নিও নন, কলকাতার অভিষেকের মেট্রিক্স ঊর্ধ্বগামী

3

সিকিউরিটি এই শব্দটির নতুন মানে শিখেছিলাম বাণিজ্য সাংবাদিকতা করতে এসে। আজ থেকে প্রায় কুড়ি বছর আগের কথা। তখন আমরা ওয়ার্ডস্টার, লোটাসে লিখতাম। কালো স্ক্রিন। সাদা অক্ষর। ব্যাকরণ শুধরে দেওয়ার কোনও রাইট ক্লিক অপশন ছিল না। একটি মাত্র মেশিনে ছিল মাইক্রোসফট উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম। সবে উইন্ডোজ ৯৮ বেরিয়েছে। সে ছিল কঠিন নিউজ রুম। নিয়ত পরীক্ষা দিতে হত। এক সিনিয়র দাদা আমায় তৈরি করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ব্যবসা বাণিজ্যের নানান টার্ম টার্মিনোলজি শেখানোর দায়িত্ব। আমি ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। ফলে অ্যাব্রামসের লিটেরারি টার্মস নেড়ে চেড়ে দেখার অনন্য সুন্দর অভিজ্ঞতা হয়েছে। তার সঙ্গে এর কোনও তুলনাই চলে না। তেতো ওষুধের মত গিলতে হত কমার্শিয়াল অ্যাব্রিভিয়েশনগুলো। শুরুয়াতি রিপোর্টার। আমাদের অবশ্য কর্তব্য ছিল গোলাপি নিউজ প্রিন্ট পড়া আর মেজদা মার্কা ওই তিরিক্ষি মেজাজের দাদার একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দেওয়া। দৈনিক কুইজ কনটেস্ট। কিন্তু যত এগিয়েছি দারুণ মজা এখানেও পেয়েছি। একবার দুপুরে অফিসে বসে আছি। তুমুল তাচ্ছিল্যের ফাঁকে সেদিন আমাকে বললেন একবার যেন অবশ্যই ন্যাশনাল সিকিউরিটি ডিপোজিটরি লিমিটেডের দফতর থেকে ঘুরে আসি। গেলাম। সেখানে শিখলাম সিকিউরিটির অন্য মানে। শেয়ার বাজার, ডেইলি ট্রেডিংয়ের মগজমারি, আর সিকিউরিটি, লিক্যুইডিটির, অদ্রব পরিভাষা দ্রবীভূত হয়ে গেল।

১৯৯৯ সাল। কম্পিউটার সিকিউরিটির প্রশ্নটা খবরের কাগজের শিরোনামে উঠে আসছিল। ডট কম ক্র্যাশ হয়ে গেছে তত দিনে। ১৯৯৫ এ বেরিয়ে গিয়েছে হ্যাকারদের নিয়ে হলিউড মুভি হ্যাকার্স, দ্য নেট। ১৯৮২ সালে তৈরি হয়েছে হ্যাকিং নিয়ে ট্রন। হ্যাকিংয়ের ভীতিতে সন্ত্রস্ত হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ১৯৯৯, সেই সাল যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন একশ ছেচল্লিশ কোটি ডলারের একটি সিকিউরিটি প্ল্যান ঘোষণা করছেন। শুধু পেন্টাগন নয়, গোটা আমেরিকার কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাক হতে পারে এই আতঙ্কে উদ্বিগ্ন প্রেসিডেন্ট তখন হাতড়াচ্ছিলেন একটি রক্ষা কবচ।

ইরাক নয়। ওসামা বিন লাদেনও নয়। ক্লিনটন দেখেছিলেন হ্যাকারের ভূত। আমেরিকার রাষ্ট্রীয় কম্পিউটারের সিকিউরিটি হ্যাক হয়ে যেতে পারে এই ভয় পেয়েছিল এফবিআই। জোড়া টাওয়ারে যেদিন প্লেন ভাঙল। গোটা দুনিয়া শিখল সিকিউরিটির আরও একটি মানে। কিভাবে নিরাপত্তার বলয়ের ভিতর ফিল্মি কায়দায় ঢুঁ মেরেছিল সন্ত্রাসীদের চপার। কীভাবে আতঙ্কে নীল হয়ে গিয়েছিল দুনিয়ার সব থেকে শক্তিশালী রাষ্ট্রের মুখ। তারপর ভুবন ডাঙায় বুশের হুঙ্কার। গালফ ওয়ার পার্ট টু। সাদ্দামের লুকিয়ে পড়া। সেখান থেকে হিড়হিড় করে বের করে আনা। লাদেনের ডেরায় সার্জিকাল স্ট্রাইক। সবই তো হ্যাকিংয়েরই গল্প।

হ্যাকিং তো কোনও নতুন বিষয় ছিল না। নিরাপত্তা তছরুপের সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে। ইতিহাসের প্রতিটি ষড়যন্ত্রের পিছনে ছিল হ্যাকিং। সে যেমন প্রতিটি যুদ্ধের প্রধান খলনায়ক। তেমনি একজন নায়কও আসলে হ্যাকার। হলিউডে যখন ম্যাট্রিক্স তৈরি হল। ভেসে উঠল ছদ্ম আধ্যাত্মিকতার মোড়কে নীতিবাগীশ হ্যাকারের মুখ। পপকর্ন চিবোতে চিবোতে আমরা সবাই তার জয় চাইছিলাম। মনে মনে নায়ক নিও আমাদের নিহিত সত্ত্বায় উপস্থিত। যার কাছে গোটা দুনিয়াটা ডিকোডেড।

