'স্বপ্ন' একটা ছোঁয়াচে ব্যামো, প্রমাণ দিল আর্ট মিকাডো

0

আকাশের যে ঠিক কী রঙ, সুস্থির ভাবে দেখার সুযোগ পেত না বছর উনিশের ছেলেটা। চারদেওয়ালে আটকে থাকতে থাকতে কখনও সখনও আকাশ দেখে ফেললেই মনে হত উড়ে যাই। আলিপুর সেন্ট্রাল জেলের পরিবেশ এখন অনেক বদলেছে। তবু মুক্ত পৃথিবীর রূপ ওঁকে টানত। স্বাধীনতার মিক্সড মিডিয়া ওর চোখের সামনে মায়ামৃগীর মত হাতছানি দিত। অ্যাক্রেলিক-চারকোল-তেল-প্যাস্টেল-জল রঙের কলরব ওর স্নায়ুতে এমন ভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে রঙ নিয়ে বেঁচে থাকতেই বেশি ভালো লাগত ওঁর। কিন্তু ওঁর এই বেঁচে থাকাকে আরও সুন্দর আরও আকর্ষক করে তুলেছে একটি স্টার্টআপ। গরাদ আর কঠিন চার দেওয়ালের বাইরের গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা রসিক মহলের কাছে এই স্টার্টআপটিই পৌঁছে দিয়েছে ওই শিল্পীকে। ওর ছবি আন্তর্জাতিক বাজারে মোটা টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ওই সংস্থা ওকে চার দেওয়ালের ভিতর বন্দি হয়েও মুক্ত আকাশে উড়তে শিখিয়েছে। বড় শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে। শুধু ওঁকে নয় এঁদের ছোঁয়ায় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে সেন্ট্রাল জেলের কয়েকশো বন্দি। এই কাহিনি ওই ছেলেটিকে নিয়ে নয়। বা অন্য বন্দিদের নিয়েও নয়। বরং ওই স্টার্টআপটিকে নিয়ে। যার নাম আর্ট মিকাডো।

এই উদ্যোগের পিছনে রয়েছেন কলকাতার দুই উদ্যোগপতি- শিতিজ ঘখর, ঋষি জৈন। শিল্পের সঙ্গে ওঁদের যোগাযোগও একটা অ্যাক্সিডেন্ট। আর্ট মিকাডোর প্রতিষ্ঠাতা শিতিজ ইংল্যান্ডে ফিনান্স নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। এমএসসি-ও করেছেন সেখানে। দেশে ফিরে প্রজেক্ট ফিনান্সে কাজ শুরু করেন। তবে মন টিকছিল না। নতুন কিছু করতে চাইছিলেন। ২০১২-য় শিল্পের ব্যবসা নিয়ে রীতিমতো মার্কেট রিসার্চ শুরু করে দেন তিনি। ২০১৪ সালে চিন্তা করেন এমন একটি ওয়েবসাইট তৈরি করবেন যেটা বিভিন্ন ধরণের শিল্পসামগ্রী বিক্রির প্লাটফর্ম করে দেবে। পাশে পেলেন ফিনান্স পেশার আরেক বন্ধু ঋষি জৈনকে। এভাবেই তৈরি হয় স্টার্টআপ। প্রকাশিত হয় ওয়েবসাইট আর্ট মিকাডো ডট কম। তবে শুরুতেই নতুন কিছু করার কথা ভেবেছিলেন দুই উদ্যোগপতি। সেই কাজের সূত্রেই ফ্লাইট টু হারমোনি ফাউন্ডেশন নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে পরিচয়। এই সংস্থার প্রধান চিত্ত দে, নিজে একজন ভাস্কর। শিতিজ আর ঋষিকে আলিপুর কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারের শিল্পীদের কথা বলেন তিনিই। চিত্ত দে নিজেও বহুবার আঁকা শিখিয়েছেন সংশোধনাগারের বন্দিদের। চিত্ত বাবুর পথ অনুসরণ করেই আর্ট মিকাডো ডট কমে শুরু হয়, হোপ থ্রু আর্ট সেগমেন্টের। এই সেগমেন্টেই থাকছে, বন্দিদের আঁকা পেইন্টিং, ড্রইং এবং আর্ট অন ডিমান্ড। 

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, আলিপুর সংশোধনাগারেই যাত্রা শুরু হয় এই ওয়েবসাইটের। সংশোধনাগারের বন্দিদের আঁকা শিল্পের যথেষ্ট অবদান রয়েছে এই ওয়েবসাইটে। তাও শিতিজ বাবু বন্দিদের কাজকে রেখেছেন কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটির আওতায়। শিতিজ বলেন, ওদের কাজের পুরো টাকাটাই যায় প্রিজনার ওয়েলফেয়ার ফান্ডে। তবে মুনাফা নয়, ওদের আর একটা সেকেন্ড চান্স দেওয়াই লক্ষ্য আর্ট মিকাডোর। প্রথম দিনেই বিক্রি হয়েছে প্রায় সত্তরটিরই বেশি ছবি।

বন্দি নয়, সাধারণ শিল্পীদেরও অনলাইনে শিল্প বিক্রির সুযোগ রয়েছে আর্ট মিকাডোয়। রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে তাঁরা সকলের কাছে তুলে ধরতে পারবেন নিজেদের আর্ট ওয়ার্ক। মূলত ইয়ং জেনারেশনের আর্ট ফর্মই তুলে ধরতে চাইছেন ওঁরা। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও যাবে সেই ছবি। পেইন্টিং ড্রইং কিংবা আর্ট ফর্ম, শিল্পীদের নানা কাজ পরীক্ষার জন্য তাদের কাছে যাবে আর্ট মিকাডোর পাঁচ সদস্যের একটি শিল্পী দল। তাঁরা সায় দিলেই, অনলাইনে বিক্রি হবে শিল্পীদের হাতের আঁকা। সেক্ষেত্রে কিছু মুনাফা থাকবে উদ্যোগপতিদের হাতে। বন্দি শিল্পী থেকে শুরু করে নতুন উঠতি শিল্পীদেরও আন্তর্জাতিক খ্যাতির স্বপ্ন দেখাচ্ছে আর্ট মিকাডো। 

আর ফিনান্স গ্রহের কি হবে! শিতিজ, ঋষি এক সঙ্গে বলে ওঠেন, কলকাতা হল কালচার হাব। সংস্কৃতিই প্রোডাক্ট। বেচতে পারলে এতেই ব্যবসা এতেই ফিনান্স।

Related Stories