স্টার্টআপ-দের আঁতুড় হবে ভারত, জেনে নিন ১৬টি কারণ

0

বছর শেষের ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জানালেন, জানুয়ারিতেই ‘স্টার্ট আপ ইন্ডিয়া, স্ট্যান্ড আপ ইন্ডিয়া’ র রহস্য উদঘাটিত হবে, তরুণ তুর্কিদের দিশা দিতে ষোলই জানুয়ারি ঘোষিত হবে রূপরেখা, তখন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল দেশের স্টার্টআপ সম্প্রদায়। এতদিনে বুঝি বদলাল দেওয়াল লিখন। শাপমোচন হল অবধারিত প্রতিবন্ধকতার। চিনের সঙ্গে ভারতের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের হারের তুলনা করলে শোচনীয় তথ্যই সামনে আসে। ভারতের পার ক্যাপিটা জিডিপি যেখানে ১৫৯৬ মার্কিন ডলার, সেখানে চিনের ৭৫৯৪ মার্কিন ডলার। ভারতের প্রায় ৫ গুণ! কিন্তু এই মন খারাপ করা পরিসংখ্যানের পরও আশার আলো দেখছে দেশ। আশা জাগাচ্ছে কেন্দ্রের নতুন স্টার্ট আপ নীতি। হয়তো এবার ছবিটা বদলাবে।

কিন্তু কেন এই সময়টাকে ভারতীয় স্টার্টআপ‍-দের জন্য আদর্শ সময় বলা হচ্ছে ? কিছু কারণ তুলে ধরল ইওরস্টোরি।