আমার সঙ্গে সেদিন আলাপ হল অভিষেকের। অভিষেক মিত্র। তিনি নিও নন। তবে ডিকোড করে ফেলেছেন অনেক কিছুই। নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করতে ইসলামাবাদ বিমান বন্দরের সাইবার সিকিউরিটি সিস্টেম হ্যাক করে রীতিমত সার্জিকাল স্ট্রাইক করেছেন। সেই ভিডিও ফেসবুকে আপলোড করে দুনিয়াকে দেখিয়েও দিয়েছেন। ওদের লুকোছাপার কিছু নেই। এ ছিল পাকিস্তানের হ্যাকারদের করা একটি হ্যাকিংয়ের জবাব। একাজ তো অবৈধ! অনুচিত! তাইবলে একটুও অনুশোচনা নেই শান্ত স্বভাবের স্নিগ্ধ ছেলেটির। বরং অভিষেক বলছিলেন তিনি এবং তার টিম নাকি গর্বিত। শুনতে শুনতে তাজ্জব লাগছিল। তবে কখনও কারও অনিষ্ট করার জন্যে হ্যাকিংটা করেন না ওরা।

অভিষেক মার্কেটিং ম্যানেজমেন্টের ছেলে। এখন কলকাতায় থাকেন। পুরুলিয়ায় বাড়ি। সেখানেই পড়াশুনো। এমবিএ করেছেন। হ্যাকিংয়ের দুনিয়ার সঙ্গে কাজের সূত্রে প্রথম আলাপ। ইননোবাজ এবং মাইন্ডরাশ টেকনোলজিতে মার্কেটিংয়ের কাজ করতে করতে আগ্রহ তৈরি হয় হ্যাকিংয়ে। শিখে ফেলেন হ্যাকিংয়ের অআকখ। তারপর কাজের সূত্রেই ২০১৩ সালে আলাপ হয় সন্দীপ সেনগুপ্তর সঙ্গে। স্কুল অব এথিকাল হ্যাকিং সবে তৈরি হচ্ছে তখন। সেখানে মার্কেটিংয়ের কাজ করেন বছর দুয়েক। সেটা করতে করতেই মাথায় ঘোরে নিজের ব্যবসা করার পরিকল্পনা। আলাপ হয় সমীরণের সঙ্গে। সমীরণ মার্কেটিংয়ে বিশারদ নন। তিনি আদ্যন্ত টেকি। এথিকাল হ্যাকার। দুজনেই মনে করেন, ভারতে সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে অনেক ধরণের কাজ করা যায়। এবং তার একটা দুর্দান্ত বাজারও আছে। ফলে নেমে পড়েন বিভিন্ন সংস্থার ডেটা সিকিউরিটির দেখভাল করার কাজে। এভাবেই তৈরি হয় ওদের সংস্থা ইন্ডিয়ান সাইবার সিকিউরিটি সলিউশন ডটকম। বিভিন্ন ভাইরাস অ্যাটাক, ব়্যানসমঅ্যয়ার অ্যাটাক থেকে তাদের ক্লায়েন্টদের রক্ষা করতে সদা ব্যস্ত এই সংস্থা ইতিমধ্যেই পেয়ে গিয়েছে সাতাশ হাজার এক সার্টিফিকেশন। 

পাশাপাশি চলছে এথিকাল হ্যাকার তৈরির স্কুলও। সল্টলেকে তৈরি হয়েছে ক্লাসরুম। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে সেখানে। যারা এথিকাল হ্যাকিংয়ের কোর্স করছেন তাদের দেওয়া হচ্ছে সিইএইচ ভার্শন নাইন সার্টিফিকেট। সঙ্গে থাকছে ওদের নিজস্ব সার্টিফিকেশনের ব্যবস্থা। কলকাতা পুলিশ ওদের ক্লায়েন্ট। তাছাড়া কলকাতার একগুচ্ছ স্টার্টআপের সঙ্গে কাজ করছে এই সংস্থা। ভুটান টেলিকমের সিকিউরিটি সামলাচ্ছেন ওরা। সিঙ্গাপুরের একটি সংস্থার ডেটা সিকিউরিটির দায়িত্ব পেয়েছেন সম্প্রতি।

কলকাতার অভিষেক ওদের পরিষেবা নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছেন দুনিয়ার অন্য প্রান্তেও। থিম্পুতে শুরু হতে চলেছে ওদের শাখা। একই রকমভাবে নাইজেরিয়ার লাগোসেও ব্যবসা করবেন অভিষেক মিত্র। ক্লায়েন্টের ডেটা সিকিউরিটি দেবেন রোগাটে গড়নের এই বঙ্গ সন্তান আর তার অতি দক্ষ টিম।