উপজাতিদের নিয়েই সদা প্রসন্ন থাকেন প্রসন্নশ্রী

ডঃ সাথুপতি প্রসন্নশ্রী অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি বিভাগের একজন অধ্যাপিকা, চেয়ারপার্সন। দক্ষিণ ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে প্রসন্নশ্রী হলেন একমাত্র মহিলা অধ্যাপক, যিনি উপজাতিদের নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁকে শিখতে হবে তাঁদের মুখের ভাষা সম্মিলিত সাহিত্য কিংবা তাঁদের বিভিন্ন কিংবদন্তী গল্প, সেই সঙ্গে উপজাতিগুলির ভাষার অক্ষরজ্ঞান।

0

নিজের শিকড় কখনও ভুলতে নেই, ঠাকুমার কাছ থেকে এমনটাই শিখেছিলেন এস প্রসন্নশ্রী। পরে উপলব্ধিও করেছিলেন, তাই শিকড়ের টানে ফিরে গিয়েছিলেন নিজের জাতির কাছে। সেখান থেকেই উপলব্ধি করেছিলেন, এই সব উপজাতিদের কাছাকাছি থাকাটা কতটা জরুরি। তাঁদের উন্নতির জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার মাসুলও দিতে হয়েছিল মারাত্মক ভাবে। কিন্তু হার মানেননি প্রসন্নশ্রী। তাঁর সেই অক্লান্ত পরিশ্রম আজ তাঁকে নিয়ে গিয়েছে উপজাতিশ্রেণির সবচেয়ে কাছে।


উপজাতিদের হাতে একবার প্রচণ্ড মার খেয়েছিলেন প্রসন্নশ্রী। কাঁধের লিগামেন্ট ছিঁড়ে গিয়েছিল। বিশাখাপত্তনমের হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসা চলেছিল তাঁর। কিন্তু হাসপাতালে শুয়েই তিনি ঠিক করে ফেলেছিলেন তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে। আবার ফিরে গিয়েছিলেন সেই একই গ্রামে। এবার তাঁকে শিখতে হবে তাঁদের মুখের ভাষা সম্মিলিত সাহিত্য কিংবা তাঁদের বিভিন্ন কিংবদন্তী গল্প, সেই সঙ্গে উপজাতিগুলির ভাষার অক্ষরজ্ঞান।

ডঃ সাথুপতি প্রসন্নশ্রী অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি বিভাগের একজন অধ্যাপক, চেয়ারপার্সন। দক্ষিণ ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মধ্যে প্রসন্নশ্রী হলেন একমাত্র মহিলা অধ্যাপিক, যিনি উপজাতিদের নিয়ে এতখানি গবেষণা করেছেন। ১৯৯১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত মধ্য ভারতের ১৬৭টি উপজাতি গ্রামে ঘুরেছেন প্রসন্নশ্রী। তাঁদের কিংবদন্তী গল্প শুনেছে। সেই সব গল্পকে লিখিত ভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। ২০০৬ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত প্রসন্নশ্রী যা কাজ করেছেন, তা অবিস্মরণীয়। ১৮টি নতুন ভাষার লিপি উদ্ধার করেছেন তিনি। সবই উপজাতিদের।


১৯৯১ সালে আরাকু ভ্যালি গিয়েছিলেন প্রসন্নশ্রী। তখন তাঁর মেয়ে খুবই ছোট। এই আরাকু ভ্যালি বিভিন্ন উপজাতি সমন্বিত। এরকমই এক উপজাতি গোষ্ঠীর মধ্যে গান শুনে মুগ্ধ হন প্রসন্ন। সঙ্গের টেপরেকর্ডারে রেকর্ড করেছিলেন সেই গান। যেখানেই যেতেন এই টেপরেকর্ডারটি সঙ্গী ছিল তাঁর। এই সব উপজাতিদের সঙ্গে মেশা যথেষ্ট কঠিন ছিল। রীতিমত সন্দেহের চোখে প্রসন্নকে দেখতেন তাঁরা। বিশেষ করে তাঁদের দলপতি। দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের সঙ্গে মিশে, ওঁদের কথা শুনতে শুনতে একটা ভরসার জায়গা তৈরি হয়।

দীর্ঘদিনের বঞ্চনা এবং অবাঞ্ছিত থাকাই উপজাতি সম্প্রদায়কে করে তুলেছে এত রূঢ়। তার মধ্যে একজন মহিলা তাঁদের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করছে, এটাও মেনে নিতে পারেনি ওই সম্প্রদায়ের মানুষ। এই সব জাতি সাধারণত পুরুষশাসিত। মহিলাদের প্রাধান্য সেখানে নেই। বাইরের জগতের মানুষ এসে তাঁদের চিন্তাভাবনা বদলে দিতে পারে, এই ভয় তাঁদের ছিল।


প্রসন্ন সব সময় চেষ্টা করতেন, বাইরের জগতের উন্নতির কথা তাঁদের জানাতে। তাঁদের জীবনযাত্রার উন্নতি করতে। প্রসন্নর এই অদ্ভুত জীবনযাত্রায় অকুণ্ঠ সাহায্য পেয়েছেন স্বামী এবং মেয়ের কাছ থেকে। এখনও পর্যন্ত ২৫টি বই লিখেছেন তিনি। কিছু আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমেও ঢোকানো হয়েছে।

প্রসন্নর জন্ম হয়েছিল প্রকাসম জেলার একটি উপজাতি পরিবারে। নিজের শিকড় ওখানে বলেই উপজাতি সম্প্রদায়ের সঙ্গে আত্মীয়তা গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। প্রসন্নর ঠাকুমা সবসময় বলতেন, পৃথিবীকে তুমি নিজের চোখে দেখতে চাও, না কাঁচের আড়ালে দেখতে চাও- সেটা নির্ভর করছে যে দেখছে তাঁর ওপর। প্রসন্ন পৃথিবীকে নিজের চোখে দেখতে চেয়েছিলেন।


লেখক – শাশ্বতী মুখার্জী

অনুলেখক-চন্দ্রশেখর চ্যাটার্জী