অসমে গণ্ডারের মল থেকে এলরাইনোর কাগজ

0
‘‘এল রাইনোর জন্ম হয়েছিল দুর্ঘটনার মধ্যে দিয়ে।’’ নিশা বোরার মুখে যেন রহস্যের হাসি। অসমের অবসরপ্রাপ্ত মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার মহেশ বোরার মেয়ে বলছিলেন, ‘‘ রাজস্থানে যে হাতির মল থেকে কাগজ তৈরি হয়, ভাগ্যিস তা বাবা খবরের কাগজ পড়ে জানতে পেরেছিলেন। ভাগ্যিস সেই কাজে যুক্ত লোকগুলোর দেখা পেয়েছিলেন। ভাগ্যিস ওরা বাবাকে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন।’’ এতগুলো ভাগ্যিস ছিল বলেই না এল রাইনোর গল্প সত্যি হল।
মহেশ বোরা, অবসরপ্রাপ্ত এই মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার এবং পরিবেশকর্মী গড়ে তুলেছেন এল রাইনো
মহেশ বোরা, অবসরপ্রাপ্ত এই মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার এবং পরিবেশকর্মী গড়ে তুলেছেন এল রাইনো

অবসরপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার মহেশ বোরা যে গন্ডারের মল থেকে কাগজ তৈরি করতে চান, সে কথা শুনে তো পাড়া-প্রতিবেশীরা হেসেই খুন। অনেকে বললেন, ‘‘বার্ধক্যের লক্ষণ’’। কারও ধারণা, ‘‘লোকটা বোধহয় পাগল হতে চলেছে।’’ সে সময় নিশা কর্মসূত্রে অসমের বাইরে। কোয়ান্টাম নামের সংস্থায় কাজ করতেন। বাবার নতুন অ্যাডভেঞ্চারের খবর পেয়ে দিন কয়েকের জন্য অসমে ফিরলেন নিশা। সব দেখেশুনে তো নিশার চক্ষু চড়কগাছ। এভাবেও কি কখনও কাগজ‌ তৈরি হতে পারে। না, এরপর নিজের কাজের জগতে ফিরেও নিশা আর মন দিতে পারেননি। বছর দুয়েকের মধ্যেই ইস্তফা। অসমে ফিরে তৈরি করলেন এল রাইনো নামের সংস্থা।

এল রাইনো টিম
এল রাইনো টিম

ব্র্যান্ড হিসাবে এলা রাইনোকে তুলে ধরার উদ্দেশ্যটা নিশার কোনও কালে ছিল না। তিনি জানতেন বিরল প্রজাতি হিসাবে চিহ্নিত এক শৃঙ্গযুক্ত গন্ডারের সংখ্যা খুব বেশি হলে হাজার তিনেক। অসম যেন সেই গন্ডারের মাতৃভূমি। এক শৃ্ঙ্গের গন্ডার সংরক্ষণকে প্রধান গুরুত্ব দেওয়া হলেও, জোরকদমে শুরু হল গন্ডার এবং হাতির মল থেকে কাগজ তৈরির কাজ।


এল রাইনো টিম
এল রাইনো টিম

শুরুতে সব কাজই কঠিন। কিন্তু গন্ডার কিংবা হাতির মল সংগ্রহের কাজটা আরও কঠিন। সেই মলে জলে ভিজিয়ে, নানান রাসয়নিক মিশিয়ে, নানা ধাপের মধ্যে দিয়ে এগোনোর পর কাগজ তৈরি হল ঠিকই। কিন্তু তা কিনবেটা কে? ‘‘ভেবেছিলাম কাগজ তৈরি হয়ে গেলেই বোধহয় বিক্রি হয়ে যাবে। কিন্তু হল ঠিক উল্টোটা। ক্রেতাই নেই। বিশ্বে কাগজশিল্পের অন্যতম বড় শক্তি ভারতের বিভিন্ন কাগজ কারখানায় কাজ করেন লক্ষাধিক মানুষ। অন্যান্য সংস্থাগুলো যে দামে কাগজ বিক্রি করে তা এল রাইনোর পক্ষে সম্ভব নয়।’’ বলছিলেন নিশা।


এল রাইনোর কাগজ থেকে তৈরি বই
এল রাইনোর কাগজ থেকে তৈরি বই

অতএব বন্যপ্রাণীর মল থেকে তৈরি কাগজ নিয়ে আগ্রহ থাকলেও, ক্রেতা পেল না এল রাইনো। এরপর বানিজ্য মেলা কিংবা ফেসবুকে প্রচার। নিশা বোঝাতে লাগলেন, প্রাণীর বিষ্ঠা থেকে তৈরি হলেও এ কাগজ কম কিছু নয়। বরং গুণগত মানে অনেক-অনেক ভাল। ধীরে ধীরে এল রাইনোর কথা ছড়াতে লাগল, বাড়ল বিক্রি। এল রাইনোর সাফল্যে উৎসাহিত হল অসম সরকার। নিশার আশা, সরকার হয়তো এল রাইনোর সঙ্গে যৌথভাবে কাগজ তৈরিতে উদ্যোগী হবে। আরও জোর দেওয়া হবে গন্ডার সংরক্ষণেও।


এল রাইনোর কাগজ
এল রাইনোর কাগজ

শুধুমাত্র ব্যবসায়িক কাজে আগ্রহী নয় বোরা পরিবার। বরং ব্যবসায়িক কাজের সঙ্গে সেবামূলক কাজের ফারাকটুকু তাঁরা ঘুচিয়ে দিতে চান। সরকারিকর্মী না হয়েও অসমের যে সব মানুষ গন্ডার সংরক্ষণের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে, তাদের আর্থিক সহায়তা দেয় এল রাইনো।


বেশ কয়েকটা ধাপ পেরিয়ে তৈরি হয় কাগজ
বেশ কয়েকটা ধাপ পেরিয়ে তৈরি হয় কাগজ

একেতো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আবহাওয়া কাগজ শিল্পের পক্ষে অনুকূল নয়। তার ওপর গন্ডারের মল থেকে হ্যান্ডমেড পেপারের দামও বেশি। নিশা জানেন, দোকানে-দোকানে এই কাগজ বিক্রি করা সম্ভব নয়। বরং এর জন্য আলাদা ক্রেতা তৈরি করতে হবে। বোঝানো দরকার এই কাগজ হল ‘এক্সক্লুসিভ’।

কাগজ শুকানো হচ্ছে
কাগজ শুকানো হচ্ছে

প্রতিবন্ধকতা জয়ের জন্য দরকার স্বপ্ন। বৃহৎ সব কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা চালিয়ে যেতে যেতে নিশা স্বপ্ন দেখেন, এক দিন শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াবে এল রাইনো।হাতে-হাতে ছড়িয়ে পড়বে পরিবেশবান্ধব কাগজ। ছাপা হবে কত বই...। নিশা বলেন, ‘‘চেষ্টা থাকলে সব হয়। আজ না হলে কাল ক্রেতারা বুঝবে যে এল রাইনোর কাগজ হল সবচেয়ে ভাল। ’’

Related Stories