ভাইফোঁটার মিষ্টিসুখের ই-ঠিকানা

0

দুয়ারে ভাইফোঁটা। ভাইকে নতুন কোনও মিষ্টি খাইয়ে চমকে দিতে চান দিদি। সেটা যদি চন্দননগরের ‘সূর্য মোদক’ বা রিষড়ার ‘ফেলু মোদক’-এর জলভরা তালশাঁস হয় তো ব্যাপারই আলাদা। কিন্তু যারা ওই এলাকায় থাকেন না তাদের কী হবে। সেই ব্যবস্থাও তৈরি। মাউসের ক্লিকেই ঘরে বসে পেয়ে যাবেন জলভরা, সরভাজা, চমচম। পছন্দসই মিষ্টি পাঠিয়ে দিতে পারেন প্রিয়জনকেও। ১২০ রকমের মিষ্টির সম্ভার। সাবেকি জলভরা আছেই, সঙ্গে আবার খাবো, রাজনন্দিনী বা বিভিন্ন ফল দিয়ে নানা মিষ্টি অনেকেরই কৌতূহল মেটানোর জন্য তৈরি।

শীত আসব, আসব করছে। তার মধ্যেই ভাইফোঁটা। মিষ্টির কামড়ে নলেন গুড়ের স্বাদ পেলে আর কি চাই। নলেন গুড়ের সন্দেশও হাজির ভাইফোঁটায়। সারা বছর সংরক্ষণ করে অসময়ে নলেন গুড়ের সন্দেশ খাওয়ানোর পিছনে রয়েছেন রিষড়ার মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী অমিতাভ দে। শতাব্দীপ্রাচীন জনপ্রিয় ‘ফেলু মোদক’-এর মালিক অমিতাভবাবু। তাঁদের এই নিজস্ব ঘরানার মিষ্টি যাতে বহু মানুষ পেতে পারেন তার জন্য অনলাইনে বিক্রির ব্যবস্থা করেছেন। যারা একটু ভাল মিষ্টির খোঁজ করেন, তারা ‘ফেলু মোদক’ ওয়েবসাইটে ঢুকলেই পেয়ে যাবেন অনেক অজানা স্বাদের ঠিকানা। একশোর ওপর মিষ্টি রয়েছে এই সম্ভারে। সঙ্গে দেওয়া আছে দাম। অনলাইনে অর্ডার দিলেই নির্দিষ্ট সময়ে ডাক যোগে বাড়িতে চলে আসবে মিষ্টান্ন। এ যেন ভূতের রাজার বরে গুপি বাঘার আকাশ থেকে মিষ্টিবৃষ্টির সিকোয়েন্স। নানা রকমের মিঠাইয়ের পাশাপাশি বিয়ের তত্বের মিষ্টিও পাওয়া যাচ্ছে। অনলাইনের পাশাপাশি অফলাইনেও প্রচুর বিক্রি এই দোকানে। দুর্গাপুজো থেকে যে ভিড় চলছিল ভাইফোঁটায় গিয়ে তা হুড়োহুড়ির চেহারা নেবে। মিষ্টি বিক্রিতে যেমন আধুনিকতা এসেছে, তেমন মিষ্টি তৈরিতেও এসেছে প্রযুক্তির ছোঁয়া।

রিষড়া থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে চন্দননগরের মিষ্টিসুখের ঠিকানা বারাসত এলাকার ‘সূর্য মোদক’-এর দোকান। জলভরা সন্দেশের আবিষ্কারক এই ‘‌সূর্য মোদক’। তাঁর নামেই দোকান। উত্তরসূরী শৈবাল মোদক জলভরা সন্দেশে আরও বৈচিত্র্য এনেছেন। অন্তত চার-পাঁচ রকমের জলভরা মেলে সূর্য মোদকের দোকানে। প্রথম জলভরার কাঠের ছাঁচ সূর্য মোদকের নাতি ললিতচন্দ্র তৈরি করেছিলেন। ওই বংশের পঞ্চম প্রজন্ম শৈবালের কাছে যত্নে রয়েছে মিষ্টির জগতকে চমকে দেওয়া ওই ছাঁচ। জলভ‌রার পাশাপাশি আম, আনারস, আঙুর, স্ট্রবেরি দিয়ে নানারকম মিষ্টি হচ্ছে এখানে। দোকানের মালিক শৈবালবাবুর কথায় এখন ফিউশনেরও ভাল চাহিদা রয়েছে। সূর্য মোদকের দোকানে মতিচূড়, ক্ষীরপুলি, রাজনন্দিনীর মতো সাবেকি মিষ্টিরও যথেষ্ট ভাল চাহিদা। অনলাইনেও তাঁরা মিষ্টির অর্ডার নেওয়া শুরু করেছেন।

নিত্যনতুন মিষ্টির খোঁজে রীতিমতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান শৈবালবাবু। যার জন্য ক্রিম, ক্যাডবেরিও জুড়েছে ছানার, খোয়া ক্ষীরের সঙ্গে। শৈবাল মোদকের মেয়ে এমটেক পাশ করে চাকরির পথ ধরেননি। বাবার ব্যবসাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে তিনি পুরোদমে রয়েছেন। মিষ্টির অনলাইন ব্যবসাকে আরও প্রসারিত করতে চেষ্টা করছেন সূর্য মোদকের বর্তমান প্রজন্ম। এরজন্য প্রথম সারির বেশ কিছু সংস্থার সঙ্গে তারা কথাও বলেছে।

বিশ্বকাপ ফুটবল থে‌কে ক্রিকেট বা রাজনীতি। সাম্প্রতিক বিষয়গুলিতেও তাদের সম্ভার নিয়ে জড়িয়ে পড়ে হুগলির এই দুই বিখ্যাত মিষ্টির ঠিকানা। বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় নানা দেশের আদলে মিষ্টি হয় এই দোকানগুলিতে। নির্বাচন উপলক্ষ্যেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতীক দিয়ে রসগোল্লা, সন্দেশও বিক্রি হয় ভাল। গত অক্টোবর মাসে কলকাতায় এসেছিলেন পেলে। ফুটবল সম্রাটের জন্য এক অভিনব উপহার ছিল এবার। ফেলু মোদকের দোকান থেকে মিষ্টিতে পেলের প্রতিকৃতি বানানো হয়। দে পরিবারের তরফে পেলের হাতে ওই মিষ্টি তুলে দেওয়া হয়েছিল।

কলকাতায় যে জলভরা পাওয়া যায়, তা আসলে নামেই জলভরা বলে কথা শোনায় চন্দননগর। তার কারণও আছে। কলকাতার জলভরায় থাকে নলেন গুড় বা চকোলটের কেরামতি। সূর্য মোদকের জলভরার প্রাণভোমরা চিনির রস ও গোলাপ জলে ভরপুর। ‘সূর্য মোদক’-এর জমানার স্বাদ ধরে রাখতে এখনও গোলাপ জল আসে কনৌজ থেকে। ১৩০ বছর আগে জামাই বাবাজিকে চমকে দিতেই জলভরা সন্দেশের অর্ডার দিয়েছিলেন ভদ্রেশ্বরের তেলেনিপাড়ার এক জমিদারগিন্নি। যে সৃষ্টি নিয়ে কৌতুহল এখনও এতটুকু কমেনি।

Related Stories