বই—চিত্রময় উত্থান : শূন্য থেকে ‘সুহৃদ’

0

ওপার বাংলা থেকে কলকাতায় আসার পর একেবারে কপর্দকশূন্য অবস্থা। নিজেকে চেনানোর জন্য ফুটপাথই হয়ে উঠেছিল জীবন যুদ্ধের পথ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাস লাগোয়া একদা পথের ধারের ব্যবসায়ী এখন বছরে ১৫০-র বেশি বই প্রকাশ করেন। কয়েক কোটি টাকার ব্যবসা। কোয়েশ্চেন পেপার, সাজেশনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। বানিজ্য এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মতো পাঠ্য বইয়ে একচেটিয়া কারবার। এই উড়ানের নেপথ্যে রয়েছেন পরিমল দত্ত। সাম্রাজ্য এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজটা নিভৃতে করে চলেছেন তাঁর সন্তান পার্থপ্রতিম।


সুহৃদ পাবলিকেশন। কলেজ স্ট্রিট বইপাড়ায় টেক্সট বইয়ের জগতে এই প্রকাশনা সংস্থা এখন রীতিমতো জায়েন্ট। শৃঙ্গের এই দিকটা ঝলমলে হলেও সকালটা ছিল অন্যরকম। সময়টা ১৯৭৯ সাল। বাংলাদেশের ময়মনসিংহ থেকে বেলঘরিয়ায় চলে এসেছিলেন পরিমল দত্ত। প্রায় শূন্য হাতে আসা মানুষটির সম্বল বলতে ছিল মনের জোর আর অফুরন্ত ইচ্ছাশক্তি। চালচুলোহীন অবস্থায় ভেঙে না পড়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসের মেইন গেটের পাশে বই বিক্রি দিয়ে শুরু হয় অচেনা পথে হাঁটা। দিনে দোকান সামলানো, রাতে আইন নিয়ে পড়াশোনা। এরপর বাড়ি ফিরে আবার বই নিয়ে বসা। ঘুম যাতে পড়াশোনায় ব্যাঘাত না ঘটায় তার জন্য চোখের সামনে বাল্ব জ্বালিয়ে রাখতেন পরিমলবাবু। স্রোতের বিরুদ্ধে লড়ার ক্ষমতাটা বোধহয় এভাবেই পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। বই বিক্রিতে কমিশন আচমকা অনেকটা কমিয়ে দেওয়ায় প্রকাশকের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলেন পরিমলবাবু। এর জন্য জুটেছিল অপমান। তারপর থেকে পরিমল দত্ত প্রতিজ্ঞা করেছিলেন বই ছাপাবেন এবং নিজেই বই বিক্রি করবেন। সেই থেকেই তিনি প্রকাশক এবং বিপণনকারী।


জেদ নিয়ে শুরু হলেও প্রথম ধাক্কাটা ছিল সাংঘাতিক। প্রকাশনার তেমন জ্ঞান না থাকায় তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই ছিল বানান ভুলে ভরা। অন্যের থেকে চেয়ে-চিন্তে আনা পুরো টাকাটাই জলে। স্বপ্ন খানখান হয়ে যাওয়ার পরও মচকাননি ওই প্রকাশক। সুদে টাকা নিয়ে সাজেশনের বই প্রকাশ হল। আর পিছনে তাকাতে হয়নি। ১৯৮৪ সালে ‌সুহৃদ বুক স্টলের ব্যানারে বই ছাপার কাজ শুরু হল। প্রথমে সাজেশন এরপর টেক্সট বইয়ের ধীরে ধীলরে ঢুকে পড়ল এই প্রকাশনা সংস্থা। কলেবরও বাড়ল। সুহৃদ পাবলেকিশেন আত্মপ্রকাশ করল। আর এভাবেই একটার পর একটা লক্ষ্য থাকে সুহৃদ। বছরে অন্তত ১৫০ টাইটেল বের হয় এই প্রকাশনা থেকে। কলকাতা ও বারাসত রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত বিষয়ের সাজেশন এবং কোয়েশ্চেন পেপার বিক্রিতে সুহৃদ পাবিলেকশনের ধারে কাছে কেউ নেই। পাঠ্য বইয়ের জগতেও বড় জায়গা করে নিয়েছে। বাংলা ভাষায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বানিজ্য এবং সাংবাদিকতার বইয়ের বাজারের সিংহভাগই তাদের দখলে। এই কাজ নিপুণভাবে করার জন্য রাজ্য জুড়ে তাদের রয়েছে শতাধিক ভেন্ডার। শুধু কলেজ স্ট্রিটেই বই বিক্রির জন্য আছে চারটে কাউন্টার। আর এভাবেই সুহৃদ-এর হাত ধরে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে ২০ জনের। পরোক্ষেভাবে এই প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত অন্তত ১০০ জন।


প্রোডাকশন এবং মার্কেটিংয়ে যে কিছুটা খামতি রয়েছে তা মানেন পরিমলবাবুর ছেলে পার্থপ্রতিম। তরুণ এই উদ্যোগপতি ব্যবসাকে আরও আধুনিক করতে নিজেই বিপণনটা দেখেন। এই সম্পর্কে আরও জানতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ডের যৌথ উদ্যোগে বই প্রকাশনার ওপর আধুনিক কোর্স করেছেন। সমস্ত বইয়ে আইএসবিএন নম্বর বসেছে। নিজস্ব ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ক্রেতাদের আরও কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে সুহৃদ। অনলাইনে বিক্রিরও চিন্তাভাবনা রয়েছে তাদের। পরিমলবাবু যেমন প্রকাশনার খুঁটিনাটি দেখেন তেমন বিক্রি এবং বিপণনেও দাদার পাশে এগিয়ে এসেছেন ভাই অরিন্দম দত্ত। নতুন লেখক এবং ব্যবসার অন্যান্য দিকগুলো দেখেন পার্থপ্রতিম। পার্থপ্রতিমের কথায়, ‘‘আমরা প্রতিদ্বন্দ্বীদের নিয়ে বেশি ভাবি না। ‌কীভাবে আরও ভাল বই করা যাবে এবং সেটা যাতে পড়ুয়াদের উপযোগী হয় সেটাই আমাদের লক্ষ্য।’’ আর এভাবেই হয়তো পাঠকদের কাছে সত্যিকারের ‘সুহৃদ’ হতে চায় কলেজ স্ট্রিটের এই ক্রমবর্ধমান প্রকাশনা সংস্থা।

Related Stories