  1. ২০১৫ সালে ভারতে মোট বিনিয়োগ এসেছে ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার যা আন্দামান নিকোবর, সিকিম, অরুনাচল প্রদেশ, মিজোরাম ও মনিপুরের সংযুক্ত জিডিপি‍র চেয়েও বেশি।
  2. ই-কমার্সের পোস্টার বয় হল ফ্লিপকার্ট। যদি এই অনলাইন সাইটকে আমরা একটি রাজ্য হিসেবে দেখি তবে তার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ভারতের ১৩ টি রাজ্য (কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল সহ)-এর থেকেও বেশি। অর্থাৎ ভারতের প্রায় অর্ধেক সংখ্যক রাজ্য আর সমস্ত কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জিডিপির চেয়ে অধিক।
  3. জিডিপি-র বিচারে বিশ্বের নবম দেশ ভারত, অঙ্ক কষলে দাঁড়ায় ২. ০৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। জিডিপি‍র একটা বড় অংশ আসে মেট্রো শহর অর্থাৎ টিয়ার-১ আর টিয়ার-২ সিটি থেকে । কিন্তু ভারতীয় জনসংখ্যার সত্তর শতাংশের বেশি থাকেন গ্রামে । এর অর্থ, ভারতের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অবদানের সুযোগ রয়েছে গ্রামের বিপুল জনসংখ্যার।
  4. বেদান্ত, গ্রাসিম কিংবা জিএসকে এই সংস্থাগুলি কয়েক দশক ধরে ব্যবসা করছে ভারতে । কিন্তু সদ্য বাজারে আসা স্ন্যাপডিলের ভ্যালুয়েশন এদের সকলের চেয়ে বেশি ।
  5. ভারতীয় রেল দেশের সবথেকে বড় পাবলিক সেক্টর এন্টারপ্রাইজ । কর্মসংস্থানের বিচারে বিশ্বের অষ্টম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান। কর্মী সংখ্যা প্রায় ১৪ লক্ষ। কিন্তু টিকিট রিজারভেশন, ক্যাটরিং ব্যবস্থা, গ্রাহকদের সুবিধার্থে গোটা প্রক্রিয়ার সরলিকরণের মাধ্যমে পরিষেবা উন্নয়নের অনেক সুযোগ রয়েছে । সেক্ষেত্রে স্টার্টআপ-দের কাজে লাগানোরও অবকাশ বিস্তর।
  6. ফ্লিপকার্ট, স্ন্যাপডিল, ওলা, পেটিএম, কুইকর, জোমাটো, মু সিগমা, ইন মোবি‍-র সৌজন্যে ভারতে স্টার্টআপ-দের সাফল্যের তালিকা নেহাত ছোট নয়। বিশ্বের মোট স্টার্টআপের ৫.৭ শতাংশ ভারতীয়, ‌বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার। কিন্তু বিনিয়োগের ক্ষেত্রটি কিন্তু এখনও তেমন চওড়া নয়। গোটা বিশ্বের স্টার্টআপদের সিকি ভাগও জোটে না ভারতীয়দের। তবে আশার কথা, স্টার্ট আপ কনসেপ্ট ধীরে ধীরে সাবালক হচ্ছে ভারতেও। পথ দেখাচ্ছেন সচিন বনসল, কুনাল বহেল-রা ।
  7. ২০১৫ সালে ১৭টি আর্থিক সংস্থা ২৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ ঘরে তুলেছে । গত বছর সবথেকে বেশি বিনিয়োগের ঠিকানা হয়ে উঠেছিল এই ক্ষেত্রটি । এবছরও প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে এই সেক্টরের । আরবিআই নির্দেশিকার শিথিলতা ‘আইসিং অন দ্য কেক’। ফলে ব্যাঙ্কগুলিও আর খড়গহস্ত হয় না। আখেরে যাতে উৎসাহ পায় স্টার্টআপরা।
  8. বিনিয়োগের নিরিখে বিটুসি বা বিজনেস টু কাস্টমার সেক্টরের পরিসংখ্যানও মন্দ নয়। অঙ্কের বিচারে ৩.৩৭৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর অর্থ ২০১৫-র মোট বিনিয়োগের ৩৩ শতাংশই হয়েছে এই ক্ষেত্রে আর এদের ৫০ শতাংশই স্টার্টআপ। 
  9. গো লোকাল। এটাই আগামী দিনে স্টার্টআপ সাফল্যের মূল মন্ত্র হয়ে উঠতে পারে। কারণ গ্রামীণ ভারত বড় বাজার হয়ে উঠতে পারে ইউনিকর্নদের। তাই তৃণমূল স্তরেই লুকিয়ে রয়েছে স্টার্টআপ উন্নতির চাবিকাঠি। এরজন্য আঞ্চলিক ভাষাগুলিকে অস্ত্র করতে হবে। বিশেষ করে টিয়ার থ্রি সিটি ও গ্রামীণ এলাকায় আঞ্চলিক ভাষায় ভর করে ব্যবসা, লেনদেন কিংবা প্যাকেজিংয়ের পথে হাঁটলে স্থানীয় গ্রাহকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতাও বাড়বে। আর এখানেই বিদেশি প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবেন ভারতীয় অন্ত্রেপ্রেনিওররা।
  10. বিশ্বব্যাঙ্কের বিজনেস রিপোর্ট বলছে, ২০০৮ সালে ভারতের রাঙ্কিং ছিল ১২০, ২০১৪-তে তা নেমে যায় ১৩২-এ। ২০১৫ সালে রাঙ্কিং কিছুটা উঠে ১৩০-এ আসে। সামনের বছরগুলিতে ‘স্টার্টআপ বন্ধু’ সরকারের সৌজন্যে আরও কয়েক ধাপ ভারত এগিয়ে আসবে বলেই আশাবাদী বিশেষজ্ঞরা।
  11. সাম্প্রতিক কালে একাধিক রাজ্য স্টার্টআপদের উৎসাহ দিতে নীতি প্রণয়ন করেছে। প্রথম নামটিই হল কর্নাটক। এরপর অন্ধ্রপ্রদেশ, রাজস্থান সহ অন্যান্য রাজ্যও সেই পথই অনুসরন করছে। কেরল সরকার বাজেটের এক শতাংশ অন্ত্রেপ্রেনিওরশিপ-এর জন্য বরাদ্দ করেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার আইআইএম ক্যালকাটার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে বিভিন্ন জেলার অন্ত্রেপ্রেনিওরদের প্রশিক্ষণ দিতে আধিকারিক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে। একইভাবে মহারাষ্ট্র,গুজরাট, তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, দিল্লি অন্ত্রেপ্রেনিওরশিপ-কে উৎসাহ দিতে একাধিক পদক্ষেপ করেছে।
  12. ২০১৫-র ফোর্বস-এ ধনকুবেরের তালিকায় জায়গা পেয়েছেন ফ্লিপকার্ট প্রতিষ্ঠাতা সচিন বনসল ও বিন্নি বনসল। এ বছর আরও অনেক স্টার্টআপ সেই তালিকাকে সমৃদ্ধ করবে বলে আশা।
  13. ওয়ার্ল্ড স্টার্ট আপ জিনোম প্রজেক্ট ২০১৫ অনুযায়ী, স্টার্টআপ-দের জন্য বিশ্বের পঞ্চম সেরা গন্তব্য বেঙ্গালুরু।
  14. ভারতে স্টার্টআপ-দের সংজ্ঞা নিয়ে একাধিক মতবাদ রয়েছে। তাই দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে তাঁদের অবদান নির্ণয় করা যথেষ্ট কঠিন। যদিও জাতীয় স্টার্টআপ নীতি কা‌র্যকর হলে ভারতের অর্থনীতিতে স্টার্টআপ-দের অবদান সম্পর্কে সম্যক ও সঠিক ধারণা পাওযা যাবে বলেই আশা।
  15. কেরল সরকার অন্ত্রেপ্রেনিওরশিপকে উৎসাহ দিতে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। স্টার্টআপ ভিলেজের কনসেপ্ট এনে তরুণ তুর্কিদের সবরকম সাহায্য করছে কেরল।
  16. ২০১৪ সালে ফেসবুক লিটল আই ল্যাবস অধিগ্রহণ করে। ২০১৫-তে টুইটার কিনে নেয় জিপডায়াল। সরকারি সহযোগিতা থাকলে ফেসবুক, টুইটারের দেখানো পথে হাঁটতে দেখা যাবে আরও অনেক স্টার্টআপ-দের। তাতে দেশের প্রযুক্তির ভান্ডার সমৃদ্ধ হবে। গত বছর রতন টাটা, টিভি মোহন দাস পাইয়ের মতো দেশের তাবড় শিল্পপতিদের স্টার্টআপে বিনিয়োগের ঘটনাও ইউনিকর্নদের উৎসাহ জোগাবে।

(লেখক আদিত্য ভূষণ দ্বিবেদী, অনুবাদ শিল্পী চক্রবর্তী)