অনলাইনে সবান্ধব শপিং! সুযোগ দিচ্ছে ShopInSync

0

কেনাকাটাকে যেমন সহজ করেছে ই-কমার্স তেমনি ক্রেতাদের সমস্যাও বেড়েছে। তাড়াহুড়ো করে জিনিস কিনে ফেলা এবং তারপর আফশোস করা, বিশেষ করে বেশি দামের জিনিসের ক্ষেত্রে এমনটা প্রতিনিয়ত ঘটছে। এর একটা সহজ উপায় হল কেনাকাটা করার সময় বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে শপিং করা,যাতে সকলের পরামর্শ নিয়ে বুঝেশুনে জিনিস কেনা যায়। এই পরিষেবা দিতেই এবার নতুন অ্যাপ 'শপ-ইন-সিঙ্ক' নিয়ে হাজির হয়েছেন ইয়াহু-র দুই প্রাক্তন কর্মী।

ঠিক কী ধরনের পরিষেবা দেয় এই অ্যাপ?

সহজেই বিভিন্ন প্রোডাক্টের দামের তুল্যমূল্য বিচার, জিনিসপত্র সম্পর্কে তথ্যের আদানপ্রদান, প্রোডাক্ট কেনার আগে বিস্তারিত তথ্য পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করে অভ্যন্তরীণ মেসেজিং সার্ভিসের মাধ্যমে তাদের পরামর্শ নেওয়া - এইসব পরিষেবা প্রদান করে এই অ্যাপ।

এই অ্যাপে ফ্লিপকার্ট, স্ন্যাপডিল, অ্যামাজনের মতো ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের কয়েক লক্ষ প্রোডাক্ট রয়েছে এবং ফ্যাশন, কিড্‌সওয়্যার, ইলেক্ট্রনিক্স অ্যান্ড হোম অ্যাপ্লায়েন্সেস-এর মতো ১২টি মূল বিভাগের জিনিসপত্রের দামের তুলনামূলক বিচার করা রয়েছে।

কাহিনি এ পর্যন্ত

২০১৫ সালে রাজ রামস্বামী এবং আসিস পরনামি প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থার সদর দফতর স্যান ফ্র্যান্সিসকোয়। রাজ এই সংস্থার সিইও এবং এর আগে তিনি ইয়াহু-র একজন প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট এবং রেভিনিউ এক্সিকিউটিভ ছিলেন। ওই একই সংস্থার প্রোডাক্ট অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিডার ছিলেন আশিস। বেঙ্গালুরু-তেও এই সংস্থার দফতর রয়েছে।

রাজ এবং আশিস
রাজ এবং আশিস

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং মার্কেট রিসার্চের পর রাজ এবং আশিস উপলব্ধি করেন, ভারতে সাধারনত সকলেই একা অনলাইন শপিং করে থাকেন। তাঁরা বুঝতে পারেন, কেনাকাটার ক্ষেত্রে দাম যেমন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তেমনই, কাছের বন্ধু এবং পরিবার, পরিজনের দেওয়া পরামর্শ এবং প্রোডাক্ট সম্পর্কিত তথ্যও ক্রেতার সিদ্ধান্তে অনেকখানি প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু অনলাইন শপিংয়ের ক্ষেত্রে কারও পরামর্শ নেওয়ার প্রক্রিয়া বেশ জটিল।

লিঙ্ক অথবা স্ক্রিনশট মেল করা, প্রোডাক্ট সম্পর্কে ফোন বা চ্যাট করে মতামত নেওয়া, ফের ওই ওয়েবসাইটে গিয়ে জিনিস অর্ডার দেওয়া - সবমিলিয়ে এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। তার উপর প্রত্যেকটি ওয়েবসাইটেই যে বিপুল সংখ্যক জিনিস পাওয়া যায় তা সুবিধের চেয়ে অসুবিধার কারণই বেশি হয়ে ওঠে। ফলে, সঠিক দামে উচ্চমানের জিনিস কিনতে হলে হয় ব্যবহারকারীকে একসঙ্গে অনেকগুলি ই-কমার্স সাইট খুলে একই জিনিসের দাম মিলেয়ে দেখতে হয়, অথবা দামের তুলনামূলক বিচার করা যায় এরকম কোনও প্ল্যাটফর্মে গিয়ে সব খতিয়ে দেখে ফের কোনও একটি ই-কমার্স সাইটে ফিরে আসতে হয়। 

এই সমস্যাগুলির সমাধানের পথ হিসেবেই রাজ এবং আশিস তাঁদের মোবাইল অ্যাপ তৈরীর পরিকল্পনা করেন। রাজ বলছেন,

"আমরা কেবলমাত্র ভারতের বাজারে ক্রেতাদের সমস্যার সমাধান করতেই ShopInSync ডিজাইন করেছি। আমরা অনেক ধরনের জিনিস এবং দামের সঠিক বিচারের বিষয়টি যেমন মাথায় রেখেছি, তেমনই যাতে পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগ করা যায় সেই ব্যবস্থাও রেখেছি। ক্রেতাদের প্রয়োজনীয় সব বিষয়কে এক সূত্রে গেঁথেই কেনাকাটার অভিজ্ঞতাকে আরও সহজ এবং উপভোগ্য করে তোলার চেষ্টা করছি আমরা।"

এই মুহূর্তে কেবলমাত্র অ্যান্ড্রয়েড-এই মিলবে এই অ্যাপ। আইওএস অ্যাপ তৈরীর কাজও চলছে। প্রথমে মোবাইল অ্যাপ-এর সাফল্য পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তবেই ডেস্কটপ সংস্করণ তৈরীর পথে হাঁটতে চান নির্মাতারা।

কীভাবে কাজ করে এই অ্যাপ?

