেষ দিক হল, এর ব্যাটারি সৌরশক্তি চালিত।প্রত্যেকটা ডিভাইস বিদ্যুৎ শক্তি এবং ইন্টারনেট ছাড়া কাজ করে।

‘টেক ফর ইন্ডিয়া’র সঙ্গে ‘লুমিনঅ্যাড’ গাঁটছড়া বাঁধার ফলে ভারত জুড়ে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা সহজ হয়েছে। সব ঠিকঠাক চললে ‘ব্রাইট অরেঞ্জ বক্স’ এর ব্যাবহার বাড়টা সময়ের অপেক্ষা। ২০০ টি শহরে ‘টেক ফর ইন্ডিয়া’র উপস্থিতি রয়েছে। হার্ডওয়ারের দাম আরও কমিয়ে আনতে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা চালাচ্ছে ‘লুমিনঅ্যাড’। গোটা টিম কাজের খুঁটিনাটি প্রত্যেকটি বিষয় নথিবদ্ধ করে রাখছে। লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথে কতটা কী হল এই নথির ভান্ডারই তথ্য যোগাচ্ছে তিন প্রবাসী-উদ্যোগী ছাত্রকে।