শ্রী পদ্ধতিতে ধানচাষে সুন্দরবনে ‘শ্রী’বৃদ্ধি

0

প্রথাগত ধানচাষের তুলনায় বীজ অনেক কম লাগে। জল, সার, অনুখাদ্য, কৃষি শ্রমিকের ব্যবহারও বেশ কম। বেশি দূরত্বে বপনের জন্য পোকামাকড়ের উপদ্রব কার্যত নেই। গাছ বাড়েও দ্রুত। ফলনও বেশি। ফসলও খানিকটা আগে ওঠে। খড়ও প্রচুর মেলে। পাওনার ঝুলি উপচে পড়ায় এখন আধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর শ্রী পদ্ধতিতে চাষকেই ধীরে ধীরে আপন করে নিয়েছেন ক্যানিং মহকুমার ধানচাষিরা। শুরুর দিকে একটু জড়তা থাকলেও শ্রীর সুফলে চাষিদের সংসারে শ্রী এসেছে। সরকারি প্রশিক্ষণের দৌলতে মহিলারাও নেমে পড়েছেন জমিতে।


বর্ষার শুরুর ক্ষত এখনও ক্যানিং মহকুমার বিভিন্ন জায়গায়। কোথাও অতিবৃষ্টিতে চাষই করা যায়নি। উঁচু জমিতে আবার জলের অপেক্ষায় গোটা মরসুমই নষ্ট হয়েছে। তার মধ্যেও যারা প্রথাগত চাষের বাইরে শ্রী পদ্ধতিতে চাষ করেছিলেন, মরসুম শেষে তারা এখন অনেকটাই সফল। সুন্দরবনের এই এলাকা মূলত লবণাক্ত। জমিগুলি সাধারণত দু’ফসলি। কিন্তু প্রথমে ভারী বর্ষণ, পরে অনাবৃষ্টিতে সাধারণভাবে চাষের অনেকটা ক্ষতি হয়ে গেলেও শ্রী চাষের সুবাদে ফ্যাকাসে ছবিটা অনেকটা বদলেছে। মাতলা ২, ইটখোলা, নিকারিঘাটা, দিঘিরপাড় অঞ্চলে এই পদ্ধতিতে ধান চাষের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ওই ব্লকের কৃ ষি প্রযুক্তি সহায়ক ঊষারানি মালের কথায়, ‘‘২০০৯ সালে যখন শ্রী পদ্ধতিতে চাষের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি তখন তেমন সাড়া পাইনি। পরে চাষিরা বুঝতে পারেন দুর্যোগের মধ্যে পড়লেও এই আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর চাষই তাদের বাঁচাবে। তাই এখন চাষের আগ্রহ বাড়ছে। শুধু মাতলা এলাকাতেই এক হেক্টর জমিতে এবছর শ্রী পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে।’’

শ্রী কেন আপন


শ্রী পদ্ধতিতে চাষ বীজ ধান অনেক কম লাগে। দশ ইঞ্চি বাই দশ ইঞ্চি দূরত্বে বীজ ফেলার জন্য পোকার দাপটও অনেক কমে যায়। এর ফলে শিকড়ও অনেকটা গভীরে যেতে পারে। যার ফলে গাছের ফলন অনেকটাই বেড়ে যায়। সাধারণ চাষে যেখানে বিঘেতে এই এলাকায় ১৮-২০ মণ ধান হয়, সেখানে শ্রী-র সুবাদে ফলন হচ্ছে ২৭-২৮ মণ। বেশি ধান যেমন, তেমন বেশি খড়ও। খড় বেশি হওয়ায় ভালই লাভ পান চাষিরা। এই পদ্ধতিতে চাষের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মার্কার এবং ক‌নুইডার যন্ত্রের ভূমিকা। মার্কার ঠিক করে দেয় কত দূরত্ব৮ অন্তর বীজতলা বসবে আর কনুইডারের সাহায্যে জমির আগাছা পরিষ্কার হয়। মেশিনের ব্যবহারের জন্য শ্রমিক খরচও অনেকটা কমেছে। যন্ত্রপাতি কেনার ব্যাপারে চাষিরা সরকারি সাহায্য পান। পাশাপাশি কৃষি প্রযুক্তি সহায়করা মাঠে গিয়ে হাতকলমে চাষিদের চাষের পদ্ধতিগুলি বুঝিয়ে দেন।


শ্রী পদ্ধতিতে চাষ করে ভাল সাড়া ফেলে দিয়েছেন মাতলা ২ এর চাষি দীপেন্দ্রনাথ মণ্ডল। তাঁকে দেখে ওই এলাকার বহু চাষির সংসারে শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে। এবার বেশি বৃষ্টিতে অনেকেই সমস্যায় পড়লেও শ্রী পদ্ধতিতে চাষের মাধ্যমে ক্ষতি টের পাননি নিকারিঘাটার গোবিন্দ ভুঁইয়া। চাষিদের বক্তব্য, এই পদ্ধতিতে চাষে সুবিধা হলেও প্রথম দিকে একটু ইতস্ততবোধ ছিল। তারা মনে করেন যন্ত্রের ব্যবহার আরও একটু ভালভাবে শিখে গেলে আরও ভাল চাষ হবে। শুধু পুরুষরা নয়, এই চাষে মহিলারাও ভূমিকা নিয়েছেন। ধানের চারা রোয়ানো, ফসল কাটা, বীজ বাছাই, বীজ শোধন, সার প্রয়োগ। পুরুষদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করছেন মহিলারা। এলাকার বাসিন্দা অশোক পাত্রর কথায়, ‘‘বিজ্ঞানসম্মতভাবে শ্রী পদ্ধতিতে চাষ ‌শুরু হয়েছে। এর ফলে হেক্টর প্রতি উত্পাদন অনেকটাই বেড়েছে। পিছিয়ে পড়া এলাকায় এই ধরনের ধানচাষের পদ্ধতি চাষিদের পরিবারে শ্রী এনেছে।’’ সুন্দরবনের নোনা এলাকায় ধান চাষ মানে যে অলাভজনক ব্যাপারটা ছিল সেই ধারণাটা নিঃশব্দে বদলে দিচ্ছে শ্রী পদ্ধতিতে চাষ।