একজন ব্যবহারকারীর ব্যবহারের ধাঁচ এবং তথ্য আদানপ্রদানের ধারা দেখেই তাঁকে টপ ডিল বা অফারের মাধ্যমে কোনও জিনিস কেনার সুপারিশ করে এই অ্যাপ। সবচেয়ে চর্চিত জিনিসপত্রের দাম, রেটিং এবং অন্যান্য তথ্যের উপর নজরদারিও চালানো হয়। প্রত্যেকটি প্রোডাক্ট ক্রয়ের ক্ষেত্রেই সেই সংস্থা থেকে খানিকটা করে আয় করে এই অ্যাপ। এই মুহূর্তে গ্রাহকসংকখ্যা বৃদ্ধি এবং নিজেদের প্রোডাক্টের গুণগত মান উন্নত করার দিকেই নজর দিচ্ছেন তাঁরা। তবে, ভবিষ্যতে বিভিন্ন ব্র্যান্ড বা প্ল্যাটফর্মের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে তাঁদের প্রোডাক্ট 'ফিচারড সেকশন'-এ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং বৃদ্ধির সম্ভাবনা

এদেশে ই-কমার্সের পরিধি বেড়েই চলেছে। NASSCOMM-এর মতে ২০২০ সালের মধ্যে বাজারে বিক্রিবাট্টা ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। ফলে এই ক্ষেত্রে সংস্থার সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনই বৃদ্ধি পাচ্ছে গ্রাহক টানতে তাদের বিভিন্ন পরিষেবার পরিমাণও। এবছর মে মাসে ক্রিস গোপালাকৃষ্ণণ এবং বিনোস-এর তরফ থেকে ১মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ পেয়েছে প্রাইস কম্প্যারিজন প্ল্যাটফর্ম বাই হটকে। নিজেদের গ্রাহকদের কেনাকাটার সময় বন্ধু এবং পরিবারের সঙ্গে চ্যাট করার সুযোগ করে দিতে অগাস্ট মাসে 'পিং'লঞ্চ করেছে ফ্লিপকার্ট। এরই পাশাপাশি এই ক্ষেত্রে বাড়তে থাকা স্টার্ট আপগুলির মধ্যে অন্যতম হল Voodoo এবং Pricemojo। এই দুটি অ্যাপই ক্রেতাদের সরাসরি চ্যাট করার এবং বিভিন্ন ই-কমার্স কোম্পানির সঙ্গে দরদাম করার সুযোগ করে দেয়।

শপ ইন সিঙ্ক নিজেদের শুধুমাত্র একাধিক প্ল্যাটফর্মে দামের তুলনা করার ক্ষেত্রে নয়, সোশ্যাল মেসেজিং-এর ক্ষেত্রেও সকলের চেয়ে আলাদাভাবে তুলে ধরতে চায়। ভবিষ্যতে নিজেদের প্রোডাক্ট ক্যাটাগরি আরও বাড়ানোর পাশাপাশি প্রোডাক্টের সংখ্যাও বাড়াতে চায় তারা। এপর্যন্ত সংস্থার প্রতিষ্ঠাতারা নিজেদের খরচেই শপ ইন সিঙ্ক-কে চালিয়ে নিয়ে এসেছেন। তবে ধীরে ধীরে নিজেদের টিমকে আরও বড় করতে চাইছেন তাঁরা। সেইসঙ্গে বাইরে থেকে পুঁজি সংগ্রহের কথাও ভাবছেন তাঁরা।

ইওর স্টোরির মত

শপ-ইন-সিঙ্ক একটি সুনির্মীত অ্যাপ যা শপিং-কে আরও আনন্দদায়ক এবং উপভোগ্য করে তোলে, তবে পুরোটাই চ্যাটিং বা ফোনে কথোপকথনের মধ্য দিয়ে। এর সঙ্গে বিনোদনের কিছু বিষয় যেমন বিশেষ কোনও গেম যোগ করলে এই অ্যাপ আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে। নির্দিষ্ট মূল্যের কেনাকাটর পর রিডিমেবেল পয়েন্ট বা রিওয়ার্ড পয়েন্ট জাতীয় সুযোগ সুবিধাও দেওয়া যেতে পারে। কোনও ক্রেতার সুপারিশের ফলে যদি অন্য ক্রেতারা কোনও প্রোডাক্টের প্রতি আকৃষ্ট হন সেই বিষয়টি মনিটর করে ওই ক্রেতাকে বিশেষ ছাড় দেওয়া যেতে পারে।

এরই পাশাপাশি কোনও বিশেষ ইভেন্টের জন্য নির্দিষ্ট জিনিসপত্র কেনার জন্য বায়িং রেকমেন্ডেশন এবং একটি সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মও দিতে পারে শপ ইন সিঙ্ক। ধরা যাক, কোনও বাড়িতে রেনোভেশনের কাজ চলছে। বাড়ির ড্রয়িং রুমের জন্য হয়তো কী কিনতে হবে তা তাঁরা বুঝতে পারছেন না। সেক্ষেত্রে পরামর্শ দেওয়ার জন্য একটি বিশেষ ‘Did You Forget’ বিভাগ রাখতে পারলে মন্দ নয়।

শপ-ইন-সিঙ্ক টিমের গত এক দশক ধরে ভারতে এবং দেশের বাইরে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই জায়গা থেকে, এই অ্যাপ নিজেদের পরিষেবার মান এবং গ্রাহকসংখ্যা বৃদ্ধি করতে ঠিক কী স্ট্র্যাটেজি নেয়, এখন সেটাই দেখার।

লেখা : হর্ষিথ মালিয়া, অনুবাদ : বিদিশা ব্যনার্জী