বসিরহাট-বারাসত-বাগুইআটি, এগোচ্ছেন সুদীপ

0

সুদীপ চ্যাটার্জি, বাংলার ক্রিকেটের নতুন তারা। ঘরোয়া ক্রিকেটে সাফল্য দিয়ে শুরু হয়ে ব্যর্থতার গ্লানিতে বাংলা ছিটকে গিয়েছে দেওধর ট্রফি থেকে, রঞ্জি ট্রফি থেকে। সৈয়দ মুস্তাক টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট থেকেও ফাইনালে পৌছানোর আগেই বিদায় নিয়েছে বাংলা। কিন্তু ক্রিকেটের এই দুর্যোগের মরসুমেও বাংলার সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক, ওপেনিং ব্যাটসম্যান সুদীপ চ্যাটার্জী। যার পুরষ্কার সুদীপ পেয়ে গিয়েছেন। ভারত ‘এ’ দলে সুযোগ পেয়েছেন লড়াকু ছেলেটা। কিন্তু সুদীপের মধ্যে কোনও আত্মতৃপ্তি নেই। কারণ তিনি বারাসাতের নবপল্লীর কথা ভোলেননি। 

হ্যাঁ নবপল্লী। এই পাড়ার ভিতরের এঁদো গলির সবচেয়ে পেছনে জঞ্জাল ফেলার জায়গা লাগোয়া একতলা বাড়িটায় থাকতেন সুদীপ। দশ ফুট বাই দশ ফুটের দুটো ঘর। যেখানে আলোর ঢোকা মানা। জানলা খুললে ঘর ভর্তি হয়ে যায় নোংরা গন্ধে। সেই ঘরেই সুদীপ সৌরভ হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

সুদীপের মা সেলাই মেশিনে ব্লাউজ বানাতেন আর সুদীপের বাবা সেই ব্লাউজ নিয়ে নবপল্লীর দোকানগুলোয় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন। সারাদিনে কত ব্লাউজ বিক্রি হতো? সুদীপ বললেন,“বলতে পারব না। কিন্তু আমি যখন দুপুরে প্র্যাকটিস সেরে বাড়ি ফিরতাম, দেখতাম বাবাও মলিন বিষণ্ণ একটা মুখ নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। ঘন্টাখানেক একটু বিশ্রাম নিয়ে আবার বেরিয়ে পরতেন ফেরি করতে।”

সুদীপ বলছিলেন ওরা আসলে বারাসতেরও নন। থাকতেন বসিরহাটে। সেখানে মোটের ওপর ভালোই ছিল বাবার পসার। কিন্ত ওই যে সুদীপকে পেছনের সারিতে ফেলে রাখতে চাননি, একদিন ক্রিকেটের ব্যাট হাতে ছেলে ইনিংসটা ওপেন করবেন এই স্বপ্নই সুদীপের বাবাকে বসিরহাট থেকে তাড়িয়ে এনেছিল কলকাতার কাছাকাছি বারাসতে। বসিরহাটে কোনও ভাল ক্রিকেট শেখার ক্যাম্প ছিল না। তাই বসিরহাটের নিশ্চিত জীবন ছেড়ে বারাসাত নবপল্লীর অনিশ্চিত জীবনও ঠিক আছে। সাংঘাতিক সিদ্ধান্ত। বড় ঝুঁকি। ধাক্কাও কম খাননি। কিন্তু ওই যে NO RISK NO GAIN প্রবাদ। ব্লাউজের ফেরিওয়ালা বাবা সুদীপের জীবনে স্বপ্ন ফেরি করতেন রোজ। সমস্ত লাঞ্ছনা, সমস্ত প্রশ্নের ক্রিকেটের ব্যাটেই জবাব দিতে চেয়েছিল ছেলেটা। 

সুদীপের গলা ধরে আসছিল তার বাবা মার কথা বলতে গিয়ে। আট বছর আগে, বারাসাতে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের কোচিং ক্যাম্পে হাতেখড়ি হওয়ার সময় সুদীপ মনে মনে শপথ নিয়েছিলেন দিন বদল তিনি করবেনই। যে কারনে কোচিং ক্যাম্পের মাঠে সাধারণ কেডস জুতো পরে ফিল্ডিং আর রানিং-বিটুইন-দ্য-উইকেটের সময় হাজার বার আছাড় খাওয়া সত্ত্বেও সুদীপ হতাশ হননি। তার ছিল ভবিষ্যতের যুদ্ধ জয়ের চ্যালেঞ্জ।

গত বছর অনূর্ধ্ব ১৭ ভারতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার পর থেকেই বদলটা দেখতে পান সুদীপ। তারপর অনূর্ধ্ব ১৯ ভারতীয় দলের হয়েও গতবছর চারটে টুর্নামেন্টে তার তিনটি শতরান আর গোটা পাঁচেক অর্ধশতরান। একটু একটু করে পরিস্থিতি বদলে দিতে শুরু করে। ভারতীয় এ দলে তার সুযোগ পাওয়া তারই প্রতিফলন।

আঁধার কেটে গিয়েছে। শুধু খেলার সুবাদে সুদীপ চ্যাটার্জি মেট্রো রেলে চাকরিও পেয়েছেন। গত বছরের শেষ দিকেই। বাগুইআটিতে একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটও কিনেছেন। আর বারাসাতের নবপল্লী? সেখানে এখনও সুদীপের বাবা মা থাকেন। বলছিলেন, “ওখানে বাবা অনেক কষ্ট করে ব্লাউজ বিক্রির একটা বাজার তৈরি করেছেন, এত বছরে। তাই এখনই ওখান থেকে বাবা মাকে বাগুইআটির ফ্ল্যাটে নিয়ে আসিনি। ওরা যাতায়াত করেন।” 

সুদীপের সাম্প্রতিক স্বপ্ন প্রথমে রঞ্জি ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়া। গত ছাব্বিশ বছর ধরে বাংলার যা অধরা। তারপর তাঁর ব্যাক্তিগত একটা লক্ষ্য আছে, সিনিয়র ভারতীয় দলের জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একটা জায়গা করা। বাংলার প্রাক্তন অধিনায়ক সম্বরন বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, “সুদীপের সবচেয়ে বড় গুণ হল ওঁর একাগ্রতা। একটা শটকে রপ্ত করার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই করে যাওয়া।” এই লড়াই সুদীপের চলে মাঝরাত পর্যন্ত। বাগুইআটির ফ্ল্যাটে লাগিয়েছেন একটি বড় আয়না। রাতে সেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সুদীপ শ্যাডো করেন। হাজার, দেড় হাজার। বললেন, “সচিন তেন্ডুলকার সম্পর্কে লেখায় পড়েছি উনি ক্রিকেটের বাইরে কিছু ভাবতে পারতেন না। আমারও একই রকম মানসিকতা।”

-কিন্তু আপনার আরও একটা ইচ্ছার কথা তো বললেন না! সুদীপ হাসলেন, বললেন, “হ্যা, একটা গাড়ি কেনার ইচ্ছা আছে, বাবা আর মায়ের জন্য। বারাসাত থেকে বাগুইআটি যাতায়াত করার জন্য।”

Related Stories

লক্ষ্মীর লড়াই সাহস দেবে স্টার্টআপদের

“রোজ সকালে উঠে আয়নায় নিজের চোখে চোখ রেখে তাকানোর সাহস আমার আছে।”– কেরিয়ারের বিভিন্ন প‌র্যায়ে বঞ্চনার প্রশ্নে এভাবেই আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন লক্ষ্মীরতন শুক্লা।